ফাদার মারিনো রিগনের জন্ম ১৯২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি, ইতালির ভিলাভেরলায় (কোনো কোনো সূত্রে জন্মতারিখ ৫ জানুয়ারি)। দ্য ডেইলি স্টারের ২০১২ সালের এক প্রোফাইল অনুযায়ী, ১৯৪৩ সালে তিনি জেভিয়ারিয়ান মিশনারি সংঘে যোগ দেন এবং ১৯৫১ সালের ১০ মার্চ যাজক হিসেবে অভিষিক্ত হন। ১৯৫৩ সালে, ২৮ বছর বয়সে, তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আসেন; প্রথমে ছিলেন কুষ্টিয়ার ভবরপাড়া মিশনে সহকারী যাজক। পরের বছর, ১৯৫৪ সালে, যে বছর বন্দর চালনা থেকে মোংলায় সরে আসে, তাঁকে ডেকে নেওয়া হয় মোংলার শেলাবুনিয়ায়, মূলত সেন্ট পলস উচ্চ বিদ্যালয়ের কাজে। সেই থেকে শেলাবুনিয়াই হয়ে ওঠে তাঁর ঘর।
শিক্ষা আর মানুষের সেবাই ছিল তাঁর কাজের কেন্দ্র। ডেইলি স্টারের প্রোফাইলে বলা হয়েছে, সেন্ট পলস উচ্চ বিদ্যালয় গড়ে তোলার পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চলে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রায় ১৭টি স্কুল প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা ছিল। তিনি সেন্ট পলস হাসপাতালে কাজ করেছেন, খুলনায় মেয়েদের হোস্টেল গড়েছেন, আর চিলার সেন্ট মেরিস গির্জার নকশা করেছেন স্থানীয় সংস্কৃতির আদলে। ১৯৮৩ সালে তিনি একটি সেলাইকেন্দ্র চালু করেন, যেখানে এলাকার দরিদ্র নারীরা নকশিকাঁথা তৈরি করে আয় করেন।
বাংলা সাহিত্যের প্রতি তাঁর টান ছিল গভীর। ডেইলি স্টারের তথ্যমতে, তিনি রবীন্দ্রনাথের ‘গীতাঞ্জলি’ ইতালীয় ভাষায় অনুবাদ করেন (১৯৬৪ সালে এর দুটি সংস্করণ বের হয়), পাশাপাশি অনুবাদ করেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, জসীমউদ্দীন ও লালনের লেখা। দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের হিসাবে রবীন্দ্রনাথের ৪০টি রচনা তিনি ইতালীয় ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন, আর তাঁকে রবীন্দ্র-বিশেষজ্ঞ হিসেবেও গণ্য করা হতো।
একাত্তরে তিনি ছিলেন গোপালগঞ্জের বানিয়ারচর মিশনে। ডেইলি স্টারের প্রোফাইল অনুযায়ী, স্থানীয় খ্রিস্টান সমাজের একাংশের আপত্তি সত্ত্বেও তিনি হিন্দু পরিবারগুলোকে আশ্রয় ও ভরসা দেন। ১৯৭১ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর মিশনের ডিসপেনসারিতে আনা হয় গুরুতর আহত মুক্তিযোদ্ধা হেমায়েত উদ্দিনকে, যিনি পরে বীর বিক্রম খেতাব পান; কর্মীরা তাঁর বাঁচার আশা ছেড়ে দিলেও রিগনের জোরাজুরিতে চিকিৎসা চলে। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের স্বীকৃতিতে তাঁকে সম্মানসূচক বাংলাদেশি নাগরিকত্ব দেওয়া হয় (ডেইলি স্টারের মতে ২০০৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর, ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের মতে ২০০৯ সালে), পরে পান ‘মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু’ সম্মাননাও।
২০০৯ সালে অসুস্থ হয়ে তিনি চিকিৎসার জন্য ইতালি যান। ২০১৭ সালের ২০ অক্টোবর (কোনো সূত্রে ১৯ অক্টোবর) ইতালির ভিচেনজায় তাঁর মৃত্যু হয়। ২০১২ সালেই ডেইলি স্টারকে জানানো হয়েছিল, তাঁর পরিবার তাঁকে বাংলাদেশে সমাহিত করতে রাজি। মৃত্যুর এক বছর পর দেহাবশেষ ঢাকা হয়ে হেলিকপ্টারে মোংলায় আনা হয়, এবং ২০১৮ সালের ২১ অক্টোবর গার্ড অব অনার দিয়ে শেলাবুনিয়ার সেন্ট পলস গির্জার পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়। ডেইলি স্টার ২০১২ সালে জানিয়েছিল, তাঁর জন্মদিন ঘিরে হলদিবুনিয়ায় প্রতিবছর তিন দিনের ‘রিগন মেলা’ হয়।