বাওয়ালির টোঙে পুথির আসর: বাঘ-বাঁধা মন্ত্রের লোকবিশ্বাস

ইতিহাস ও জনশ্রুতিলোককথাসতেরো শতকের সাহিত্য থেকে বর্তমানসুন্দরবন

মাটি থেকে ছয় ফুট উঁচু টোঙে রাত কাটানো কাঠুরে, বাঘ ‘বেঁধে’ রাখার মন্ত্র জানা বাউলে আর সন্ধ্যার পুথিপাঠ: সুন্দরবনের বনজীবীদের বিশ্বাস ও বাস্তবতার গল্প।

বাঘ-বাঁধা মন্ত্র ও বাউলের ক্ষমতা লোকবিশ্বাস, এর কোনো প্রমাণ নেই। বাওয়ালিদের পেশা, মৌসুম ও জীবনযাপন বাংলাপিডিয়ায় এবং ১৯০৮ সালের গেজেটিয়ারের উল্লেখে নথিভুক্ত।

সুন্দরবনের কাঠকাটা শ্রমিকদের বলা হয় বাওয়ালি। বাংলাপিডিয়া জানায়, হিংস্র জন্তু আর অন্য বিপদ থেকে বাঁচতে তাঁরা ‘বাউল’ বা বাউলেদের সাহায্য নেন বলেই এই নাম। বৃহত্তর বরিশালের স্বরূপকাঠি, পিরোজপুর, মঠবাড়িয়া, পাথরঘাটা আর খুলনার দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ পুরুষানুক্রমে এ পেশায়; স্বরূপকাঠির বর্ষাকাঠির বাওয়ালিদের সুন্দরবনের প্রাচীন বাওয়ালিদের বংশধর বলে মনে করা হয়।

বাওয়ালির জীবন চলে বনের পঞ্জিকা ধরে। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায়, আষাঢ়ের মধ্যে ফরেস্টাররা কাটার যোগ্য গাছ চিহ্নিত করেন; এরপর ছয়, আট বা দশ-বারোজনের দল একজন সরদারের অধীনে কাজে নামে। সেপ্টেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি কাঠ কাটার মৌসুম। বাঘের ভয়ে তাঁরা থাকেন মাটি থেকে প্রায় ছয় ফুট উঁচুতে বানানো ‘টোঙে’, যার এক অংশে রান্নার ব্যবস্থা। নভেম্বর থেকে জানুয়ারি গোলপাতা কাটার সময় তাঁরা দল বেঁধে বড় নৌকায় থাকেন, জলদস্যুর ভয়ে।

এমন ঝুঁকির জীবনে আশ্রয় লোকবিশ্বাস। প্রচলিত বিশ্বাস হলো, বাউলেরা ‘বাঘ-বাঁধা’ মন্ত্র জানেন: মাটিতে গণ্ডি কেটে বাঘকে আটকে রাখতে পারেন, কিংবা মন্ত্র পড়ে বাঘের মুখ বন্ধ করে দিতে পারেন। এ বিশ্বাস নতুন নয়। দ্য ডেইলি স্টারের এক গবেষণাধর্মী লেখা জানায়, ১৯০৮ সালের খুলনা জেলা গেজেটিয়ারে এল. এস. এস. ও’ম্যালি লিখেছিলেন, হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের পেশাদার কাঠুরেরা নৌকায় এমন সব বনাঞ্চলে যেতেন, যেখানে বাঘ তাড়াতে পারেন বলে বিশ্বাস করা এক ফকিরের অধিষ্ঠান থাকত। মধু-সংগ্রাহক মউল্যারাও গভীর বনে ঢোকার আগে বনবিবির উদ্দেশে ক্ষীরের শিরনি দেন, বাঘ আর অপশক্তির ভয় কাটানোর আশায়।

সন্ধ্যা নামলে টোঙে বা নৌকায় বসে পুথির আসর। বাংলাপিডিয়া জানায়, বাওয়ালিরা তখন ‘গাজী কালু চম্পাবতী’, ‘বনবিবির জহুরনামা’, ‘মনসামঙ্গল’ আর ‘রায়মঙ্গল’ থেকে বাঘ-সাপের কাহিনি শোনেন ও শোনান। গাজীর পুথিতে গাজীর বাঘবাহিনীর সঙ্গে কালুরায়ের কুমিরবাহিনীর লড়াই তাঁদের সাহস জোগায়। এ ধরনের কাহিনি কত পুরোনো, তা বোঝা যায় রায়মঙ্গল থেকে: সতেরো শতকের এই কাব্যে রতাই মউল্যা ছয় ভাই আর এক ছেলেকে নিয়ে দক্ষিণ রায়কে তুষ্ট করে সুন্দরবন থেকে সওদাগর পুষ্পদত্তের জাহাজের কাঠ নিয়ে আসে।

মনে রাখা দরকার, মন্ত্রে বাঘ আটকানোর কোনো প্রমাণ নেই; এটি লোকবিশ্বাস, যা মানুষকে ভয়ের মধ্যে সাহস দেয়। বাস্তবে বনে ঢোকার নিয়ম এখন বন বিভাগের: জেলেরা স্টেশন থেকে পাস নিয়ে বনে যান, আর মধু আহরণের জন্য প্রতিবছর ১ এপ্রিল থেকে মে মাসের শেষ পর্যন্ত মৌয়ালদের পাস দেওয়া হয়। তবু বাউলের মন্ত্র আর পুথির আসর সুন্দরবনের সামাজিক ইতিহাসের এক জীবন্ত অধ্যায়, যেখানে বিশ্বাস আর জীবিকা হাত ধরাধরি করে চলে।

তথ্যসূত্র

  1. বাওয়ালি · বাংলাপিডিয়া
  2. Bawali · Banglapedia
  3. Bonbibi: Mother of the eighteen tides · The Daily Star, ২০২১
  4. বনবিবির জহুরনামা · বাংলাপিডিয়া
  5. রায়মঙ্গল · বাংলাপিডিয়া
  6. গা ছমছম বাঘের রাজ্যে মহাঝুঁকির মধু আহরণ · প্রথম আলো, ২০২৫
  7. কী সেবা কীভাবে পাবেন · সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ, বাগেরহাট

কোনো তথ্য ভুল মনে হলে বা আরও ভালো সূত্র জানা থাকলে নিচে জানান; যাচাই করে ঠিক করা হবে।

মোংলা-এর আরও গল্প

সব দেখুন
জয়মনির ঘোল থেকে মোংলা: একটি বন্দরের জন্মকথা১৯৫০ সালের ডিসেম্বরে সুন্দরবনের ভেতরে পশুর নদীতে নোঙর ফেলেছিল একটি ব্রিটিশ জাহাজ। সেখান থেকে চালনা ঘুরে বন্দরটি কীভাবে শেলাবুনিয়া নামের এক অচেনা গ্রামে এসে ‘মোংলা’ হলো, এ তারই গল্প।প্রমাণিত ইতিহাসশেলাবুনিয়ার ফাদার রিগন: ইতালি থেকে আসা এক বাঙালিইতালির এক গ্রামে জন্ম, কিন্তু জীবনের প্রায় পুরোটা কেটেছে মোংলার শেলাবুনিয়ায়। রবীন্দ্রনাথকে ইতালীয় ভাষায় নিয়ে যাওয়া, একাত্তরে আহত মুক্তিযোদ্ধার চিকিৎসা আর মৃত্যুর পর বাংলার মাটিতে ফেরার গল্প।প্রমাণিত ইতিহাসরুদ্রের মিঠেখালী: ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’-এর কবির শেকড়আশির দশকের কবিতার মঞ্চ কাঁপানো রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর শৈশব কেটেছে মোংলার মিঠেখালীতে। সেখানে তিনি গানের দল গড়েছেন, সেখানেই তিনি চিরঘুমে।প্রমাণিত ইতিহাসঅপারেশন জ্যাকপট: মোংলা বন্দরে নৌ-কমান্ডোদের রাতহাতে শুধু ছুরি, সঙ্গে লিমপেট মাইন। ১৯৭১ সালের ১৫ আগস্ট মধ্যরাতে চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, নারায়ণগঞ্জের সঙ্গে একযোগে মোংলা বন্দরেও আঘাত হানে বাঙালি নৌ-কমান্ডোরা।প্রমাণিত ইতিহাস