১৯২১ সালের ১১ অক্টোবর বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার মূলঘর গ্রামের এক জমিদার পরিবারে জন্ম নেন নীলিমা রায় চৌধুরী। বাবা প্রফুল্লকুমার রায় চৌধুরী, মা কুসুমকুমারী দেবী। পরে তিনি পরিচিত হন নীলিমা ইব্রাহিম নামে: শিক্ষাবিদ, কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সমাজকর্মী। ফকিরহাট উপজেলা তথ্য বাতায়ন তাঁকে উপজেলার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের তালিকায় রেখেছে।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী তিনি খুলনা করোনেশন গার্লস স্কুল থেকে এন্ট্রান্স, কলকাতার ভিক্টোরিয়া ইনস্টিটিউশন থেকে আইএ এবং স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে বিটি পাস করেন। ১৯৪৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এমএ করেন, আর ১৯৪৫ সালে প্রথম নারী হিসেবে বিহারীলাল মিত্র গবেষণা বৃত্তি পান। একই বছর ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেডিকেল কোরের ক্যাপ্টেন ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিমকে বিয়ে করে ঢাকায় স্থায়ী হন। ১৯৫৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উনিশ শতকের বাঙালি সমাজ ও বাংলা নাটক বিষয়ে পিএইচডি করেন।
১৯৫৬ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগে যোগ দেন, ১৯৭২ সালে অধ্যাপক হন। ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত বাংলা বিভাগের প্রধান এবং ১৯৭১ থেকে ১৯৭৭ পর্যন্ত রোকেয়া হলের প্রাধ্যক্ষ ছিলেন; ১৯৭৪–৭৫ সালে অবৈতনিকভাবে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। লিখেছেন উপন্যাস ‘বিশ শতকের মেয়ে’, গবেষণাগ্রন্থ ‘শরৎ-প্রতিভা’ ও ‘বাংলার কবি মধুসূদন’, একাধিক নাটক, আর আত্মজীবনী ‘বিন্দু-বিসর্গ’।
তবে নীলিমা ইব্রাহিমকে আজ সবচেয়ে বেশি মনে করা হয় একাত্তরের বীরাঙ্গনাদের কারণে। যুদ্ধের পর নির্যাতিত নারীদের পুনর্বাসনকেন্দ্রে তিনি কাজ করেছেন। রাষ্ট্র তাঁদের ‘বীরাঙ্গনা’ খেতাব দিলেও সমাজ অনেককেই ফিরিয়ে নিতে চায়নি। সেই নারীদের সঙ্গে কথা বলে, তাঁদের নিজেদের জবানিতে তিনি লেখেন দুই খণ্ডের ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’। গবেষকদের কেউ বইটিকে মুক্তিযুদ্ধে নারীর অভিজ্ঞতা নিয়ে পথিকৃৎ কাজ বলেছেন, কেউ আবার এর উপস্থাপনভঙ্গির সমালোচনাও করেছেন; কিন্তু বীরাঙ্গনাদের কথা প্রকাশ্যে আনায় বইটির ভূমিকা নিয়ে কারও দ্বিমত নেই।
বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬৯), বেগম রোকেয়া পদক (১৯৯৬) ও একুশে পদকসহ (২০০০) বহু সম্মাননা পেয়েছেন তিনি। ২০০২ সালের ১৮ জুন তাঁর মৃত্যু হয়। মূলঘরের জমিদারবাড়ির সেই মেয়েটির জীবন তাই বাগেরহাটের এক গ্রামের সীমানা পেরিয়ে বাংলাদেশের সাহিত্য আর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে।