প্রতাপাদিত্য, ফিরিঙ্গি আর মগ: বারো ভূঁইয়ার যুগে বাগেরহাট

ইতিহাস ও জনশ্রুতিমোগল আমল১৫৭৪–১৬৬৬কাড়াপাড়া ও অযোধ্যা (যাত্রাপুর), বাগেরহাট সদর; দক্ষিণের নদীপথ

ষোড়শ-সপ্তদশ শতকে যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজ্য ছুঁয়ে ছিল আজকের বাগেরহাট; একই সময়ে পর্তুগিজ ‘ফিরিঙ্গি’ আর আরাকানি মগ জলদস্যুর হানায় উজাড় হয়েছিল দক্ষিণের বহু জনপদ। কোনটা প্রমাণিত, কোনটা জনশ্রুতি?

প্রতাপাদিত্যের রাজ্য, পতন ও মগ-পর্তুগিজ দস্যুতার তথ্য বাংলাপিডিয়া ও গবেষকের লেখা থেকে। কোদলা মঠ প্রতাপাদিত্যের আমলের—এটি জেলা তথ্য বাতায়নের বক্তব্য; শিলালিপিতে রাজার নাম নেই। কাড়াপাড়ার রায় পরিবারের বংশধারা একটি পারিবারিক দাবি।

মোগলরা পুরো বাংলা দখলে নেওয়ার আগে ভাটি অঞ্চলের নদী-জঙ্গলে স্থানীয় ভূস্বামীরা প্রায় স্বাধীনভাবে রাজত্ব করতেন; ইতিহাসে তাঁরা বারো ভূঁইয়া। বাংলাপিডিয়া জানায়, সুলতান দাউদ খান কররানীর কর্মকর্তা শ্রীহরি ১৫৭৪ সালে খুলনার দক্ষিণের জলাভূমিতে রাজ্য গড়েন, আর ১৫৮৪ সালে সিংহাসনে বসেন তাঁর ছেলে প্রতাপাদিত্য। তাঁর রাজ্য বৃহত্তর যশোর, খুলনা ও বরিশালের বড় অংশজুড়ে ছিল। রাজধানী ধূমঘাট-ঈশ্বরীপুর (আজকের সাতক্ষীরা) আর জামাতা রামচন্দ্রের বাকলা (বরিশাল)—এই দুইয়ের মাঝখানেই আজকের বাগেরহাট।

প্রতাপাদিত্যের বাহিনীতে পর্তুগিজ ‘ফিরিঙ্গি’, আফগান ও পাঠান যোদ্ধা ছিল। ১৬০৯ সালে তিনি সুবাদার ইসলাম খানের কাছে বশ্যতা স্বীকার করেও প্রতিশ্রুতি রাখেননি। ১৬১১ সালের ডিসেম্বরে মোগল অভিযান আসে; সালকায় তাঁর নৌবহর হারে, ১৬১২ সালের জানুয়ারিতে কাগারঘাটে তিনি আত্মসমর্পণ করেন। বাংলাপিডিয়ার মতে বন্দি অবস্থায় তাঁর মৃত্যুর নিশ্চিত তথ্য নেই, সম্ভবত দিল্লির পথে বেনারসে। উনিশ শতকে ওয়েস্টল্যান্ড প্রচলিত কাহিনি অনুসরণ করে মানসিংহের হাতে তাঁর পতনের কথা লিখেছিলেন; বাংলাপিডিয়ার বিবরণ এর থেকে আলাদা।

বাগেরহাটের সঙ্গে যোগসূত্র দুটি, দুটিই সতর্কভাবে পড়ার মতো। জেলা তথ্য বাতায়ন বলছে, যাত্রাপুরের অযোধ্যা গ্রামের কোদলা মঠ প্রতাপাদিত্যের সময়ে নির্মিত। বাংলাপিডিয়া অবশ্য শুধু জানায়, মঠের কার্নিশের বাংলা শিলালিপি অনুযায়ী এক ব্রাহ্মণ দেবতা তারকব্রহ্মের উদ্দেশে এটি গড়েছিলেন, সম্ভবত সপ্তদশ শতকের গোড়ায়; রাজার নাম সেখানে নেই। দ্বিতীয়ত, ওয়েস্টল্যান্ড ১৮৭১ সালে লিখেছেন, বাগেরহাটের কাছে কাড়াপাড়ার প্রাচীন রায় পরিবার নিজেদের মাতৃধারায় প্রতাপাদিত্যের বংশধর বলে দাবি করে—দাবিটি পরিবারের, স্বাধীনভাবে প্রমাণিত নয়।

একই যুগে দক্ষিণের নদীপথে নামে আরেক আতঙ্ক। বাংলাপিডিয়া জানায়, সন্দ্বীপকে ঘাঁটি করে পর্তুগিজ জলদস্যুরা আরাকানের মগদের সঙ্গে মিলে দ্রুতগামী নৌকায় উপকূলে হানা দিত, মানুষ ধরে নিয়ে বিক্রি করত; শিহাবুদ্দিন তালিশের বিবরণে হুগলি ও তমলুকের দাস-বাজারের কথা আছে। বাংলাপিডিয়ার শায়েস্তা খান ভুক্তিতে সমকালীন বর্ণনা উদ্ধৃত হয়েছে—চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত জলদস্যুদের যাতায়াতপথে নদীর দুই পাড়ে একটি বাড়িতেও মানুষ ছিল না। ১৬৬৬ সালের ২৬ জানুয়ারি শায়েস্তা খানের চট্টগ্রাম জয়ের পর এই দস্যুতা থামে, আর হাজারো বন্দি কৃষক ঘরে ফেরে।

বাগেরহাটের কোন গ্রামে কবে হানা হয়েছিল, এমন নির্দিষ্ট নথি আমরা পাইনি। তবে ওয়েস্টল্যান্ড লক্ষ করেছিলেন, সুন্দরবনের ভেতরে পরিত্যক্ত বসতির চিহ্ন নিয়ে স্থানীয়রা মারাঠা আক্রমণের গল্প বলত, যা তিনি বিশ্বাস করেননি; কিন্তু মগরা যে একসময় এ অঞ্চলে বসবাস করত, তা তাঁর কাছে নিশ্চিত মনে হয়েছিল। বারো ভূঁইয়া আর জলদস্যুর এই যুগ তাই বাগেরহাটের ইতিহাসে আছে আবছা ছায়ার মতো—বড় ছবিটা স্পষ্ট, স্থানীয় খুঁটিনাটি এখনো অনুসন্ধানের বিষয়।

গল্পের জায়গাগুলো

তথ্যসূত্র

  1. Pratapaditya, Raja · বাংলাপিডিয়া (ইংরেজি), ২০২১
  2. Portuguese, The · বাংলাপিডিয়া (ইংরেজি), ২০২১
  3. Shaista Khan · বাংলাপিডিয়া (ইংরেজি), ২০২১
  4. কোদলা মঠ · বাংলাপিডিয়া, ২০২১
  5. Two forgotten kingdoms of Bengal (Rila Mukherjee) · দ্য ডেইলি স্টার, ২০২৫
  6. বাগেরহাট জেলার পটভূমি · বাগেরহাট জেলা তথ্য বাতায়ন (জেলা প্রশাসন), ২০১৪
  7. A Report on the District of Jessore: Its Antiquities, Its History, and Its Commerce (J. Westland) · Bengal Secretariat Office, Calcutta (Internet Archive-এ স্ক্যান), ১৮৭১

কোনো তথ্য ভুল মনে হলে বা আরও ভালো সূত্র জানা থাকলে নিচে জানান; যাচাই করে ঠিক করা হবে।

বাগেরহাট সদর-এর আরও গল্প

সব দেখুন
সমাধির পাথরে লেখা শেষ কথাখানজাহানের সমাধিবেদির পাথরই তাঁর সম্পর্কে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য দলিল। সেখানে তিনি নিজেকে বলেছেন বৃদ্ধ, দুর্বল এক প্রবাসী—আর লিখে রেখেছেন মৃত্যুর তারিখ।প্রমাণিত ইতিহাসখলিফাতাবাদ: খানজাহানের পরের টাকশাল-শহর আর মোগল ‘সরকার’খানজাহানের মৃত্যুর পরও খলিফাতাবাদ হারিয়ে যায়নি। সুলতানদের মুদ্রায় এর নাম উঠেছে, মোগল রাজস্বের খাতায় এটি ছিল আস্ত এক ‘সরকার’—আর বাগেরহাটের ‘দশানী’ নামেও হয়তো লুকিয়ে আছে সেই হিসাবের ছাপ।প্রমাণিত ইতিহাসভৈরবের বাঁকে বাঁকে: নদী, হাট আর নৌপথের বাগেরহাটএকসময় বাগেরহাটে চলাফেরা মানেই ছিল নৌকা। কলকাতাগামী ধানের জাহাজ, মোড়েলগঞ্জের বন্দর, স্টিমারের হুইসেল—মরে আসা ভৈরব আর বদলে যাওয়া নদীপথের গল্প।প্রমাণিত ইতিহাসপরগনা, কাচারি আর জমিদার: উনিশ শতকের বাগেরহাটের মালিক কারা ছিলেনচিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর বাগেরহাটের জমি ভাগ হয়েছিল কয়েকটি পরগনায়, যাদের অনেক মালিক থাকতেন কলকাতায়। জমিদারের খেয়ালে হাট সরেছে, কাচারি বসেছে মূলঘর-যাত্রাপুরে—১৮৭১ সালের এক সরকারি প্রতিবেদনে সেই ছবি।প্রমাণিত ইতিহাস