পরগনা, কাচারি আর জমিদার: উনিশ শতকের বাগেরহাটের মালিক কারা ছিলেন

প্রমাণিত ইতিহাসব্রিটিশ আমলউনিশ শতকমূলঘর, যাত্রাপুর, কচুয়া, ফকিরহাট, কাড়াপাড়া, বনগ্রাম

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর বাগেরহাটের জমি ভাগ হয়েছিল কয়েকটি পরগনায়, যাদের অনেক মালিক থাকতেন কলকাতায়। জমিদারের খেয়ালে হাট সরেছে, কাচারি বসেছে মূলঘর-যাত্রাপুরে—১৮৭১ সালের এক সরকারি প্রতিবেদনে সেই ছবি।

পরগনা ও জমিদারদের বিবরণ ১৮৭১ সালের সরকারি প্রতিবেদন থেকে; তিন রাজপরিবারের প্রশাসনিক সহযোগিতার কথা জেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইটের। বাগেরহাটের গঞ্জের নামকরণ নিয়ে ওয়েস্টল্যান্ড নিজেই অনিশ্চিত ছিলেন।

উনিশ শতকের বাগেরহাটকে বুঝতে হলে মানচিত্রটা দেখতে হয় পরগনার চোখে। ১৮৭১ সালে জে. ওয়েস্টল্যান্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাগেরহাট মহকুমার উত্তরের ত্রিভুজ—আঠারোবাঁকি, মধুমতী আর ভৈরবের মাঝের জমি—ছিল সুলতানপুর-খড়রিয়া পরগনা। মালিক কলকাতার দত্ত পরিবার, কাশীনাথ দত্তের উত্তরসূরিরা; তাঁদের জমিদারি কাচারি ছিল মানসার উল্টো দিকে মূলঘরে। ভৈরবের দক্ষিণে চিরুলিয়া পরগনা ছিল গোবরডাঙার জমিদার পরিবারের, যারা ১৮১৩ সালে এটি কিনেছিল; তাদের কাচারি যাত্রাপুরে।

মহকুমার পূর্ব অংশ আর বাকেরগঞ্জের লাগোয়া এলাকা ছিল সেলিমাবাদ পরগনা। এর প্রধান মালিক কলকাতাবাসী ঘোষাল পরিবার (রাজা সত্যানন্দ ঘোষাল) আর বাকেরগঞ্জের দেব পরিবার। খাজনা বকেয়ার কারণে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর পরগনাটি টুকরো টুকরো নিলামে ওঠে; এসব আলাদা তালুকের বড় মালিক ছিলেন বনগ্রামের (বানগাঁও) বাবু মহিমাচন্দ্র রায়। আর বাগেরহাটের কাছের জমি পড়ত খলিফাতাবাদ পরগনায়, যেখানে জমিদারি ছিল কাড়াপাড়ার প্রাচীন রায় পরিবারের।

জমিদারের ইচ্ছায় হাটবাজারের জায়গাও বদলাত। ওয়েস্টল্যান্ড লিখেছেন, কচুয়ার হাট আগে খালের ওপরের পাকা সেতুর কাছে বসত, কিন্তু জমিদারদের জুলুম আর অতিরিক্ত আদায়ের কারণে আধা মাইল পশ্চিমে সরে যায়, যেখানে আরেক জমিদার কম কড়াকড়ির শর্তে জায়গা দেন। ফকিরহাটের বাজারও দুবার সরেছে—প্রথমে জমিদার রাধামোহন ঘোষ চৌধুরী, পরে শ্যামাপ্রসাদ রায় নিজের জমিতে নিয়ে যান; নতুন গঞ্জের নাম হয় তাঁর ভাই কালীপ্রসাদ রায়ের নামে কালীগঞ্জ। বাগেরহাটের নিজের গঞ্জটির নামও, ওয়েস্টল্যান্ডের ধারণায়, কাড়াপাড়া পরিবারের এক সদস্যের নামে রাখা হয়েছিল।

জমিদারেরা শুধু খাজনাই তুলতেন না, প্রশাসনের সঙ্গেও জড়িয়ে ছিলেন। জেলা প্রশাসনের ইতিহাস-পাতা বলছে, ব্রিটিশ আমলে আদায় করা রাজস্ব কোষাগারে জমা দিতে হতো, তাই ছোটখাটো উন্নয়নের টাকা জোগাতেন স্থানীয় সামর্থ্যবান পরিবার; কাড়াপাড়া, মঘিয়া ও বনগ্রামের তিনটি খ্যাত রাজপরিবার এ কাজে প্রশাসনকে সাহায্য করত। ওয়েস্টল্যান্ডও লিখেছেন, নতুন মহকুমা সদরে মহকুমা প্রশাসকের বাসভবনের সামনে নদীতে একটি ঘাট বানিয়ে দিয়েছিলেন বনগ্রামের মহিমাচন্দ্র রায়।

সেই জমিদারি যুগের চিহ্ন আজও খুঁজলে মেলে। বাংলাপিডিয়া মোড়েলগঞ্জ উপজেলার প্রত্নসম্পদের তালিকায় বনগ্রামের রাজবাড়ি রেখেছে, কচুয়ায় মঘিয়ার জমিদারবাড়ির পাশের কালীমন্দির আর ফকিরহাটে নওয়াপাড়া ঘোষ জমিদারবাড়ির কথা লিখেছে। তবে এসব পরিবারের পূর্ণ ইতিহাস লেখার মতো আধুনিক গবেষণা এখনো কম; ওয়েস্টল্যান্ডের প্রতিবেদনই এ বিষয়ে সবচেয়ে বিস্তারিত পুরোনো সূত্র।

গল্পের জায়গাগুলো

তথ্যসূত্র

  1. A Report on the District of Jessore: Its Antiquities, Its History, and Its Commerce (J. Westland) · Bengal Secretariat Office, Calcutta (Internet Archive-এ স্ক্যান), ১৮৭১
  2. জেলা প্রশাসনের পটভূমি · বাগেরহাট জেলা তথ্য বাতায়ন (জেলা প্রশাসন), ২০১২
  3. Morrelganj Upazila · বাংলাপিডিয়া (ইংরেজি), ২০২১
  4. Kachua Upazila (Bagerhat District) · বাংলাপিডিয়া (ইংরেজি), ২০২১
  5. Fakirhat Upazila · বাংলাপিডিয়া (ইংরেজি), ২০২১

কোনো তথ্য ভুল মনে হলে বা আরও ভালো সূত্র জানা থাকলে নিচে জানান; যাচাই করে ঠিক করা হবে।

বাগেরহাট সদর-এর আরও গল্প

সব দেখুন
সমাধির পাথরে লেখা শেষ কথাখানজাহানের সমাধিবেদির পাথরই তাঁর সম্পর্কে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য দলিল। সেখানে তিনি নিজেকে বলেছেন বৃদ্ধ, দুর্বল এক প্রবাসী—আর লিখে রেখেছেন মৃত্যুর তারিখ।প্রমাণিত ইতিহাসখলিফাতাবাদ: খানজাহানের পরের টাকশাল-শহর আর মোগল ‘সরকার’খানজাহানের মৃত্যুর পরও খলিফাতাবাদ হারিয়ে যায়নি। সুলতানদের মুদ্রায় এর নাম উঠেছে, মোগল রাজস্বের খাতায় এটি ছিল আস্ত এক ‘সরকার’—আর বাগেরহাটের ‘দশানী’ নামেও হয়তো লুকিয়ে আছে সেই হিসাবের ছাপ।প্রমাণিত ইতিহাসপ্রতাপাদিত্য, ফিরিঙ্গি আর মগ: বারো ভূঁইয়ার যুগে বাগেরহাটষোড়শ-সপ্তদশ শতকে যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজ্য ছুঁয়ে ছিল আজকের বাগেরহাট; একই সময়ে পর্তুগিজ ‘ফিরিঙ্গি’ আর আরাকানি মগ জলদস্যুর হানায় উজাড় হয়েছিল দক্ষিণের বহু জনপদ। কোনটা প্রমাণিত, কোনটা জনশ্রুতি?ইতিহাস ও জনশ্রুতিভৈরবের বাঁকে বাঁকে: নদী, হাট আর নৌপথের বাগেরহাটএকসময় বাগেরহাটে চলাফেরা মানেই ছিল নৌকা। কলকাতাগামী ধানের জাহাজ, মোড়েলগঞ্জের বন্দর, স্টিমারের হুইসেল—মরে আসা ভৈরব আর বদলে যাওয়া নদীপথের গল্প।প্রমাণিত ইতিহাস