দেশভাগের পর পূর্ব বাংলার সমুদ্রবাণিজ্য প্রায় পুরোটাই চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর নির্ভরশীল ছিল। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাণিজ্যের জন্য দরকার ছিল দ্বিতীয় একটি বন্দর। সেই প্রয়োজন থেকেই ১৯৫০ সালে খুলনার দক্ষিণে পশুর নদীতে একটি নোঙরস্থল বা ‘অ্যাংকরেজ’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। বাংলাদেশ মনিটরের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৫০ সালের ২৯ সেপ্টেম্বরের এক গেজেট বিজ্ঞপ্তির ভিত্তিতে ১ ডিসেম্বর ‘চালনা পোর্ট’ প্রতিষ্ঠিত হয়; এ কারণেই আজও ১ ডিসেম্বর মোংলা বন্দরের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হয়। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, তৎকালীন সরকার চালনা অ্যাংকরেজ চালুর দায়িত্ব দিয়েছিল ই. এস. বি. ভোম্বলকে, যিনি পরে বন্দরের পরিচালক হন।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব ইতিহাস বলছে, ১৯৫০ সালের ১১ ডিসেম্বর ব্রিটিশ বাণিজ্যিক জাহাজ ‘দ্য সিটি অব লায়ন্স’ (City of Lyons) সুন্দরবনের ভেতরে পশুর নদীর জয়মনির ঘোল নামের জায়গায় নোঙর করে। কর্তৃপক্ষ এটিকেই বন্দরের ‘শুভ সূচনা’ বলে উল্লেখ করে। বাংলাপিডিয়াও ১১ ডিসেম্বরকে বিদেশি জাহাজের জন্য বন্দর প্রথম উন্মুক্ত হওয়ার দিন হিসেবে লিখেছে। শুরুতে এটি ছিল মূলত নদীতে জাহাজ নোঙরের জায়গা, আর পরিচয় ছিল ‘চালনা অ্যাংকারেজ পোর্ট’। জাহাজের নামের বানান কোনো প্রতিবেদনে ‘সিটি অব লিয়নস’ বা ‘সিটি অব লায়নস’ হিসেবেও এসেছে।
জয়মনির ঘোলে অবশ্য বন্দর বেশিদিন থাকেনি। বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ১৯৫১ সালের ৭ মার্চ সেটি প্রায় ১৪ মাইল উজানে চালনায় সরিয়ে নেওয়া হয় এবং ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত সেখানেই কাজ চলে। এরপর পশুর ও শিবসা নদী জরিপ করতে আসেন একজন ব্রিটিশ বিশেষজ্ঞ; কর্তৃপক্ষের নথিতে তাঁর নাম লেখা ‘স্যার ক্লাইভ এংনিস’। দীর্ঘ জরিপ শেষে তিনি চালনা থেকে ৯-১০ মাইল ভাটিতে, মোংলা নদী ও পশুরের মিলনস্থলে বন্দর সরানোর সুপারিশ করেন। সেখানে নদী বেশি গভীর, আর বন্দর গড়ার মতো প্রশস্ত ডাঙাও ছিল। সেই সুপারিশ মেনে ১৯৫৪ সালের ২০ জুন বন্দর চলে আসে মোংলায়। বাংলাপিডিয়াও বলছে, বেশি গভীরতার সমুদ্রগামী জাহাজ ভেড়ানোর সুবিধার জন্যই ১৯৫৪ সালে এই স্থানান্তর।
যেখানে বন্দর এল, সেটি তখন শ্যালাবুনিয়া নামের এক অচেনা গ্রাম; বাংলাপিডিয়ায় জায়গাটিকে তৎকালীন রামপালের ‘সেলাবুনিয়া মৌজা’ বলা হয়েছে। মোংলা নদীর তীরে বলে বন্দরের নাম হয় মোংলা, যদিও বহু বছর মানুষ একে ‘চালনা বন্দর’ নামেই চিনত। বন্দর কর্তৃপক্ষের ভাষায়, জনশূন্য এলাকাটি এরপর ‘জন কলরবে’ মুখর হয়ে ওঠে। কাজের খোঁজে দেশের নানা জেলা থেকে মানুষ আসতে থাকে; মোংলা উপজেলা তথ্য বাতায়ন বলছে, তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি মিশে এখানে আলাদা একটি সাংস্কৃতিক রূপ গড়ে উঠেছে। সেন্ট পলস উচ্চ বিদ্যালয় (১৯৫৪) ও চালনা বন্দর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের (১৯৬২) মতো প্রতিষ্ঠান সেই নতুন জনপদের সাক্ষী। ১৯৭৬ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর মোংলা থানা গঠিত হয়, আর ১৯৮৩ সালে তা উপজেলা হয়।
প্রশাসনিক কাঠামোও বদলেছে কয়েক দফা। শুরুতে বন্দর চলত একটি সরকারি অধিদপ্তর হিসেবে। বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে ১৯৭৬ সালের মে মাসে (কোনো কোনো সূত্রে ১৯৭৭ সালে) এটি ‘চালনা বন্দর কর্তৃপক্ষ’ নামে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হয়, আর ১৯৮৭ সালের মার্চে নাম বদলে হয় ‘মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ’। পথচলা মসৃণ ছিল না: বাংলাপিডিয়া জানায়, ১৯৮০ সাল থেকে নাব্যতা হারানোয় বন্দর প্রায়ই বন্ধ রাখতে হয়েছে, প্রতিবার খননের পর আবার খুলেছে। সমুদ্র থেকে প্রায় ১৩১ কিলোমিটার উজানে, সুন্দরবনের আড়ালে থাকা এই বন্দরকে কর্তৃপক্ষ এখন দেশের দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সমুদ্রবন্দর হিসেবে পরিচয় দেয়।