একাত্তরের বাগেরহাট শহর: ২৪ এপ্রিল থেকে ১৭ ডিসেম্বর

প্রমাণিত ইতিহাসমুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১মার্চ–ডিসেম্বর ১৯৭১বাগেরহাট শহর, ডাকবাংলো ঘাট, কাড়াপাড়া

খুলনার পতনের পরও এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত মুক্ত ছিল বাগেরহাট। এরপর দড়াটানার তীরের ডাকবাংলো হয়ে ওঠে নির্যাতনকেন্দ্র; শহর মুক্ত হয় ১৭ ডিসেম্বর সকালে।

মূল বিবরণ বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষের (সংগ্রামের নোটবুকে প্রকাশিত পাঠ); ১৭ ডিসেম্বর, ডাকবাংলো ঘাট ও বান্দাপাড়ার তথ্য বাংলাপিডিয়াতেও আছে। ‘সহস্রাধিক’ ও ‘শতাধিক’ সংখ্যা জ্ঞানকোষের অনুমান। রাজাকার বাহিনীর কোনো ব্যক্তির নাম এখানে দেওয়া হয়নি, কারণ আদালতে দণ্ডিত হওয়ার সূত্র পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষের বাগেরহাট সদর অংশ (সংগ্রামের নোটবুক ওয়েবসাইটে প্রকাশিত) অনুযায়ী, প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল আগেই। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাগেরহাট থেকে জাতীয় পরিষদে শেখ আব্দুল আজিজ ও প্রাদেশিক পরিষদে শেখ আব্দুর রহমান নির্বাচিত হন। অসহযোগ আন্দোলনের মধ্যে ২৩ মার্চ শহরে স্বাধীন বাংলার পতাকা ওড়ে। শেখ আব্দুল আজিজকে আহ্বায়ক করে গঠিত হয় সংগ্রাম পরিষদ; নাগেরবাড়ির মাঠ, কাড়াপাড়া স্কুল মাঠ, বাগেরহাট স্কুল মাঠ ও আনসার ক্যাম্প মাঠে অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ, সেনা ও আনসার সদস্যরা তরুণদের প্রশিক্ষণ দেন, অস্ত্রের অভাবে কাঠের ডামি রাইফেল আর বাঁশের লাঠি দিয়ে। ট্রেজারি থেকেও কিছু অস্ত্র সংগ্রহ করা হয়।

খুলনা আগেই পাকিস্তানি সেনাদের দখলে গেলেও এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত বাগেরহাট মুক্ত ছিল। খুলনা থেকে আসার পথে গাছ ফেলে সড়ক আটকানো হয়, রেললাইন উপড়ে ফেলা হয়; পচা দীঘির পাড় ও দশানীতে কামরুজ্জামান টুকুর নেতৃত্বে ২৫–৩০ জন সশস্ত্র যোদ্ধা প্রতিরোধের চেষ্টা করেন, কিন্তু টিকতে পারেননি। জ্ঞানকোষ অনুযায়ী ২৪ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনারা শহর দখল করে মদনের মাঠের ওয়াপদা রেস্টহাউসে প্রধান ক্যাম্প বসায়। সেদিন গানবোট থেকে নেমে কাড়াপাড়া বাজারের কাছে তারা সাবেক প্রাদেশিক মন্ত্রী আমজাদ হোসেনের বাবা ইসরাইল হোসেন ও মামা আজিজুল হককে গুলি করে হত্যা করে; জ্ঞানকোষের হিসাবে পথে নির্বিচার গুলিতে কাড়াপাড়ায় শতাধিক মানুষ নিহত হন।

দড়াটানার তীরের ডাকবাংলো হয়ে ওঠে রাজাকারদের প্রধান ঘাঁটি ও শহরের প্রধান নির্যাতনকেন্দ্র। জ্ঞানকোষ জানায়, বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ ধরে এনে সেখানে আটকে রেখে নির্যাতন করা হতো, পরে নদীর তীরের ডাকবাংলো ঘাটে হত্যা করে লাশ ফেলে দেওয়া হতো নদীতে; এটিই বাগেরহাট থানার সবচেয়ে বড় বধ্যভূমি। বাংলাপিডিয়াও সদর উপজেলায় বান্দাপাড়ায় একটি গণকবর এবং ডাকবাংলো ঘাটে একটি বধ্যভূমির কথা লিখেছে। জ্ঞানকোষে রণজিৎপুর, সাড়ে চার আনি, কান্দাপাড়া, গোটাপাড়া, বৈটপুর ও শহরের গণহত্যার কথা আছে, যেগুলোতে সব মিলিয়ে সহস্রাধিক মানুষ নিহত হন বলে উল্লেখ।

যুদ্ধের মাঝামাঝি থেকে পাকিস্তানি সেনারা গ্রামাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ রাজাকারদের হাতে ছেড়ে শহরের ব্যারাকে সীমিত হয়ে পড়ে। সাবসেক্টর কমান্ডার সুবেদার তাজুল ইসলাম কচুয়ার সন্তোষপুরে সদর দপ্তর গড়েন; বাগেরহাট থানা আক্রমণ, চুলকাঠি যুদ্ধ, শহরের যুদ্ধ ও মুক্ষাইট-কান্দাপাড়া যুদ্ধ ছিল উল্লেখযোগ্য। ডিসেম্বরে থানা সদরগুলো একে একে মুক্ত হয়; পাকিস্তানি সেনাদের কিছু অংশ বরিশালে, কিছু খুলনায় চলে যায়, আর শহরে জড়ো হওয়া রাজাকাররা কিছু সময় কর্তৃত্ব ধরে রাখে। অবশেষে ১৭ ডিসেম্বর সকালে, ঢাকায় আত্মসমর্পণের পরদিন, তাজুল ইসলাম তাঁর বাহিনী নিয়ে দড়াটানা পার হয়ে শহরে ঢোকেন। বাংলাপিডিয়াও বাগেরহাট মুক্ত হওয়ার তারিখ ১৭ ডিসেম্বর লিখেছে।

জ্ঞানকোষ অনুযায়ী সদর উপজেলার খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা আমলাপাড়ার লিয়াকত আলী খান, বীর উত্তম; সরকারি তালিকায় উপজেলার শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ১৩ জন। শহরে একাত্তরের স্মৃতি ধরে রেখেছে শাপলা ফোয়ারা, জেলখানার বিপরীতের স্বাধীনতা উদ্যান (আগের পিএনজি মাঠ, ১৯৮৭ সালে নতুন নাম), স্বাধীনতা সরণি, শহীদদের নামফলক আর বাগেরহাট–খুলনা মহাসড়কের পাশে দশানীর স্মৃতিস্তম্ভ।

তথ্যসূত্র

  1. মুক্তিযুদ্ধে বাগেরহাট সদর উপজেলা (সূত্র: বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ, ৬ষ্ঠ খণ্ড) · সংগ্রামের নোটবুক
  2. Bagerhat Sadar Upazila · বাংলাপিডিয়া, ২০২১
  3. Bagerhat District · বাংলাপিডিয়া, ২০২১
  4. মুক্তিযুদ্ধে বাগেরহাটের রফিক বাহিনী (আহমাদ ইশতিয়াক) · দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, ২০২৪

কোনো তথ্য ভুল মনে হলে বা আরও ভালো সূত্র জানা থাকলে নিচে জানান; যাচাই করে ঠিক করা হবে।

বাগেরহাট সদর-এর আরও গল্প

সব দেখুন
সমাধির পাথরে লেখা শেষ কথাখানজাহানের সমাধিবেদির পাথরই তাঁর সম্পর্কে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য দলিল। সেখানে তিনি নিজেকে বলেছেন বৃদ্ধ, দুর্বল এক প্রবাসী—আর লিখে রেখেছেন মৃত্যুর তারিখ।প্রমাণিত ইতিহাসখলিফাতাবাদ: খানজাহানের পরের টাকশাল-শহর আর মোগল ‘সরকার’খানজাহানের মৃত্যুর পরও খলিফাতাবাদ হারিয়ে যায়নি। সুলতানদের মুদ্রায় এর নাম উঠেছে, মোগল রাজস্বের খাতায় এটি ছিল আস্ত এক ‘সরকার’—আর বাগেরহাটের ‘দশানী’ নামেও হয়তো লুকিয়ে আছে সেই হিসাবের ছাপ।প্রমাণিত ইতিহাসপ্রতাপাদিত্য, ফিরিঙ্গি আর মগ: বারো ভূঁইয়ার যুগে বাগেরহাটষোড়শ-সপ্তদশ শতকে যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজ্য ছুঁয়ে ছিল আজকের বাগেরহাট; একই সময়ে পর্তুগিজ ‘ফিরিঙ্গি’ আর আরাকানি মগ জলদস্যুর হানায় উজাড় হয়েছিল দক্ষিণের বহু জনপদ। কোনটা প্রমাণিত, কোনটা জনশ্রুতি?ইতিহাস ও জনশ্রুতিভৈরবের বাঁকে বাঁকে: নদী, হাট আর নৌপথের বাগেরহাটএকসময় বাগেরহাটে চলাফেরা মানেই ছিল নৌকা। কলকাতাগামী ধানের জাহাজ, মোড়েলগঞ্জের বন্দর, স্টিমারের হুইসেল—মরে আসা ভৈরব আর বদলে যাওয়া নদীপথের গল্প।প্রমাণিত ইতিহাস