মুদ্রা, সরকার ও জায়গিরের তথ্য বাংলাপিডিয়া ও ওয়েস্টল্যান্ডের ১৮৭১ সালের সরকারি প্রতিবেদনভিত্তিক। টাকশাল মিঠাপুকুরের কাছে ছিল—এটি জেলা তথ্য বাতায়নের অনুমান। ‘দশ-আনি’ থেকে আজকের দশানী নাম—এ যোগসূত্রটি যাচাই করা যায়নি।
১৪৫৯ সালে খানজাহান আলীর মৃত্যুর পর তাঁর গড়া জনপদের কী হলো? জেলা তথ্য বাতায়ন বলছে, এরপর হোসেনশাহি বংশের শাসকেরা এ অঞ্চল শাসন করতেন। বাংলাপিডিয়ার ‘খলিফাতাবাদ’ ভুক্তি অনুযায়ী জনপদটি ছিল ভৈরবের তীরে, আজকের বাগেরহাট শহর ঘিরে, আর আঠারো শতকের শেষ পর্যন্ত আশপাশের এলাকা ‘হাভেলি খলিফাতাবাদ’ নামে পরিচিত ছিল।
খলিফাতাবাদের নাম সবচেয়ে স্পষ্ট টিকে আছে মুদ্রায়। বাংলাপিডিয়ার ‘মিন্ট টাউনস’ ভুক্তি জানায়, ৯২২ হিজরি (১৫১৬ খ্রিস্টাব্দ) থেকে নাসিরুদ্দিন নুসরত শাহের নামে এখানকার টাকশাল থেকে মুদ্রা বের হয়। একই ভুক্তিতে তাঁর রাজত্বকাল ১৫১৯–১৫৩২ লেখা, তাই প্রথম মুদ্রার সালটি নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহের আমলেও টাকশাল চালু ছিল; এখানকার শেষ জানা মুদ্রাটি ৯৪২ হিজরির (১৫৩৫)। ৯৪১ হিজরির (১৫৩৪) একটি মুদ্রায় টাকশালের নাম ‘খলিফাতাবাদ-বদরপুর’; সুলতান নিজের উপাধি ‘আবদুল বদর’ থেকে নামটি জুড়েছিলেন বলে বাংলাপিডিয়ার ব্যাখ্যা। জেলা তথ্য বাতায়নের মতে টাকশালটি সম্ভবত শহরের মিঠাপুকুরের কাছে ছিল। ষোড়শ শতকের ইউরোপীয় মানচিত্রে নামটি বিকৃত হয়ে এসেছে ‘কুইপাতাভাজ’ (Cuipata-vaz) রূপে।
মোগল আমলে খলিফাতাবাদ হয় রাজস্ব প্রশাসনের একটি ‘সরকার’। বাংলাপিডিয়া জানায়, রাজা টোডরমল ১৫৮২ সালে বাংলাকে ১৯টি সরকারে ভাগ করেন; তার একটি খলিফাতাবাদ, যা দক্ষিণ যশোর ও পশ্চিম বাকেরগঞ্জ জুড়ে ৩৫টি মহালে বিভক্ত ছিল। ১৮৭১ সালে জে. ওয়েস্টল্যান্ড লিখেছেন, আরও ৩৪টি পরগনাসহ খলিফাতাবাদের রাজস্ব ধার্য হয়েছিল ১,৩৫,০৫৩ টাকা, আর এর সীমা উত্তরে অন্তত নলদী পরগনা পর্যন্ত গিয়েছিল।
আঠারো শতকে খলিফাতাবাদের আয়ের একাংশ চলে যায় মুর্শিদাবাদের নবাব পরিবারের এক বেগমের হাতে। ওয়েস্টল্যান্ডের বিবরণে, শতকের মাঝামাঝি নবাব ‘বাহু বেগম’ নামে পরিচিত এক বেগমকে জায়গির দেন, যার মধ্যে ছিল খলিফাতাবাদ পরগনার ছয় আনা অংশ। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় জায়গিরটি নগদ ভাতায় বদলানো হয়; ১৭৯৪ সালে বেগমের মৃত্যুর পর তা সরকারের হাতে ফেরে। বাগেরহাটে জায়গির আদায়ের পুরোনো কাচারিটি লোকে ‘বাসাবাড়ি’ নামে চিনত, আর পাশের গ্রামের নাম ছিল ‘দশ-আনি’। ওয়েস্টল্যান্ডের ব্যাখ্যা: পরগনার দশ আনা খাজনা দিত সরকারকে, ছয় আনা ছিল বেগমের—সেখান থেকেই নামটি। আজকের বাগেরহাট শহরের দশানী এলাকার নাম এরই উত্তরসূরি কি না, তা আলাদা সূত্রে আমরা যাচাই করতে পারিনি।
ব্রিটিশ আমলেও নামটি টিকে ছিল। ওয়েস্টল্যান্ডের সময়ে বাগেরহাটের কাছের জমি ‘খলিফাতাবাদ পরগনা’র অংশ হিসেবেই গণ্য হতো, যেখানে কাড়াপাড়ার রায় পরিবারের জমিদারি ছিল। খানজাহানের নগরের অনেকটা হয়তো জঙ্গলে ঢেকেছিল, কিন্তু তাঁর দেওয়া নামটি সাড়ে তিন শ বছরেরও বেশি সময় রাজস্বের খাতায় বেঁচে ছিল।