পিলজঙ্গের রাত

প্রমাণিত ইতিহাসমুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১৪ অক্টোবর ১৯৭১পিলজঙ্গ, ফকিরহাট

ভারতে প্রশিক্ষণ শেষে নিজ এলাকায় ফিরছিলেন মোল্লাহাটের একদল তরুণ মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালের ৪ অক্টোবর রাতে ফকিরহাটের পিলজঙ্গে রাজাকারদের ফাঁদে পড়ে প্রাণ দেন অন্তত ১৪ জন।

ঘটনাটি প্রামাণ্য ইতিহাস; শহীদের সংখ্যা জ্ঞানকোষের দুটি অধ্যায়ে ভিন্ন (১৪ ও ২০)। দালাল বা রাজাকার কারও নাম লেখা হয়নি, কারণ এ ঘটনায় কোনো আদালতের দণ্ড আমরা পাইনি।

১৯৭১ সালের জুনের মাঝামাঝি মোল্লাহাট থানার অর্ধশতাধিক তরুণ নরসিংহপুরের শরীফ আবু তালেবের নেতৃত্বে কালীগঞ্জ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের বশিরহাটে যান। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ অনুযায়ী, সেখান থেকে তাঁদের এক মাসের প্রশিক্ষণের জন্য নেওয়া হয় বিহারের চাকুলিয়া ক্যাম্পে। প্রশিক্ষণ শেষে হিঙ্গলগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে দেশে ঢুকে শমসেরনগর ও চালনা হয়ে তাঁরা পৌঁছান বাজুয়া বাজারে। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, উত্তর খুলনা সাব-সেক্টরে না গিয়ে নিজেদের এলাকা মোল্লাহাটেই আলাদা ক্যাম্প গড়বেন।

৪ অক্টোবর কয়েকটি নৌকায় বাজুয়া থেকে রওনা হয়ে দলটি ফকিরহাটের নওয়াপাড়ায় নামে, তারপর পায়ে হেঁটে মোল্লাহাটের দিকে এগোয়। পথে এক স্থানীয় দালাল খাবারের ব্যবস্থা করার কথা বলে তাঁদের পিলজঙ্গের কাছে নিয়ে আসে এবং ফাঁকে রাজাকারদের খবর দেয়। পিলজঙ্গ গ্রামে যে রাজাকারদের একটি ক্যাম্প আছে, মুক্তিযোদ্ধারা তা জানতেন না। রাত ১২টার দিকে গ্রামে পৌঁছাতেই চার দিক থেকে আক্রমণ শুরু হয়।

দুটি দলে ভাগ হয়ে মুক্তিযোদ্ধারা প্রায় দুই ঘণ্টা লড়াই করেন। রাত দুটোর দিকে কমান্ডার ২২ জনকে নিয়ে পিছু হটলে অন্য প্রান্তে লড়তে থাকা ৩৩ জন বিপদে পড়ে যান; রাজাকাররা তাঁদের ঘিরে ফেলে, সারা রাত গুলিবিনিময় চলে। জ্ঞানকোষের হিসাবে এ যুদ্ধে ১৪ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন এবং পাঁচজন গুরুতর আহত হন। শহীদদের ১১ জন মোল্লাহাটের চরকুলিয়া, মেহেরপুর, কামারগ্রাম, কুলিয়া, নগরকান্দি, সরসপুর ও ঘোষগাতি গ্রামের; বাকি তিনজন চিতলমারীর কলাতলা ও শৈলদহের। কুলিয়া আর নগরকান্দি থেকেই প্রাণ দেন তিনজন করে।

ফকিরহাট নিয়ে জ্ঞানকোষের আরেক অধ্যায়ে সংখ্যাটা ভিন্ন: সেখানে বলা হয়েছে, পিলজঙ্গ যুদ্ধে এবং যুদ্ধের পরে ধরা পড়ে মোট ২০ জন মুক্তিযোদ্ধা ও গ্রামবাসী শহীদ হন। একই দিনে ফকিরহাটের ‘সাধুর সাধের বটতলা’য় আরেকটি যুদ্ধে ১৮ জন মুক্তিযোদ্ধা ও গ্রামবাসীর মৃত্যুর কথাও সেখানে আছে। বাংলাপিডিয়াও পিলজঙ্গ ও বটতলায় যুদ্ধের উল্লেখ করেছে, সঙ্গে শুভদিয়া ইউনিয়নের দেয়াপাড়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে রাজাকারদের অতর্কিত হামলার কথা।

পিলজঙ্গে রক্ত ঝরেছিল আগেও: জ্ঞানকোষ অনুযায়ী ৩০ এপ্রিল রূপসার তালিমপুর গ্রামের তিনজনকে ধরে এনে পিলজঙ্গ হাইস্কুল মাঠে গুলি করে হত্যা করা হয়। ১৬ ডিসেম্বর ফকিরহাট হানাদারমুক্ত হয়। পিলজঙ্গের শহীদদের নাম আজও মোল্লাহাট আর চিতলমারীর শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় পাশাপাশি লেখা আছে।

তথ্যসূত্র

  1. পিলজঙ্গ যুদ্ধ (ফকিরহাট, বাগেরহাট) · সংগ্রামের নোটবুক (মূল সূত্র: বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ, ৬ষ্ঠ খণ্ড)
  2. মুক্তিযুদ্ধে ফকিরহাট উপজেলা (বাগেরহাট) · সংগ্রামের নোটবুক (মূল সূত্র: বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ, ৬ষ্ঠ খণ্ড)
  3. মুক্তিযুদ্ধে মোল্লাহাট উপজেলা (বাগেরহাট) · সংগ্রামের নোটবুক (মূল সূত্র: বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ, ৮ম খণ্ড)
  4. ফকিরহাট উপজেলা · বাংলাপিডিয়া (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ)
  5. Fakirhat Upazila · Banglapedia (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ)

কোনো তথ্য ভুল মনে হলে বা আরও ভালো সূত্র জানা থাকলে নিচে জানান; যাচাই করে ঠিক করা হবে।

ফকিরহাট-এর আরও গল্প

সব দেখুন
ফকির মঙ্গল শাহের আস্তানা থেকে ফকিরহাটজনশ্রুতি অনুযায়ী, ভৈরবের দক্ষিণ তীরে ফকির মঙ্গল শাহ নামে এক সাধকের আস্তানা ঘিরে দোকানপাট বসে, সেখান থেকেই হাট আর নাম ফকিরহাট। দলিলে পাওয়া ইতিহাস শুরু হয় ১৮৬৯ সালের থানা থেকে।ইতিহাস ও জনশ্রুতিমূলঘরের মেয়ে নীলিমা ইব্রাহিমফকিরহাটের মূলঘরের জমিদার পরিবারে জন্ম নেওয়া নীলিমা রায় চৌধুরী পরে হয়ে ওঠেন শিক্ষাবিদ, লেখক, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক। একাত্তরের বীরাঙ্গনাদের জবানি তিনিই পৌঁছে দিয়েছিলেন পাঠকের কাছে।প্রমাণিত ইতিহাসমানসার দুই রক্তাক্ত দিনএকাত্তরে ফকিরহাটের মানসায় দুবার রক্ত ঝরেছে: এপ্রিলে বাজারে গুলি চালিয়ে, আর পরে বেতন তুলতে আসা একদল স্কুলশিক্ষককে ধরে নিয়ে হত্যা করে।প্রমাণিত ইতিহাস