মোংলা আর রামপাল: নাম এল কোথা থেকে?

ইতিহাস ও জনশ্রুতিলোককথারামপাল থানা ১৮৯২; মোংলা নাম ১৯৫৪ থেকে প্রচলিতরামপাল ও মোংলা

একটির নাম কি নদী থেকে, নাকি ‘মঙ্গল রাজা’ থেকে? আরেকটির নাম কি ‘রাম’ নামের এক পাল-বংশীয় মানুষের নামে? দুই প্রতিবেশী উপজেলার নামের পেছনের দলিল আর জনশ্রুতি পাশাপাশি।

দলিলভিত্তিক: রামপাল থানা ১৮৯২ ও উপজেলা ১৯৮৩; মোংলা থানা ১৯৭৬ ও উপজেলা ১৯৮৩; বন্দরের নাম মোংলা নদী থেকে (মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ)। জনশ্রুতি: ‘মঙ্গল রাজা’ বা ‘মঙ্গল ঋষি’ ও গ্রিক ক্যাপ্টেনের গল্প, এবং পাল বংশের ‘রাম’ নামের ব্যক্তির বসতির গল্প।

রামপাল আর মোংলা আসলে একই মাটির দুই ভাগ। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী রামপাল থানা গঠিত হয় ১৮৯২ সালে। রামপাল উপজেলা তথ্য বাতায়ন বলছে, ১৯৮৩ সালের ২৪ মার্চ থানাটি উপজেলায় উন্নীত হয়; তখন এর ইউনিয়ন ছিল ১৭টি। পরে একটি ইউনিয়ন সদর উপজেলার সঙ্গে যুক্ত হয়, আর ছয়টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত হয় নতুন মোংলা উপজেলা। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে মোংলা থানা গঠিত হয়েছিল ১৯৭৬ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর, উপজেলা হয় ১৯৮৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর। এ কারণেই বাংলাপিডিয়ার ‘মংলা বন্দর’ ভুক্তিতে বন্দরের জমিকে বলা হয়েছে ‘রামপাল উপজেলার সেলাবুনিয়া মৌজা’।

মোংলা নামের সবচেয়ে নথিভুক্ত ব্যাখ্যাটি দিয়েছে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ। তাদের ইতিহাস অনুযায়ী, ১৯৫৪ সালে বন্দর যেখানে সরে আসে, সেটি ছিল শ্যালাবুনিয়া নামের একটি গ্রাম; মোংলা নদীর তীরে স্থাপিত হওয়ায় বন্দরের নাম হয় মোংলা। বাংলাপিডিয়াও বন্দরের অবস্থান বলছে পশুর ও মংলা নদীর সঙ্গমস্থলে। অর্থাৎ নামটি আগে ছিল একটি নদীর, পরে তা বন্দর, শহর আর উপজেলার নাম হয়ে যায়। বানানেও দুই রূপ দেখা যায়: বাংলাপিডিয়ায় ‘মংলা’, আর সরকারি তথ্য বাতায়নে ‘মোংলা’।

তবে নদীটির নাম ‘মোংলা’ কেন, সে প্রশ্নের উত্তর কোনো দলিলে মেলে না। এখানেই আসে জনশ্রুতি। মোংলা উপজেলা তথ্য বাতায়নের ‘পটভূমি’ পাতায় লেখা আছে, কথিত আছে ‘মঙ্গল রাজা’র নামানুসারে এক গ্রিক জাহাজের ক্যাপ্টেন জায়গাটির নাম রাখেন মোংলা। একই বাতায়নের ‘ভৌগলিক পরিচিতি’ পাতায় গল্পটি একটু অন্যরকম: সেখানে রাজার বদলে আছেন ‘জনৈক মঙ্গল ঋষি’। গ্রিক ক্যাপ্টেন, মঙ্গল রাজা বা মঙ্গল ঋষি, কারও অস্তিত্বের কোনো প্রমাণ কোনো সূত্রে পাওয়া যায় না; এগুলো লোকমুখে চলা কাহিনি হিসেবেই পড়া উচিত।

রামপালের নাম নিয়েও আছে একটি জনশ্রুতি। রামপাল উপজেলা তথ্য বাতায়ন অনুযায়ী, লোকমুখে শোনা যায় পাল বংশের ‘রাম’ নামের এক ব্যক্তি প্রথম কুমার নদীর ওপারে, পেড়িখালীর বিপরীত দিকে বসতি গড়েন; পরে তাঁর নামেই জায়গাটির নাম হয় রামপাল। এই ব্যক্তির সময়কাল বা পরিচয় কোনো নথিতে পাওয়া যায় না। নামের মিল দেখে পাল সাম্রাজ্যের রাজা রামপালের (আনুমানিক ১০৮২–১১২৪ খ্রিস্টাব্দ) কথা মনে আসা স্বাভাবিক; কিন্তু বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী তাঁর প্রধান কৃতিত্ব ছিল উত্তরবঙ্গের বরেন্দ্র পুনরুদ্ধার, আর বাগেরহাটের রামপালের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্কের প্রমাণ কোনো সূত্রে মেলে না।

সব মিলিয়ে বলা যায়, মোংলা নামের নদী-সূত্রটি দলিলে আছে, কিন্তু নদীর নামের উৎস এখনো অজানা; আর রামপালের নামের গল্পটি পুরোপুরি জনশ্রুতি। নতুন কোনো দলিল না পাওয়া পর্যন্ত এই গল্পগুলো স্থানীয় স্মৃতির অংশ হিসেবেই টিকে থাকবে।

গল্পের জায়গাগুলো

তথ্যসূত্র

  1. মোংলা বন্দরের ইতিহাস · মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ, ২০২৬
  2. মোংলা উপজেলার পটভূমি · মোংলা উপজেলা তথ্য বাতায়ন, ২০২১
  3. ভৌগলিক পরিচিতি · মোংলা উপজেলা তথ্য বাতায়ন, ২০২১
  4. রামপাল উপজেলার পটভূমি · রামপাল উপজেলা তথ্য বাতায়ন, ২০১৮
  5. রামপাল উপজেলা · বাংলাপিডিয়া
  6. মংলা উপজেলা · বাংলাপিডিয়া
  7. মংলা বন্দর · বাংলাপিডিয়া
  8. রামপাল (পাল রাজা) · বাংলাপিডিয়া

কোনো তথ্য ভুল মনে হলে বা আরও ভালো সূত্র জানা থাকলে নিচে জানান; যাচাই করে ঠিক করা হবে।

রামপাল-এর আরও গল্প

সব দেখুন
বন কেটে আবাদ: সুন্দরবনের কোলে দক্ষিণ বাগেরহাটের জন্মরামপাল, মোড়েলগঞ্জ, শরণখোলার আজকের ধানখেত দুই শ বছর আগেও ছিল বাঘের জঙ্গল। ইংরেজ আমলের ‘আবাদ’ কীভাবে দক্ষিণ বাগেরহাট গড়ল, আর বসতকারদের কী দাম দিতে হয়েছিল?ইতিহাস ও জনশ্রুতিডাকরার কালীবাড়ি: ২১ মে ১৯৭১ভারতে যাওয়ার আশায় রামপালের ডাকরা গ্রামের কালী মন্দিরে জড়ো হয়েছিলেন হাজারো মানুষ। ১৯৭১ সালের ২১ মে দুপুরে সেখানে যে হত্যাযজ্ঞ চলে, তা রামপালের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায়।প্রমাণিত ইতিহাস