একাত্তরের যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর রসদ, অস্ত্র আর গোলাবারুদ আসত মূলত সমুদ্র ও নদীপথে। সেই পথ কেটে দিতে গড়ে তোলা হয় বাঙালি নৌ-কমান্ডো দল, যারা ছিল ১০ নম্বর সেক্টরের অধীন। দ্য ডেইলি স্টারের এক ইতিহাসভিত্তিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রশিক্ষণের জন্য বেছে নেওয়া হয় ভারতের নদীয়া জেলার পলাশী আর ভাগীরথী নদী; শিবিরের সাংকেতিক নাম ছিল ‘সি-২ পি’। মে মাস থেকে ভালো সাঁতারু ও সুঠামদেহী তরুণদের বাছাই শুরু হয়; প্রশিক্ষণের আগেই তাঁদের জানানো হয়, এটি আত্মঘাতী অভিযান, আর প্রত্যেককে ছবিসহ সম্মতিপত্রে সই করতে হয়।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের আগস্টে ১৪৮ জন নৌ-কমান্ডোকে চারটি দলে ভাগ করে দেশের ভেতরে পাঠানো হয়। লক্ষ্য ছিল একই রাতে চট্টগ্রাম, মোংলা, চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জ বন্দরে আঘাত। ১৫ আগস্ট রাত ১২টায় শুরু হয় ‘অপারেশন জ্যাকপট’; কমান্ডোরা জাহাজের গায়ে মাইন লাগিয়ে সরে পড়েন। প্রথম আলোর এক প্রতিবেদন মনে করিয়ে দেয়, পথে শত্রুর মুখে পড়লে আত্মরক্ষার জন্য তাঁদের হাতে ছিল কেবল ছুরি।
মোংলা দলের আকার ও নেতৃত্ব নিয়ে সূত্রে ভিন্নতা আছে। বাংলাপিডিয়া বলছে, সাবমেরিনার আহসানউল্লাহর (বীর প্রতীক) নেতৃত্বে ৪৮ জন নৌ-কমান্ডো মোংলা বন্দরে অভিযান চালান এবং বন্দরে নোঙর করা ছয়টি জাহাজ মাইনের আঘাতে বিধ্বস্ত হয়। অন্যদিকে দ্য ডেইলি স্টারের ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে মোংলা দলে ৬০ জন নৌ-কমান্ডো ও ২০০ জন সি অ্যান্ড সি কমান্ডো মিলিয়ে ২৬০ জনের কথা বলা হয়েছে, নেতৃত্বে আমিনুর রহমান খসরু। প্রথম আলোও মোংলায় ছয়টি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত বা বিধ্বস্ত হওয়ার কথা লিখেছে।
বাংলাপিডিয়ার হিসাবে সেই রাতে সারা দেশে পাকিস্তানি বাহিনীর ২৬টি পণ্য ও সমরাস্ত্রবাহী জাহাজ ও গানবোট ডোবে। এর গুরুত্ব কেবল সামরিক ছিল না। অবরুদ্ধ বাংলাদেশে ‘স্বাভাবিক অবস্থা’ বিরাজ করছে বলে পাকিস্তান সরকার বিদেশে যে প্রচার চালাচ্ছিল, তা মিথ্যা প্রমাণ হয়; বিশ্বের সংবাদমাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়ে, আর এরপর বিদেশি জাহাজ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বন্দরে আসতে রাজি হয়নি বলে বাংলাপিডিয়া উল্লেখ করেছে।
পশুর নদী এরপরও ছিল নৌ-কমান্ডোদের যুদ্ধক্ষেত্র। বাংলাপিডিয়ার মংলা উপজেলা ভুক্তি অনুযায়ী, মুক্তিযোদ্ধারা মাইন বিস্ফোরণ ঘটিয়ে জয়মনি ও লাউডোবায় পাকিস্তানি বাহিনীর খাদ্য ও গোলাবারুদ বোঝাই দুটি জাহাজ ডুবিয়ে দেন (ভুক্তিতে তারিখ লেখা ১৪ আগস্ট), এবং পশুর নদীতে চারটি অভিযানে নৌ-কমান্ডোরা মোট ২০টি জাহাজ ডোবান। ইতিহাসের এক অদ্ভুত মিল: যে জয়মনির ঘোলে ১৯৫০ সালে এই বন্দরের প্রথম জাহাজ নোঙর ফেলেছিল, একুশ বছর পর সেই জয়মনি এলাকাতেই ডুবেছিল দখলদার বাহিনীর জাহাজ।