একাত্তরের বাগেরহাট: নবম সেক্টর, গণহত্যা আর ১৭ ডিসেম্বর

প্রমাণিত ইতিহাসমুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১মার্চ–ডিসেম্বর ১৯৭১বাগেরহাট জেলার সব উপজেলা

মুক্তিযুদ্ধে বাগেরহাট ছিল ৯ নম্বর সেক্টরে। এপ্রিল থেকে জেলাজুড়ে গণহত্যা, সুন্দরবনে গেরিলা ঘাঁটি, মোংলায় নৌ-কমান্ডো অভিযান—আর বিজয়ের পরদিন, ১৭ ডিসেম্বর শত্রুমুক্ত হয় বাগেরহাট।

ঘটনা ও সংখ্যা বাংলাপিডিয়ার জেলা ও উপজেলা ভুক্তি এবং ট্রাইব্যুনালের অভিযোগ-সংক্রান্ত সংবাদ থেকে। কিছু তারিখ ও সংখ্যা সূত্রভেদে আলাদা, গল্পে তা উল্লেখ করা হয়েছে। চাকুলিয়া যুদ্ধের নিহতের সংখ্যা কেবল বাংলাপিডিয়ায় পাওয়া গেছে।

বাংলাপিডিয়া জানায়, মুক্তিযুদ্ধের সময় বাগেরহাট ছিল ৯ নম্বর সেক্টরের অধীনে। এই সেক্টরের আওতায় ছিল বরিশাল, পটুয়াখালী এবং খুলনা ও ফরিদপুরের অংশ; সদর দপ্তর হাসনাবাদে, আর জুলাই থেকে অধিনায়ক মেজর এম এ জলিল। অধ্যাপক নাদির জুনাইদ ডেইলি স্টারে লিখেছেন, এ সেক্টরে নিয়মিত সেনা ইউনিট ছিল না; সেনা, পুলিশ ও সাধারণ মানুষের নানা গেরিলা দল মিলে এটি গড়ে ওঠে। সুন্দরবন, পিরোজপুর ও বাগেরহাট এলাকার সাব-সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিন আহমেদ, যাঁকে লোকে ‘সুন্দরবনের মুকুটহীন রাজা’ বলত।

এ জেলার মানুষকে দিতে হয়েছে চরম মূল্য। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে ২১ এপ্রিল চিতলমারীর খালিশাখালী ও বাবুগঞ্জ বাজারে প্রায় দুই শ মানুষকে হত্যা করা হয়; তাঁদের স্মরণে সন্তোষপুরে স্মৃতিস্তম্ভ আছে। কচুয়ার বাধাল ইউনিয়নের শাখারীকাঠি হাটে ৪২ জনকে হত্যা করা হয় (বাংলাপিডিয়ায় তারিখ ৩ মে, ট্রাইব্যুনালের অভিযোগে ৫ নভেম্বর)। ২১ মে রামপালের ডাকরা কালীমন্দিরে ভারতে যাওয়ার জন্য জড়ো হওয়া হিন্দু জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা হয়; ট্রাইব্যুনালের অভিযোগে নিহতের সংখ্যা ৬০০–৭০০। মে মাসের শেষে মোড়েলগঞ্জ বাজারে গণহত্যা, শরণখোলার ত্যাড়াবাঁকা খালে শতাধিক মানুষ হত্যা, ২৫ আগস্ট ফকিরহাটের মানসায় ৯ জন, আর ১৫ অক্টোবর কচুয়ার ভাসা বাজার থেকে ধরে নেওয়া মানুষদের ভাসারহাট সেতুর কাছে হত্যা করা হয়—সংখ্যাটি বাংলাপিডিয়ার জেলা ভুক্তিতে ৭০, উপজেলা ভুক্তিতে ৬০। বাংলাপিডিয়া জেলায় ৯টি স্থানে গণকবর, ৪টি বধ্যভূমি ও ৮টি স্মৃতিস্তম্ভের কথা লিখেছে।

প্রতিরোধও থেমে থাকেনি। বাগেরহাট সদরে পানিঘাট, দেবীর বাজার ও মাধবকাঠিতে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর লড়াই হয়; এখানকার স্থানীয় গেরিলা দল রফিক বাহিনীর গল্প আলাদা করে বলা হয়েছে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী মোল্লাহাটের চাকুলিয়ায় এক সম্মুখযুদ্ধে একজন ক্যাপ্টেনসহ প্রায় দুই শ পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়, আর ২১ অক্টোবর শরণখোলার বগীতে তীব্র যুদ্ধ হয়।

সবচেয়ে আলোচিত অভিযানটি মোংলায়। ১৫ আগস্ট রাতে ‘অপারেশন জ্যাকপট’-এর অংশ হিসেবে সাবমেরিনার আহসানউল্লাহর (বীর প্রতীক) নেতৃত্বে ৪৮ জন নৌ-কমান্ডো লিমপেট মাইন দিয়ে বন্দরে নোঙর করা ছয়টি জাহাজ ধ্বংস করেন। বাংলাপিডিয়ার মোংলা ভুক্তি বলছে, চারটি নৌ-কমান্ডো অভিযানে মোট ২০টি শত্রু জাহাজ ডোবানো হয়েছিল, আর জয়মনি ও লাউডোবায় মাইন বিস্ফোরণে দুটি রসদবাহী জাহাজ ডোবানো হয়েছিল।

ঢাকায় ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করলেও বাগেরহাট শত্রুমুক্ত হয় পরদিন, ১৭ ডিসেম্বর—বাংলাপিডিয়ার বাগেরহাট সদর উপজেলা ভুক্তিতে এই তারিখই দেওয়া আছে। শহীদদের নাম ও সংখ্যার পূর্ণ তালিকা এখনো গবেষণার বিষয়; এখানে উল্লেখ করা সংখ্যাগুলো উৎসে যেমন আছে, তেমনই দেওয়া হলো।

গল্পের জায়গাগুলো

তথ্যসূত্র

  1. বাগেরহাট জেলা · বাংলাপিডিয়া, ২০২১
  2. Death for Siraj the butcher · ঢাকা ট্রিবিউন, ২০১৫
  3. বাগেরহাট সদর উপজেলা · বাংলাপিডিয়া, ২০২১
  4. চিতলমারী উপজেলা · বাংলাপিডিয়া, ২০২১
  5. Kachua Upazila (Bagerhat District) · বাংলাপিডিয়া (ইংরেজি), ২০২১
  6. Morrelganj Upazila · বাংলাপিডিয়া (ইংরেজি), ২০২১
  7. শরণখোলা উপজেলা · বাংলাপিডিয়া, ২০২১
  8. Operation Jackpot · বাংলাপিডিয়া (ইংরেজি), ২০২১
  9. Mongla Upazila · বাংলাপিডিয়া (ইংরেজি), ২০২১
  10. List of sectors in the Bangladesh Liberation War · উইকিপিডিয়া (ইংরেজি), ২০২৬
  11. Save our heroes from oblivion (Naadir Junaid) · দ্য ডেইলি স্টার, ২০১৭
  12. Sub-sector commander Ziauddin passes away · দ্য ডেইলি স্টার, ২০১৭

কোনো তথ্য ভুল মনে হলে বা আরও ভালো সূত্র জানা থাকলে নিচে জানান; যাচাই করে ঠিক করা হবে।

বাগেরহাট সদর-এর আরও গল্প

সব দেখুন
সমাধির পাথরে লেখা শেষ কথাখানজাহানের সমাধিবেদির পাথরই তাঁর সম্পর্কে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য দলিল। সেখানে তিনি নিজেকে বলেছেন বৃদ্ধ, দুর্বল এক প্রবাসী—আর লিখে রেখেছেন মৃত্যুর তারিখ।প্রমাণিত ইতিহাসখলিফাতাবাদ: খানজাহানের পরের টাকশাল-শহর আর মোগল ‘সরকার’খানজাহানের মৃত্যুর পরও খলিফাতাবাদ হারিয়ে যায়নি। সুলতানদের মুদ্রায় এর নাম উঠেছে, মোগল রাজস্বের খাতায় এটি ছিল আস্ত এক ‘সরকার’—আর বাগেরহাটের ‘দশানী’ নামেও হয়তো লুকিয়ে আছে সেই হিসাবের ছাপ।প্রমাণিত ইতিহাসপ্রতাপাদিত্য, ফিরিঙ্গি আর মগ: বারো ভূঁইয়ার যুগে বাগেরহাটষোড়শ-সপ্তদশ শতকে যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজ্য ছুঁয়ে ছিল আজকের বাগেরহাট; একই সময়ে পর্তুগিজ ‘ফিরিঙ্গি’ আর আরাকানি মগ জলদস্যুর হানায় উজাড় হয়েছিল দক্ষিণের বহু জনপদ। কোনটা প্রমাণিত, কোনটা জনশ্রুতি?ইতিহাস ও জনশ্রুতিভৈরবের বাঁকে বাঁকে: নদী, হাট আর নৌপথের বাগেরহাটএকসময় বাগেরহাটে চলাফেরা মানেই ছিল নৌকা। কলকাতাগামী ধানের জাহাজ, মোড়েলগঞ্জের বন্দর, স্টিমারের হুইসেল—মরে আসা ভৈরব আর বদলে যাওয়া নদীপথের গল্প।প্রমাণিত ইতিহাস