ট্রাইব্যুনালের রায়ে একাত্তরের বাগেরহাট

প্রমাণিত ইতিহাসমুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১১৯৭১; রায় ২০১৫রনজিতপুর, ডাকরা (রামপাল), বেশরগাতী-কান্দাপাড়া, চুলকাঠি, শাখারীকাঠি (কচুয়া)

রনজিতপুর, ডাকরা, কান্দাপাড়া, শাখারীকাঠি—একাত্তরে বাগেরহাটের এসব হত্যাযজ্ঞের বিচার হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। ২০১৫ সালের রায় কী বলেছিল, পরে কী হলো?

সব তথ্য আদালতের রায়-সংক্রান্ত সংবাদ থেকে। ঘটনার সংখ্যা ও তারিখ রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগে যেমন বর্ণিত, তেমনই দেওয়া হয়েছে। নাম কেবল দণ্ডিত ব্যক্তির; খালাসপ্রাপ্ত ও রায়ের আগে মৃত আসামির নাম উল্লেখ করা হয়নি।

স্বাধীনতার চার দশক পর বাগেরহাটের একাত্তরের কয়েকটি বড় হত্যাকাণ্ড আদালতের নথিতে উঠে আসে। ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাগেরহাটের তিনজন রাজাকার নেতার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২০১৪ সালে গ্রেপ্তার হয় এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ বিচার চলে। রাষ্ট্রপক্ষ ৬৪ জন সাক্ষীর তালিকা দেয়, আদালতে হাজির করা হয় ৩২ জনকে।

রায় ঘোষিত হয় ২০১৫ সালের ১১ আগস্ট, বিচারপতি এম এনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনালে। শেখ সিরাজুল হক ওরফে সিরাজ মাস্টারকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়; ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, ছয়টি অভিযোগের পাঁচটিতে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন। একই মামলার আরেক আসামি একটি অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড পেয়েছিলেন, কিন্তু ২০২৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তাঁর আপিল মঞ্জুর করে তাঁকে খালাস দেন। তৃতীয় আসামি রায়ের আগে ২০১৫ সালের ২৮ জুলাই মারা যাওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে কার্যক্রম বাতিল হয়।

অভিযোগগুলোতে যে ঘটনাগুলোর বিবরণ এসেছে, সেগুলো বাগেরহাটের একাত্তরের সবচেয়ে বেদনার অধ্যায়। ১৩ মে রনজিতপুরে ৪০–৫০ জন নিরস্ত্র হিন্দু মানুষকে হত্যা করে শত শত বাড়ি লুট ও আগুন দেওয়া হয়। ২১ মে রামপালের ডাকরায় ভারতে আশ্রয় নিতে কালীমন্দিরে জড়ো হওয়া হিন্দু জনগোষ্ঠীর ওপর হামলায় ৬০০–৭০০ জন নিহত হন। ১৮ জুন বেশরগাতী ও কান্দাপাড়া থেকে ১৯ জনকে ধরে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। ১৪ অক্টোবর চুলকাঠিতে সাতজনকে হত্যা ও প্রায় ৫০টি বাড়ি লুট-অগ্নিসংযোগ, আর ৫ নভেম্বর কচুয়ার শাখারীকাঠি হাটে ৪২ জনকে হত্যার অভিযোগও ছিল। প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে কোন অভিযোগে কী দণ্ড হয়েছে, তার আলাদা হিসাব পাওয়া যায়নি; তাই এগুলো অভিযোগে বর্ণিত ঘটনা হিসেবেই পড়া উচিত। শাখারীকাঠির তারিখ বাংলাপিডিয়ায় ৩ মে, অভিযোগে ৫ নভেম্বর।

রায়ের দিন বাগেরহাটে মানুষ মিছিল করে মিষ্টি বিতরণ করেছিল বলে ঢাকা ট্রিবিউন লিখেছে। দণ্ডিত ব্যক্তির পক্ষে আপিলের কথা তখনই জানানো হয়েছিল; সেই আপিলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির খবর আমরা যাচাই করতে পারিনি। বাংলাপিডিয়ার জেলা ভুক্তিতে রনজিতপুর, ডাকরা, কান্দাপাড়া ও শাখারীকাঠিসহ নয়টি স্থানে গণকবরের উল্লেখ আছে—আদালতের রায় যা-ই হোক, সেই মাটিতে শুয়ে থাকা মানুষদের স্মৃতিই এ ইতিহাসের কেন্দ্র।

তথ্যসূত্র

  1. Death for Siraj the Butcher · ঢাকা ট্রিবিউন, ২০১৫
  2. Death for Siraj, jail for Akram · দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ২০১৫
  3. Crimes against humanity: Life term convict acquitted · দ্য ডেইলি অবজারভার, ২০২৬
  4. Bangladesh: Supreme Court acquits another 1971 Liberation War convict · আইএএনএস, ২০২৬
  5. Bagerhat’s Akram acquitted in war crimes case · বিডিনিউজ২৪, ২০২৬
  6. বাগেরহাট জেলা · বাংলাপিডিয়া, ২০২১
  7. Rampal Upazila · বাংলাপিডিয়া (ইংরেজি), ২০২১
  8. Kachua Upazila (Bagerhat District) · বাংলাপিডিয়া (ইংরেজি), ২০২১

কোনো তথ্য ভুল মনে হলে বা আরও ভালো সূত্র জানা থাকলে নিচে জানান; যাচাই করে ঠিক করা হবে।

বাগেরহাট সদর-এর আরও গল্প

সব দেখুন
সমাধির পাথরে লেখা শেষ কথাখানজাহানের সমাধিবেদির পাথরই তাঁর সম্পর্কে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য দলিল। সেখানে তিনি নিজেকে বলেছেন বৃদ্ধ, দুর্বল এক প্রবাসী—আর লিখে রেখেছেন মৃত্যুর তারিখ।প্রমাণিত ইতিহাসখলিফাতাবাদ: খানজাহানের পরের টাকশাল-শহর আর মোগল ‘সরকার’খানজাহানের মৃত্যুর পরও খলিফাতাবাদ হারিয়ে যায়নি। সুলতানদের মুদ্রায় এর নাম উঠেছে, মোগল রাজস্বের খাতায় এটি ছিল আস্ত এক ‘সরকার’—আর বাগেরহাটের ‘দশানী’ নামেও হয়তো লুকিয়ে আছে সেই হিসাবের ছাপ।প্রমাণিত ইতিহাসপ্রতাপাদিত্য, ফিরিঙ্গি আর মগ: বারো ভূঁইয়ার যুগে বাগেরহাটষোড়শ-সপ্তদশ শতকে যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজ্য ছুঁয়ে ছিল আজকের বাগেরহাট; একই সময়ে পর্তুগিজ ‘ফিরিঙ্গি’ আর আরাকানি মগ জলদস্যুর হানায় উজাড় হয়েছিল দক্ষিণের বহু জনপদ। কোনটা প্রমাণিত, কোনটা জনশ্রুতি?ইতিহাস ও জনশ্রুতিভৈরবের বাঁকে বাঁকে: নদী, হাট আর নৌপথের বাগেরহাটএকসময় বাগেরহাটে চলাফেরা মানেই ছিল নৌকা। কলকাতাগামী ধানের জাহাজ, মোড়েলগঞ্জের বন্দর, স্টিমারের হুইসেল—মরে আসা ভৈরব আর বদলে যাওয়া নদীপথের গল্প।প্রমাণিত ইতিহাস