বলেশ্বর ও হরিণঘাটা নামের অর্থ গেজেটিয়ারের দেওয়া ব্যাখ্যা। বসতির সাল (১৮৬১) একটি ইউনিয়ন বাতায়নের তথ্য, অন্য কোনো সূত্রে যাচাই করা যায়নি। শরণখোলা নামের উৎপত্তি নিয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্র পাওয়া যায়নি।
শরণখোলার উপজেলা সদর রায়েন্দা দাঁড়িয়ে আছে বলেশ্বর নদীর তীরে। ১৯০৮ সালের খুলনা জেলা গেজেটিয়ার নদীটির পরিচয় দিয়েছে এভাবে: মধুমতি মানিকদহের কাছে এসে নাম নেয় বলেশ্বর, যার অর্থ ‘শক্তির অধিপতি’; তারপর সুন্দরবন পাড়ি দিয়ে সাগরে মেশে হরিণঘাটা নামে, যার মানে ‘হরিণের জল খাওয়ার ঘাট’। মোহনায় প্রায় ৯ মাইল চওড়া এই নদী দিয়ে সমুদ্রগামী জাহাজ মোরেলগঞ্জের কাছাকাছি পর্যন্ত আসতে পারত। শরণখোলা উপজেলা তথ্য বাতায়ন জানায়, বলেশ্বর থেকে পানগুছি হয়ে নৌপথে বাগেরহাট, এমনকি ঢাকায় যাতায়াতের ব্যবস্থা ছিল।
এই জনপদের বয়স খুব বেশি নয়। রায়েন্দা ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য বাতায়নে বলা হয়েছে, ১৮৬১ সালের দিকে পাশের বরিশাল অঞ্চল থেকে আসা মানুষ বলেশ্বর-তীরের সুন্দরবন কেটে বসতি গড়েন; সেই জনপদের নাম শরণখোলা, আর তার দক্ষিণ অংশে গড়ে ওঠে রায়েন্দা। উপজেলা বাতায়নও বলছে, বন সরিয়ে গড়া এই জনপদে নানা জেলা থেকে মানুষ এসেছেন বলে কথ্যভাষায় বরিশালের প্রভাব স্পষ্ট। ১৯০৮ সালের গেজেটিয়ারে শরণখোলাকে একটি পুলিশ ‘আউটপোস্ট’ হিসেবে দেখানো হয়েছে; বাংলাপিডিয়া অবশ্য শরণখোলা থানা গঠনের সাল ১৯০৭ বলেছে। পরে রায়েন্দা বাজারই হয়ে ওঠে থানা সদর ও এলাকার প্রাণকেন্দ্র; ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় রায়েন্দা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়।
নদী আর সাগরের এত কাছে বলে লোনা পানি ঠেকানো ছিল বড় সমস্যা। বাংলাপিডিয়া জানায়, ১৯৬৫ সালে লবণাক্ততা থেকে জমি বাঁচাতে নদী বরাবর বেড়িবাঁধ দেওয়া হয় এবং খালগুলোর মুখ বেঁধে দেওয়া হয়; কিন্তু পানি নামতে না পেরে জলাবদ্ধতায় ব্যাপক ফসল নষ্ট হতে থাকে। সরকারের কাছে আবেদন-নিবেদনে প্রতিকার না পেয়ে ১৯৬৯ সালের ১০ মার্চ স্থানীয় কৃষকেরা একযোগে রায়েন্দা, তাফালবাড়ী, খোন্তাকাটা ও কুমারখালী খালের বাঁধ কেটে দেন। এ ঘটনার নেতৃত্ব বা পরিণতি নিয়ে আর কোনো বিস্তারিত বিবরণ আমরা খুঁজে পাইনি।
দুই বছর পর এই বাজারই হয়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের এক কেন্দ্র। ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ মওলানা ভাসানী রায়েন্দা স্কুল মাঠে জনসভা করেন; পরে এই মাঠেই শুরু হয় সংগ্রাম পরিষদের প্রশিক্ষণ। যুদ্ধের সময় বাজারের দুটি ক্যাম্পে চলত নির্যাতন, আর বলেশ্বর-তীরের ‘পুরোনো স্টিমারঘাট’ পরিণত হয় বধ্যভূমিতে—ঘাটটির নামই মনে করিয়ে দেয় নদীপথে স্টিমার চলাচলের দিনের কথা। ১৪ ডিসেম্বর রায়েন্দা বাজারের সম্মুখযুদ্ধে পাঁচজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।
রায়েন্দার সাংস্কৃতিক জীবনেরও নিজস্ব চিহ্ন আছে—বাংলাপিডিয়া রায়েন্দা শীতলা কালী মন্দির এবং রায়েন্দা বটতলার বৈশাখী মেলার উল্লেখ করেছে। তবে বলেশ্বরের ভাঙন এই উপকূলের মানচিত্র বারবার বদলাচ্ছে। দ্য ডেইলি স্টার (২০২৫) জানিয়েছে, একসময়ের জনপ্রিয় বগী বন্দর নদীতে বিলীন হয়ে গেছে; সিডরের পর বানানো টেকসই বাঁধেও গাবতলা, রায়েন্দা ও রাজৈরে ব্লক ধসে পড়ার খবর এসেছে (সারাবাংলা, ২০২৪)।