উনিশ শতকের নদী ও বাণিজ্যের বিবরণ ১৮৭১ সালের সরকারি প্রতিবেদন থেকে; বর্তমান নদীধারার দৈর্ঘ্য জেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইটের। স্টিমার ও চ্যানেলের তথ্য সংবাদপত্রভিত্তিক।
বাগেরহাট শহর দাঁড়িয়ে আছে ভৈরবের পশ্চিম তীরে, আর শহরের বর্ধিত অংশ ভৈরবের দক্ষিণ প্রবাহ দড়াটানার পাড়ে। অথচ এই ভৈরব একসময় ছিল আরও বড় নদী। জে. ওয়েস্টল্যান্ড ১৮৭১ সালে লিখেছেন, ভৈরব আগে কপোতাক্ষ থেকে বেরিয়ে যশোর জেলার মাঝ দিয়ে বয়ে যেত—জেলার ‘প্রধান কেন্দ্রীয় নদী’। আঠারো শতকের শেষ দিকে এর উৎসমুখ পলিতে বুজে যায়; ১৭৯৪ সালের ১৮ জুলাই কালেক্টর লিখেছিলেন, মুখে চর পড়ায় শুকনো মৌসুমে নদী প্রায় শুকিয়ে যায়। ভৈরবের তীরের বাণিজ্যকেন্দ্রের তালিকায় তিনি রেখেছেন ফকিরহাট, বাগেরহাট আর কচুয়াকে।
ওয়েস্টল্যান্ডের সময়েই দেখা যাচ্ছিল, বাগেরহাটের কাছে ভৈরবের বেশির ভাগ পানি দক্ষিণে নেমে যায়, ফলে আট মাইল পুবে কচুয়ার দিকে নদীতে পানি কম। যাত্রাপুরে ভৈরব প্রায় চার মাইল ঘুরে আবার শুরুর জায়গার কাছে ফেরে; সেই সরু ভূখণ্ড কেটে সোজা পথ বানানোর প্রস্তাবও তখন ছিল। আজ জেলা প্রশাসনের হিসাবে মোল্লাহাটের কেন্দুয়া বিল থেকে চিত্রা নামে শুরু হয়ে ভৈরব, দড়াটানা, পয়লাহারা ও পানগুছি হয়ে বলেশ্বর দিয়ে সাগরে পড়া ধারাটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৭৫ কিলোমিটার। কুমার নদী থেকে পানগুছিতে সহজে যেতে বিআইডব্লিউটিএ প্রায় ৭ কিলোমিটারের একটি নদী কেটেছে, যা ‘প্ল্যানের নদী’ বা কাটাখাল নামে পরিচিত।
উনিশ শতকে এই নদীগুলোই ছিল দক্ষিণবঙ্গের ধান-বাণিজ্যের মহাসড়ক। ওয়েস্টল্যান্ড দুটি পথের কথা লিখেছেন। ভেতরের পথটি কচুয়া, বাগেরহাট, খুলনা হয়ে কপোতাক্ষে যেত; আর বড় জাহাজের দক্ষিণের পথটি ঢুকত মোড়েলগঞ্জ দিয়ে, ঘোষখালী ও চিলা-চাঁদপাই খাল হয়ে পসুরে। মোড়েলগঞ্জ থেকে চাঁদখালী যেতে বড় জাহাজের লাগত প্রায় পাঁচ দিন, পথে খাবার পানিও মিলত না। সুন্দরবনের ধান কেনাবেচার হাটের সারিতে ছিল রামপাল (পারিখালী), মোড়েলগঞ্জ আর গৌরম্ভা। মোরেলরা মোড়েলগঞ্জকে বন্দর ঘোষণা করিয়েছিলেন, সমুদ্রগামী জাহাজও সেখান থেকে মাল নিয়েছিল; বাকেরগঞ্জগামী স্টিমার সুন্দরবন পেরিয়ে প্রথম লোকালয় দেখত মোড়েলগঞ্জে। ১৮১৫ সালে কালেক্টর ফকিরহাটকে জেলার তিনটি প্রধান শহরের একটি বলে উল্লেখ করেছিলেন; সেখান থেকে চাল, সুপারি ও নারকেল রপ্তানি হতো।
প্রায় দেড় শ বছর ধরে ঢাকা থেকে দক্ষিণের নদীপথে প্যাডেল স্টিমার—লোকমুখে ‘রকেট’—চলেছে; শেষ দিকে এগুলো চালাত রাষ্ট্রায়ত্ত বিআইডব্লিউটিসি। ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী নাব্যতা কমে যাওয়ায় রুটটি ছোট হয়ে ঢাকা–মোড়েলগঞ্জ পর্যন্ত থামে; পদ্মা সেতু চালুর পর যাত্রী কমে যায়, ২০২২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর তিনটি স্টিমার বহর থেকে সরানো হয় এবং লোকসানের কারণে নিয়মিত সেবা বন্ধ হয়। মোংলা বন্দরের সঙ্গে দেশের ভেতরের নৌপথ জোড়া ৩১ কিলোমিটারের মোংলা-ঘষিয়াখালী চ্যানেলও পলিতে অচল হয়ে পড়েছিল; জাহাজ ঘুরে চলত সুন্দরবনের ভেতরের নদী দিয়ে। ২০১৪ সালের ১ জুলাই খনন শুরু হয়, ২০১৫ সালের ৬ মে আট ফুট ড্রাফটের জাহাজ চলতে শুরু করে, আর ২০১৬ সালের অক্টোবরে ১৪ ফুট ড্রাফটের জাহাজের জন্য চ্যানেলটি খুলে দেওয়া হয়।
নদীর গতিপথ বদলেছে, হাট সরেছে, স্টিমারের হুইসেল থেমেছে। তবু বাগেরহাটের ইতিহাস পড়তে হলে আজও নদীর মানচিত্রটাই সবচেয়ে ভালো সূচিপত্র।