চরকুলিয়ার সেতুযুদ্ধ: হাড়িদহ থেকে ওলিমদ্দি

প্রমাণিত ইতিহাসমুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১৮ ও ২৬ অক্টোবর ১৯৭১; মুক্ত ১০ ডিসেম্বরচরকুলিয়া (হাড়িদহ ও ওলিমদ্দি সেতু), মোল্লাহাট

১৯৭১ সালের অক্টোবরে মোল্লাহাটের চরকুলিয়ায় দুটি সেতুর মুখে মুক্তিযোদ্ধাদের অ্যামবুশে বড় ক্ষতির মুখে পড়ে পাকিস্তানি বাহিনী। দুই মাস পর ১০ ডিসেম্বর রাজাকারদের আত্মসমর্পণে মোল্লাহাট মুক্ত হয়।

ঘটনাগুলো প্রামাণ্য; তবে নিহত পাকিস্তানি সেনার সংখ্যা সূত্রভেদে আলাদা (জ্ঞানকোষে হাড়িদহে ১০ ও ওলিমদ্দিতে শতাধিক হতাহত, বাংলাপিডিয়ায় প্রায় ২০০)।

১৯৭১ সালের ১০ মার্চ জাতীয় পরিষদ সদস্য এম এ খায়েরের নেতৃত্বে মোল্লাহাট থানা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। যুদ্ধ শুরুর পর থানা সদরের সিও অফিসে, পরে চরকুলিয়া ও দত্তডাঙ্গায় রাজাকারদের ক্যাম্প বসে। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ অনুযায়ী, ১০ সেপ্টেম্বর উদয়পুর গরুর হাটের কাছে ভারতগামী এক শরণার্থী দলের সাতজনকে হত্যা করা হয়। ৩০ সেপ্টেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা দত্তডাঙ্গা রাজাকার ক্যাম্পে আক্রমণ চালান; তিন দিনের লড়াইয়ের পর রাজাকাররা রাতের অন্ধকারে পালিয়ে যায়। চিতলমারী ও সন্তোষপুরের মুক্তিযোদ্ধারাও এ অভিযানে যোগ দিয়েছিলেন।

৬ অক্টোবর খবর আসে, পাকিস্তানি সেনারা চরকুলিয়া ও গাওলা গ্রামে অভিযান চালাতে চায়। চিতলমারীর শামসু বাহিনী, তেরখাদার পাতলা ক্যাম্প আর দাড়িয়ালা ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধারা একত্র হন। ৮ অক্টোবর শুক্রবার ভোরে বাছাই করা ২৯ জন মুক্তিযোদ্ধা চরকুলিয়া বাজারের এক কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে হাড়িদহ সেতুর কাছে তেমাথায় দশটি বাংকার খুঁড়ে অবস্থান নেন। সেতু পেরিয়ে ক্যাপ্টেন সেলিমের নেতৃত্বে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকাররা মোড়ে আসতেই মূল বাংকার থেকে মেশিনগানের গুলি শুরু হয়। জ্ঞানকোষের হিসাবে কয়েক মিনিটের যুদ্ধে ক্যাপ্টেন সেলিমসহ ১০ জন পাকিস্তানি সেনা ও কয়েকজন রাজাকার নিহত হয়; বাকিরা পালিয়ে যায়, আর মুক্তিযোদ্ধারা প্রচুর গোলাবারুদ হাতে পান।

প্রতিশোধ নিতে খুলনা থেকে চার-পাঁচটি গানবোটে প্রায় ২০০ পাকিস্তানি সেনা, এক কোম্পানি আলবদর ও বহু রাজাকার মোল্লাহাট ও বাশুড়িয়া ঘাটে নামে। মুক্তিযোদ্ধারা আগেই সড়কের সেতুগুলো ভেঙে বা পাটাতন সরিয়ে রেখেছিলেন। ২৬ অক্টোবর, চরকুলিয়ার হাটবার; সেনারা আসার খবরে হাট মুহূর্তে ফাঁকা হয়ে যায়। ওলিমদ্দি খালের সেতুর কাছে আটকে পড়ে সেনারা আশপাশের গ্রামে মর্টার ছুড়তে থাকে। দশটি বাংকারে নীরবে অপেক্ষায় থাকা মুক্তিযোদ্ধারা সন্ধ্যায় একযোগে গুলি শুরু করেন। জ্ঞানকোষ বলছে, এ যুদ্ধে শতাধিক পাকিস্তানি সেনা হতাহত হয় এবং রাতের অন্ধকারে গরুর গাড়িতে লাশ সরানো হয়; বাগেরহাটে আর কোনো একক যুদ্ধে এত পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়নি বলেও সেখানে দাবি করা হয়েছে।

বাংলাপিডিয়ায় এ এলাকার যুদ্ধের হিসাব আরও বড়: সেখানে লেখা আছে, ‘চাকুলিয়া’ বা চরকুলিয়ায় মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে একজন ক্যাপ্টেনসহ প্রায় ২০০ পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়; তবে সংখ্যাটি কোন যুদ্ধের, তা আলাদা করে বলা নেই। চরকুলিয়ায় মুক্তিযুদ্ধের একটি স্মৃতিস্তম্ভ আছে।

শেষ দৃশ্য ডিসেম্বরে। ৯ ডিসেম্বর রাতে মোল্লাহাট থানায় থাকা পাঞ্জাবি পুলিশ লঞ্চে খুলনায় পালানোর চেষ্টা করে, কিন্তু উদয়পুর গরুর হাটের কাছে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধে পথ বদলে বরিশালের দিকে চলে যায়। পরদিন, ১০ ডিসেম্বর দুপুরে মোল্লাহাট কলেজ মাঠে রাজাকাররা অস্ত্র সমর্পণ করে, আর মোল্লাহাট হানাদারমুক্ত হয়। উপজেলার দুই খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা হলেন এনামুল হক, বীর প্রতীক (যশোরের কাশীপুর যুদ্ধে শহীদ) এবং মো. আবুল হোসেন, বীর প্রতীক।

তথ্যসূত্র

  1. হাড়িদহ ব্রিজ যুদ্ধ (মোল্লাহাট, বাগেরহাট) · সংগ্রামের নোটবুক (মূল সূত্র: বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ, ১০ম খণ্ড)
  2. ওলিমদ্দি ব্রিজ যুদ্ধ (মোল্লাহাট, বাগেরহাট) · সংগ্রামের নোটবুক (মূল সূত্র: বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ, ২য় খণ্ড)
  3. মুক্তিযুদ্ধে মোল্লাহাট উপজেলা (বাগেরহাট) · সংগ্রামের নোটবুক (মূল সূত্র: বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ, ৮ম খণ্ড)
  4. দত্তডাঙ্গা রাজাকার ক্যাম্প অপারেশন (মোল্লাহাট, বাগেরহাট) · সংগ্রামের নোটবুক (মূল সূত্র: বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ, ৪র্থ খণ্ড)
  5. উদয়পুর গণহত্যা (মোল্লাহাট, বাগেরহাট) · সংগ্রামের নোটবুক (মূল সূত্র: বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ, ১ম খণ্ড)
  6. Mollahat Upazila · Banglapedia (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ)
  7. মোল্লাহাট উপজেলা · বাংলাপিডিয়া (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ)
  8. Mollahat Upazila · Wikipedia (English)

কোনো তথ্য ভুল মনে হলে বা আরও ভালো সূত্র জানা থাকলে নিচে জানান; যাচাই করে ঠিক করা হবে।

মোল্লাহাট-এর আরও গল্প

সব দেখুন
তমিজ উদ্দিন মোল্লার বৈঠকখানা থেকে মোল্লাহাটউপজেলা প্রশাসনের লেখা ইতিহাস বলে, প্রভাবশালী হাজী তমিজ উদ্দিন মোল্লার বৈঠকখানায় বসেছিল পুলিশ ফাঁড়ি, তাকে ঘিরে জমে ওঠে হাট। নদী সরে যাওয়ায় সেই হাট আর থানা উঠে আসে মধুমতির চরে।ইতিহাস ও জনশ্রুতিকুলিয়ার মসজিদ আর এক রাতের গল্পমোল্লাহাটের সবচেয়ে পুরোনো মসজিদ বলে পরিচিত কুলিয়ার এক গম্বুজ মসজিদ কে, কবে বানিয়েছেন, কেউ জানে না। মুরব্বিদের মুখে মুখে ফেরে, মসজিদটি নাকি এক রাতেই তৈরি হয়েছিল।ইতিহাস ও জনশ্রুতি