বঙ্কিমচন্দ্রের মহকুমা-সুপারিশের কথা কেবল সরকারি পোর্টালগুলোর (একই লেখা) ভাষ্য; মূল সরকারি নথি আমরা দেখিনি। তদন্তে তাঁর ভূমিকা উইকিপিডিয়ায় সুপ্রকাশ রায়ের বইয়ের সূত্রে আছে।
ব্রিটিশ শাসনের প্রথম দিকে বাগেরহাট ছিল বড় প্রশাসনিক কাঠামোর এক প্রান্ত। জেলা তথ্য বাতায়ন জানায়, ১৭৮৬ সালে লর্ড কর্নওয়ালিসের আমলে যশোরকে জেলা করা হয়; ১৮৪২ সালে খুলনা যখন যশোরের একটি মহকুমা, বাগেরহাট তখন খুলনার অধীন একটি থানা মাত্র। বাংলাপিডিয়াও বাগেরহাট থানা গঠনের সাল ১৮৪২ দিয়েছে, যদিও জেলা প্রশাসনের আরেকটি পাতায় বাগেরহাট ও রামপাল থানা স্থাপনের সাল ১৮৬৩ লেখা।
বদলের সূচনা হয় দক্ষিণের এক রক্তক্ষয়ী ঘটনা থেকে। ১৮৪৯ সালে ‘মোড়েল’ পদবির দুই ইংরেজ এ অঞ্চলে মোড়েলগঞ্জ নামে একটি বন্দর গড়ে তোলেন। ১৮৬১ সালের ২৬ নভেম্বর সেখানে কৃষকনেতা রহিমুল্লাহর সঙ্গে মোড়েলদের লোকজনের যে সংঘর্ষ হয়, তা ‘মোড়েল-রহিমুল্লাহ’ সংঘর্ষ নামে পরিচিত; ঘটনাটির বিস্তারিত গল্প মোড়েলগঞ্জ অংশে। ইংরেজি উইকিপিডিয়া সুপ্রকাশ রায়ের ‘সুন্দরবন অঞ্চলের বিদ্রোহ’ বইয়ের সূত্রে জানায়, খুলনার তখনকার ম্যাজিস্ট্রেট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তদন্তের নির্দেশ দেন, নিজে মোড়েলগঞ্জে যান, জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দীর্ঘ প্রতিবেদন পাঠান এবং পলাতক অভিযুক্তের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।
জেলা তথ্য বাতায়ন, জেলা পরিষদ ও জেলা পুলিশের ওয়েবসাইটে এর পরের অংশটি একই ভাষায় লেখা: সংঘর্ষের তদন্ত করেছিলেন ‘সাহিত্যসম্রাট’ বঙ্কিমচন্দ্র, যিনি তখন খুলনার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, এবং প্রশাসনিক প্রয়োজনে তিনিই বাগেরহাটে একটি মহকুমা স্থাপনের সুপারিশ করেন। এর ফলেই ১৮৬৩ সালে বাগেরহাট যশোর জেলার অধীনে মহকুমার মর্যাদা পায়। জেলা প্রশাসনের পটভূমি পাতায় প্রথম মহকুমা প্রশাসক হিসেবে ‘মি. সান্ডার্স’-এর নাম আছে। মজার ব্যাপার, বঙ্কিম তখনো ঔপন্যাসিক হিসেবে পরিচিত হননি; বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দুর্গেশনন্দিনী’ বের হয় ১৮৬৫ সালে।
মহকুমা হওয়ার পর থানার জাল বিস্তৃত হয়। জেলা প্রশাসনের হিসাবে, মহকুমা সদরে থানা হওয়ার আগে কচুয়ায় একটি পূর্ণাঙ্গ থানা ও ফকিরহাটে পুলিশ চৌকি ছিল; এরপর বাগেরহাট ও রামপাল থানা হয় ১৮৬৩ সালে, মোড়েলগঞ্জ ১৮৬৬ সালে, কচুয়া ও ফকিরহাট ১৮৬৯ সালে এবং শরণখোলা ১৯০৮ সালে। ১৮৮২ সালে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট মহকুমা নিয়ে খুলনা জেলা গঠিত হলে বাগেরহাট যশোর ছেড়ে খুলনার অধীনে আসে।
একই পাতায় ঔপনিবেশিক প্রশাসনের একটি চেনা ছবিও আছে: রাজস্ব জমা হতো সরকারি কোষাগারে, তা খরচে ছিল কড়া বিধিনিষেধ, ফলে স্থানীয় উন্নয়নের অর্থ অনেক সময় জোগাতে হতো সামর্থ্যবান পরিবারগুলোকে। কাড়াপাড়া, মঘিয়া ও বনগ্রামের তিনটি খ্যাত জমিদার পরিবার এ কাজে প্রশাসনকে সহায়তা করত বলে সেখানে উল্লেখ আছে। মহকুমা শহর হিসেবে বাগেরহাটের এই যাত্রা চলেছিল ১২১ বছর, ১৯৮৪ সালে জেলা হওয়া পর্যন্ত।