সমাধির পাথরে লেখা শেষ কথা

প্রমাণিত ইতিহাসসুলতানি আমল ও খান জাহান১৪৫৯ সাল (৮৬৩ হিজরি)খানজাহান আলী মাজার, ঠাকুর দিঘির উত্তর পাড়, বাগেরহাট সদর

খানজাহানের সমাধিবেদির পাথরই তাঁর সম্পর্কে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য দলিল। সেখানে তিনি নিজেকে বলেছেন বৃদ্ধ, দুর্বল এক প্রবাসী—আর লিখে রেখেছেন মৃত্যুর তারিখ।

ঠাকুর দিঘির উত্তর পাড়ে উঁচু ঢিবির ওপর এক গম্বুজের বর্গাকার সমাধিসৌধ। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী বাইরের প্রতিটি বাহু প্রায় ১৩.৭ মিটার, দেয়াল ২.৪ মিটার পুরু, আর নিচের প্রায় এক মিটার পর্যন্ত দেয়াল পাথরে মোড়া, যাতে লোনা মাটির আর্দ্রতা ইট নষ্ট করতে না পারে। ভেতরে-বাইরে দুই দিকেই বর্গাকার সমাধিসৌধ বাংলায় এটিই প্রথম বলে বাংলাপিডিয়ার মত। মাঝখানে ধাপে ধাপে উঠে যাওয়া সমাধিবেদি; ওপরের তিন ধাপ পাথরের, নিচের ধাপ ও মেঝেতে ছিল রঙিন চকচকে টালি, যার অনেকটাই আজ ক্ষয়ে গেছে।

এই পাথরগুলোই খানজাহান সম্পর্কে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দলিল। আরবি ও ফারসি লিপির বেশির ভাগই ধর্মীয় বাণী—আল্লাহর ৯৯ নাম, কোরআনের আয়াত। ১৯০৮ সালের খুলনা গেজেটিয়ার ও সতীশচন্দ্র মিত্রের ‘যশোহর-খুলনার ইতিহাস’ (১৯১৪) লিপিগুলোর অনুবাদ দিয়েছে। শীর্ষপাথরের দক্ষিণ দিকে লেখা আছে, এই সমাধি মহান খান খানজাহানের, যা জান্নাতের বাগানের অংশ। একটি বৃত্তের ভেতরের লিপিতে আছে তাঁর আত্মপরিচয়: আল্লাহর এক বৃদ্ধ, দুর্বল, করুণাপ্রার্থী দাস, জ্ঞানীদের বন্ধু, ইসলামের সহায়; নাম ‘উলুঘ খানজাহান’। আরেক জায়গায় লেখা, যিনি মারা গেলেন তিনি এক প্রবাসী।

মৃত্যুর তারিখও লিপিতে আছে: ৮৬৩ হিজরির ২৬ জিলহজ বুধবার রাতে তিনি মারা যান, পরদিন বৃহস্পতিবার ২৭ জিলহজ তাঁকে দাফন করা হয়। খ্রিস্টীয় তারিখে রূপান্তর নিয়ে সামান্য মতভেদ আছে—জেলা তথ্য বাতায়ন লিখেছে ২৩ বা ২৪ অক্টোবর ১৪৫৯, মিত্র লিখেছেন ২৩ অক্টোবর, আর বাংলাপিডিয়া ২৭ জিলহজ ধরে ২৫ অক্টোবর ১৪৫৯ উল্লেখ করেছে। বছর নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই: ১৪৫৯।

নিচের ধাপে একটি ফারসি কবিতা আছে, যার মর্ম—জীবন শুরু হয় কান্না দিয়ে, মাঝে কষ্ট আর পরীক্ষা, শেষে আসে মৃত্যু; মৃত্যু নিশ্চিত, মৃত্যু অবধারিত। মিত্রের ধারণা, খানজাহান নিজেই লিপির কথাগুলো ঠিক করে রেখেছিলেন, শুধু তারিখটি পরে বসানো হয়েছিল, কারণ পাথরের এমন সমাধিমঞ্চ এক দিনে বানানো যায় না। বাংলাপিডিয়াও মনে করে, ভবনটি সম্ভবত তাঁর জীবদ্দশাতেই তৈরি হয়েছিল।

সমাধির ঠিক পশ্চিমে তাঁর দেওয়ান মুহম্মদ তাহিরের (পীর আলী) পাথরের সমাধিবেদি; তাতেও ৮৬৩ হিজরির জিলহজ মাস লেখা। কমপ্লেক্সে আছে এক গম্বুজের একটি মসজিদ আর ‘রান্নাঘর’ নামে পরিচিত একটি ভবন, যার আসল ব্যবহার অজানা। ইউনেস্কো এই সমাধিকে স্থাপত্য ও লিপিকলার অসাধারণ নিদর্শন বলেছে। জেলা তথ্য বাতায়ন অনুযায়ী প্রতিবছর ২৫ অগ্রহায়ণ ওরস এবং চৈত্রের প্রথম পূর্ণিমায় মেলা হয়। চৈত্র পূর্ণিমার এই মেলা যে দেড়শ বছর আগেও সুন্দরবন অঞ্চলের সবচেয়ে বড় মেলাগুলোর একটি ছিল, তা ওয়েস্টল্যান্ডের ১৮৭১ সালের প্রতিবেদনে লেখা আছে।

গল্পের জায়গাগুলো

তথ্যসূত্র

  1. Khan Jahan's Tomb, Bagerhat · বাংলাপিডিয়া (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ), ২০২১
  2. Khan Jahan · বাংলাপিডিয়া (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ), ২০২১
  3. হযরত খানজাহান আলী (রঃ) ও তাঁর মাজার · বাগেরহাট জেলা তথ্য বাতায়ন, ২০১৯
  4. Bengal District Gazetteers: Khulna — L. S. S. O'Malley · ইন্টারনেট আর্কাইভ (মূল প্রকাশ, কলকাতা), ১৯০৮
  5. যশোহর-খুলনার ইতিহাস, প্রথম খণ্ড — সতীশচন্দ্র মিত্র · চক্রবর্তী চ্যাটার্জি অ্যান্ড কোং, কলকাতা (ইন্টারনেট আর্কাইভে সংরক্ষিত), ১৯১৪
  6. A Report on the District of Jessore: Its Antiquities, Its History, and Its Commerce — J. Westland · ইন্টারনেট আর্কাইভ (মূল প্রতিবেদন, কলকাতা), ১৮৭১
  7. Historic Mosque City of Bagerhat (Outstanding Universal Value) · UNESCO World Heritage Centre, ১৯৮৫
  8. Mausoleum of Khan Jahan Ali · উইকিপিডিয়া (ইংরেজি)

কোনো তথ্য ভুল মনে হলে বা আরও ভালো সূত্র জানা থাকলে নিচে জানান; যাচাই করে ঠিক করা হবে।

বাগেরহাট সদর-এর আরও গল্প

সব দেখুন
খলিফাতাবাদ: খানজাহানের পরের টাকশাল-শহর আর মোগল ‘সরকার’খানজাহানের মৃত্যুর পরও খলিফাতাবাদ হারিয়ে যায়নি। সুলতানদের মুদ্রায় এর নাম উঠেছে, মোগল রাজস্বের খাতায় এটি ছিল আস্ত এক ‘সরকার’—আর বাগেরহাটের ‘দশানী’ নামেও হয়তো লুকিয়ে আছে সেই হিসাবের ছাপ।প্রমাণিত ইতিহাসপ্রতাপাদিত্য, ফিরিঙ্গি আর মগ: বারো ভূঁইয়ার যুগে বাগেরহাটষোড়শ-সপ্তদশ শতকে যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজ্য ছুঁয়ে ছিল আজকের বাগেরহাট; একই সময়ে পর্তুগিজ ‘ফিরিঙ্গি’ আর আরাকানি মগ জলদস্যুর হানায় উজাড় হয়েছিল দক্ষিণের বহু জনপদ। কোনটা প্রমাণিত, কোনটা জনশ্রুতি?ইতিহাস ও জনশ্রুতিভৈরবের বাঁকে বাঁকে: নদী, হাট আর নৌপথের বাগেরহাটএকসময় বাগেরহাটে চলাফেরা মানেই ছিল নৌকা। কলকাতাগামী ধানের জাহাজ, মোড়েলগঞ্জের বন্দর, স্টিমারের হুইসেল—মরে আসা ভৈরব আর বদলে যাওয়া নদীপথের গল্প।প্রমাণিত ইতিহাসপরগনা, কাচারি আর জমিদার: উনিশ শতকের বাগেরহাটের মালিক কারা ছিলেনচিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর বাগেরহাটের জমি ভাগ হয়েছিল কয়েকটি পরগনায়, যাদের অনেক মালিক থাকতেন কলকাতায়। জমিদারের খেয়ালে হাট সরেছে, কাচারি বসেছে মূলঘর-যাত্রাপুরে—১৮৭১ সালের এক সরকারি প্রতিবেদনে সেই ছবি।প্রমাণিত ইতিহাস