দুটি ঘটনাই প্রামাণ্য, তবে দ্বিতীয় হত্যাকাণ্ডের তারিখ ও সঠিক স্থান নিয়ে সূত্রভেদ আছে। এ ঘটনায় কোনো আদালতের দণ্ড আমরা পাইনি, তাই অভিযুক্ত কারও নাম লেখা হয়নি।
ভৈরব নদের তীরে ফকিরহাটের মানসা বাজার। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ অনুযায়ী, একাত্তরের এপ্রিলে পাকিস্তানি বাহিনী যাতে নদীপথে লঞ্চে করে মানসায় আসতে না পারে, সে জন্য বামপন্থী নেতা মোড়ল সিরাজুল ইসলাম ৫০ জন তরুণ মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে প্রতিরোধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু তাঁরা পৌঁছানোর আগেই হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা বাজারে চলে আসে।
তারা বাজারের সব দোকানে আগুন দেয়, কালীমন্দিরের ব্যাপক ক্ষতি করে এবং বাজারের মানুষের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়। জ্ঞানকোষের হিসাবে ২০–২৫ জন নিহত হন, যাঁদের বেশির ভাগ ছিলেন হিন্দু ব্যবসায়ী; লাশগুলো পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়। বাহিনী চলে যাওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধারা গ্রামবাসীদের নিয়ে লাশ তুলে স্বজনদের হাতে তুলে দেন। বাংলাপিডিয়া জানায়, ৬ মে রাজাকাররা সিংগাতি ও বাহিরদিয়া বাজারের দোকানেও আগুন দেয়।
মানসার দ্বিতীয় হত্যাকাণ্ডের শিকার হন একদল শিক্ষক। মুনতাসীর মামুন সম্পাদিত ‘মুক্তিযুদ্ধ কোষ’-এ বলা হয়েছে, ২৫ আগস্ট ফকিরহাট বাজারের পোস্ট অফিস থেকে কয়েকজনকে ধরে নিয়ে বাহিরদিয়া-মানসা ইউনিয়ন পরিষদের পাশে, এখনকার পরিবার স্বাস্থ্য ক্লিনিকের সামনে, গুলি করে হত্যা করা হয়। নিহত নয়জনের সাতজনই ছিলেন স্কুলশিক্ষক, বাড়ি মোল্লাহাট থানা এলাকায়; তাঁরা সেদিন বেতনের টাকা তুলতে পোস্ট অফিসে এসেছিলেন। তাঁদের সঙ্গে পোস্ট অফিসের একজন কর্মচারী ও একজন ইউপি সদস্যও নিহত হন। বাংলাপিডিয়াও ২৫ আগস্ট মানসায় পাকবাহিনী ও রাজাকারদের হাতে নয়জন নিরীহ মানুষ হত্যার কথা লিখেছে।
জ্ঞানকোষের ফকিরহাট অধ্যায়ের বিবরণ কিছুটা আলাদা। সেখানে ঘটনাটি সেপ্টেম্বরের; নিহতরা ফকিরহাট থানা সদর, সারুলিয়া ও চাকদাই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং একজন পোস্টমাস্টার, আর ডাকবাংলোয় থাকা রাজাকাররা বাহিরদিয়া ও সামন্তসেনা রেলস্টেশনের মাঝামাঝি জায়গায় তাঁদের গাছে বেঁধে গুলি করে। তারিখ আর স্থান নিয়ে ফারাক থাকলেও সব বিবরণে একটি কথা মেলে: বেতন নিতে আসা নিরস্ত্র শিক্ষকেরা আর বাড়ি ফেরেননি। এই হত্যাকাণ্ডের পর পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
মানসা বাজার গণহত্যার শহীদদের স্মরণে সেখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়েছে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী ফকিরহাটে তিনটি স্থানে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ ও একটি স্মৃতি ভাস্কর্য আছে। ১৬ ডিসেম্বর ফকিরহাট হানাদারমুক্ত হয়।