সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের দর্শনীয় স্থানের তালিকায় প্রথম নামটি করমজল ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র; এখানে আছে বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রও। দ্য ডেইলি স্টারের ২০১৭ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, লোনাপানির কুমিরের প্রজনন বাড়াতে ২০০২ সালে প্রায় ৩২ লাখ টাকা ব্যয়ে বন বিভাগের আট একর জমিতে দেশের একমাত্র সরকারি কুমির প্রজনন কেন্দ্রটি গড়ে তোলা হয়। প্রথম আলোর ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে অবশ্য প্রতিষ্ঠাকাল ২০০০ সাল বলা হয়েছে।
কেন্দ্রের পরিচিত মুখ দুই মা-কুমির জুলিয়েট ও পিলপিল, আর পুরুষ কুমির রোমিও। ডেইলি স্টার জানায়, ২০০৫ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে জুলিয়েট ও পিলপিলের ৭২৩টি ডিম থেকে ৪৬৫টি বাচ্চা ফোটে; শুধু ২০১৬ সালেই ৯৮টি ডিম থেকে ৪৭টি। কিন্তু ২০১৭ সালে দুজনের ৯১টি ডিম থেকে একটি বাচ্চাও ফোটেনি। কর্মকর্তারা তখন বলেছিলেন, অস্ট্রেলিয়ায় প্রশিক্ষণ পাওয়া কেন্দ্রের অভিজ্ঞ কর্মকর্তা ২০১৫ সালে অবসরে যাওয়ার পর আর কোনো কুমির-বিশেষজ্ঞ নিয়োগ হয়নি। সে বছরই কয়েক মাস আগে রোমিও মারা যায়।
২০২৪ সালে জুলিয়েটের জীবনে নতুন অধ্যায় শুরু হয়। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইইউসিএন বাংলাদেশের নেতৃত্বে, জার্মান সংস্থা জিআইজেডের সহায়তায় একটি গবেষণায় পাঁচটি লোনাপানির কুমিরের গায়ে স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার বসিয়ে সুন্দরবনে ছাড়া হয়। প্রথমটি ছিল জুলিয়েট: ২০২৪ সালের ১৩ মার্চ ভদ্রা খালে তাকে অবমুক্ত করা হয়। শেষটি, করমজলেই জন্ম নেওয়া ‘পুটিয়া’, ছাড়া হয় ২০২৫ সালের ২৬ জানুয়ারি। পরে ট্রান্সমিটারগুলো অচল হয়ে যাওয়ায় গবেষক দল প্রাণীগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ হারায়। প্রতিবেদনের সময় কেন্দ্রে কুমির ছিল ৯২টি।
কুমিরের পাশাপাশি করমজল আশ্রয় দিয়েছে প্রায় হারিয়ে যাওয়া নদী-কচ্ছপ বাটাগুর বাস্কাকেও। দ্য ডেইলি স্টার বাংলার ২০২২ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, একসময় গবেষকেরা ভেবেছিলেন প্রজাতিটি পৃথিবী থেকেই হারিয়ে গেছে। পরে নোয়াখালী ও বরিশালে চারটি পুরুষ ও চারটি মা কচ্ছপ পাওয়া যায়, গাজীপুরে তাদের প্রজনন শুরু হয়। ২০১৪ সালে সেখান থেকে ৮টি বড় কচ্ছপ আর ৯৪টি বাচ্চা আনা হয় করমজলে। ২০১৭ সালে এখানে প্রথমবার ৬৩টি ডিম থেকে ৫৭টি বাচ্চা ফোটে; ২০২২ সালের ৭ মে পর্যন্ত করমজলে জন্ম নিয়েছে ২৬৪টি বাচ্চা, আর তখন কেন্দ্রে বিভিন্ন বয়সের ৩৮৭টি কচ্ছপ ছিল। কয়েক দফায় কিছু কচ্ছপ সুন্দরবনের নদীতে ছাড়াও হয়েছে।
করমজল তাই কেবল ছবি তোলার জায়গা নয়। এখানে আছে বিপন্ন প্রাণী ফিরিয়ে আনার সাফল্য, আবার বিশেষজ্ঞের অভাবে ডিম নষ্ট হওয়ার মতো বাস্তব সংকটও। পরের বার কুমিরের পুকুরের পাশে দাঁড়ালে মনে রাখা যায়, সুন্দরবনের নদীতে ছাড়া কুমিরদের কেউ কেউ, যেমন পুটিয়া, এই কেন্দ্রেই জন্ম নিয়েছে।