লবণ-চুল্লির বয়স ও ভূমি দেবে যাওয়ার তথ্য গবেষণাপত্র ও সংবাদভিত্তিক। খাঞ্জেলী দিঘিতে বুদ্ধমূর্তি পাওয়ার কথা জেলা তথ্য বাতায়ন ও উইকিপিডিয়ার বিবরণ; এর স্বাধীন প্রত্নতাত্ত্বিক নথি পাওয়া যায়নি।
বাগেরহাটের ইতিহাস বলতে সাধারণত পনেরো শতকের খানজাহান আলী আর তাঁর খলিফাতাবাদের কথাই আসে। কিন্তু তার আগে এই ভাটি অঞ্চলে কারা ছিল, সে প্রশ্নের উত্তর এখনো অসম্পূর্ণ। বাংলাপিডিয়া জানায়, প্রাচীন ‘বঙ্গ’ জনপদের মূল এলাকা ছিল ভাগীরথী আর পদ্মা-মেঘনার মাঝের দক্ষিণাঞ্চল; আর প্রায় ১৬০০ খ্রিস্টাব্দের ‘দিগ্বিজয়প্রকাশ’ গ্রন্থে যশোর ও লাগোয়া বনাঞ্চলকে বলা হয়েছে ‘উপবঙ্গ’। আজকের বাগেরহাট ভৌগোলিকভাবে এই অঞ্চলেরই অংশ। তবে বাগেরহাটে প্রাচীন যুগের কোনো লিপি বা নগরের কথা আমাদের দেখা সূত্রগুলোতে নেই।
সবচেয়ে জোরালো প্রমাণ এসেছে সুন্দরবনের কাদামাটি থেকে। ২০১৮ সালে শখের প্রত্নসন্ধানী ইসমে আজম সুন্দরবনের পাঁচটি জায়গায় পুরোনো ইটের কাঠামোর খবর দেন; বড় কাঠামোগুলো সাতক্ষীরা অংশে, তবে তালিকায় ছিল কটকাও। প্রথম আলো জানায়, কটকার সৈকতে মাটির নিচ থেকে বেরিয়ে পড়া চৌকো ইটের কাঠামোগুলো আসলে লবণ জ্বাল দেওয়ার চুল্লি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ববিদ হুমায়ুন আখতার ও জার্মান গবেষকদের কাজের বরাতে বলা হয়, এর কোনোটি ২৫০–৩০০ বছরের, কোনোটি প্রায় ৬০০ বছরের, আর একটি প্রায় এক হাজার বছরের পুরোনো। পাশের এক টিলায় পানি ছাঁকা আর নালার চিহ্নও মিলেছে।
২০২২ সালে ‘ন্যাচারাল হ্যাজার্ডস’ সাময়িকীতে প্রকাশিত হানেবুথ ও সহকর্মীদের গবেষণা (সহলেখক হুমায়ুন আখতার) সুন্দরবনের ১০৮টি ডুবে যাওয়া চুল্লি ও ম্যানগ্রোভ গাছের গুঁড়ির বয়স মেপে অষ্টম শতক থেকে প্রায় ১৩০০ বছরের ভূমি দেবে যাওয়ার ইতিহাস সাজিয়েছে। তাঁদের হিসাবে প্রায় ৯০০ বছর সমুদ্রতল মোটামুটি স্থির ছিল; তারপর আঠারো শতকে, সম্ভবত ১৭৬২ সালের আরাকান ভূমিকম্পে, স্থানভেদে মাটি এক থেকে দুই মিটার বসে যায়। অর্থাৎ যেখানে একসময় মানুষ লবণ বানাত, সেখানে এখন জোয়ারের পানি ওঠে।
উনিশ শতকের নথিও একই ইঙ্গিত দেয়। জে. ওয়েস্টল্যান্ড ১৮৭১ সালে যশোর জেলার ওপর লেখা সরকারি প্রতিবেদনে জানান, মোড়েলগঞ্জের দেওয়ান তাঁকে বলেছিলেন—বন কাটতে গিয়ে আবাদকারীরা গহিন জঙ্গলে ইটের ঘাট, পুকুরের চিহ্ন, এমনকি ইটের পাঁজাও পেয়েছেন। ওয়েস্টল্যান্ডের ধারণা ছিল, সুন্দরবনের নানা জায়গায় বসতি গড়ে উঠেছে, আবার হারিয়েও গেছে; খানজাহানের আবাদ করা জমির বড় অংশও পরে জঙ্গলে ঢেকে গিয়েছিল।
জেলা তথ্য বাতায়নে আরেকটি বিবরণ আছে: খানজাহানের আমলে খাঞ্জেলী দিঘি খননের সময় একটি ধ্যানী বুদ্ধমূর্তি পাওয়া গিয়েছিল, যা পরে ঢাকার কমলাপুর বৌদ্ধ বিহারে নেওয়া হয়। বাংলা উইকিপিডিয়া মূর্তিটিকে পাল আমলের বলে উল্লেখ করেছে এবং লিখেছে, ১৯৭১ সালে বিশুদ্ধানন্দ মহাথেরো এটি কমলাপুর বিহারে স্থাপন করেন। তবে মূর্তিটি কবে, কীভাবে পাওয়া গেল, তার স্বাধীন প্রত্নতাত্ত্বিক বিবরণ আমরা খুঁজে পাইনি, তাই এটিকে প্রচলিত বিবরণ হিসেবেই পড়া ভালো। সব মিলিয়ে বলা যায়, খানজাহান একেবারে জনশূন্য প্রান্তরে আসেননি; তবে তাঁর আগের বাগেরহাটের পূর্ণ ছবি এখনো গবেষণার অপেক্ষায়।