হেংকেলের প্রকল্প, আবাদের পদ্ধতি ও ভূমিস্বত্বের বিবরণ ১৮৭১ সালের সরকারি প্রতিবেদন থেকে। রামপাল-পারিখালী প্রথম আবাদ করেছিলেন রাম পাল ও শ্যাম পাল—এটি লোকমুখে প্রচলিত কাহিনি, ওয়েস্টল্যান্ড নিজেও এর প্রমাণ পাননি।
জেলা তথ্য বাতায়নের ভাষায়, বাগেরহাটের অধিকাংশ জনপদ গড়ে উঠেছে বন সরিয়ে। বাংলাপিডিয়া বলছে, প্রায় ২০০ বছর আগে সুন্দরবনের আয়তন মাপা হয়েছিল প্রায় ১৬,৭০০ বর্গকিলোমিটার, এখন তা মোটামুটি এক-তৃতীয়াংশ। বাকি জমির বড় অংশ ইংরেজ আমলে ধাপে ধাপে ‘আবাদ’ হয়ে ধানখেত আর গ্রাম হয়েছে।
এই আবাদের সূচনা যশোরের জজ-ম্যাজিস্ট্রেট টিলম্যান হেংকেলের হাতে। ১৮৭১ সালে লেখা ওয়েস্টল্যান্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৭৮২–৮৩ সালের দিকে তিনি বনের ভেতর তিনটি গঞ্জ বসান, তার একটি কচুয়া—বাগেরহাট থেকে আট মাইল পুবে, ভৈরবের তীরে। ১৭৮৪ সালের ৪ এপ্রিল তিনি প্রস্তাব দেন: যে বন সাফ করবে, সে তালুকদার হিসেবে জমি পাবে; ২০০ বিঘা নিজের, বাকি আবাদি জমিতে প্রথম তিন বছর খাজনা মাফ, তারপর ধাপে ধাপে বাড়বে। জমিদারদের মামলা আর খরচের কারণে ১৭৯০ সালে রাজস্ব বোর্ড প্রকল্পটি কার্যত ছেড়ে দেয়, তবু ওয়েস্টল্যান্ড লিখেছেন, এরপর প্রায় বিশ মাইল চওড়া একটি বনভূমি আবাদ হয়ে গিয়েছিল।
আবাদের কাজটা ছিল কঠিন। প্রথম ভারী সাফাইয়ের খরচ সাধারণত জমির মালিকই দিতেন; পরে রায়তরা এসে বসত, নিজেদের বলত ‘আবাদকারী’ আর জমিতে একধরনের দখলিস্বত্ব দাবি করত। এক বছর অবহেলা করলেই জমি নলখাগড়ায় ঢেকে যেত। বাঘের ভয়ে অনেক অগ্রবর্তী বসতি ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছে; ১৮৬৮ সালের এক কুখ্যাত মানুষখেকোর কথা ওয়েস্টল্যান্ড লিখেছেন; মোড়েলগঞ্জের মি. মোরেল লোহার খাঁচায় বসে ওত পেতে তাকে গুলি করেন, আর এরপর বাঘটির উপদ্রব থেমে যায়। কচুয়া-বাগেরহাট-খুলনার নদীপথের ধারের অনেক চাষি চৈত্র-জ্যৈষ্ঠে বাড়ির জমি চষে, আষাঢ়ে লাঙল-গরু নৌকায় তুলে চলে যেতেন সুন্দরবনের ‘আবাদে’।
এই আবাদ থেকেই দক্ষিণ বাগেরহাটের আলাদা ভূমিব্যবস্থার জন্ম। ওয়েস্টল্যান্ডের হিসাবে বাগেরহাটের দক্ষিণের প্রায় সব জমিই ছিল সুন্দরবনের তালুক। সেখানে তালুকদারের নিচে হাওলাদার, তার নিচে নিম-হাওলাদার, তারও নিচে ওসত-হাওলা—আর এই স্তরের শিকড় ছিল ‘আবাদকারী স্বত্ব’-এ। ১৮৬৯ সালের ঘূর্ণিঝড়ে রায়তরা যখন সর্বস্বান্ত, তখন ছোট তালুকদাররাই প্রথম এগিয়ে এসেছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। সবচেয়ে বড় তালুকদার ছিল মোড়েলগঞ্জের মোরেল পরিবার, যাদের জমিদারি ‘তিরিশ বছর আগের জলাজঙ্গলে’ গড়ে উঠেছিল (তাদের গল্প মোড়েলগঞ্জ পর্বে)।
রামপাল নিয়ে একটি জনশ্রুতিও ওয়েস্টল্যান্ড টুকে রেখেছেন। তাঁর সময়ে রামপাল ও পারিখালীর জমি ষাট-সত্তর বছর আগে আবাদ হয়েছিল, কিন্তু লোকমুখে প্রচলিত ছিল, বহু আগে কুমোর সম্প্রদায়ের দুই ভাই রাম পাল ও শ্যাম পাল এই জমি প্রথম আবাদ করেছিলেন; রাম পালের কাটা বলে একটি পুকুরও দেখানো হতো। এ কাহিনির লিখিত প্রমাণ নেই। আবাদের এই অগ্রযাত্রায় ছেদ পড়ে ১৮৭৫ সালে, যখন সুন্দরবনকে সংরক্ষিত বন ঘোষণা করা হয়।