বলেশ্বরের পাড়ে রায়েন্দা: বন কেটে গড়া জনপদ, বাঁধ কাটার বিদ্রোহ

প্রমাণিত ইতিহাসব্রিটিশ আমলউনিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে বর্তমানরায়েন্দা ও বগী, শরণখোলা

‘শক্তির অধিপতি’ বলেশ্বরের তীরে বরিশাল থেকে আসা মানুষেরা বন কেটে গড়েছিলেন শরণখোলা। তার প্রাণকেন্দ্র রায়েন্দা বাজার দেখেছে ১৯৬৯ সালের বাঁধ কাটার কৃষক-বিদ্রোহ, ভাসানীর জনসভা আর নদীভাঙনে বগী বন্দরের হারিয়ে যাওয়া।

বলেশ্বর ও হরিণঘাটা নামের অর্থ গেজেটিয়ারের দেওয়া ব্যাখ্যা। বসতির সাল (১৮৬১) একটি ইউনিয়ন বাতায়নের তথ্য, অন্য কোনো সূত্রে যাচাই করা যায়নি। শরণখোলা নামের উৎপত্তি নিয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্র পাওয়া যায়নি।

শরণখোলার উপজেলা সদর রায়েন্দা দাঁড়িয়ে আছে বলেশ্বর নদীর তীরে। ১৯০৮ সালের খুলনা জেলা গেজেটিয়ার নদীটির পরিচয় দিয়েছে এভাবে: মধুমতি মানিকদহের কাছে এসে নাম নেয় বলেশ্বর, যার অর্থ ‘শক্তির অধিপতি’; তারপর সুন্দরবন পাড়ি দিয়ে সাগরে মেশে হরিণঘাটা নামে, যার মানে ‘হরিণের জল খাওয়ার ঘাট’। মোহনায় প্রায় ৯ মাইল চওড়া এই নদী দিয়ে সমুদ্রগামী জাহাজ মোরেলগঞ্জের কাছাকাছি পর্যন্ত আসতে পারত। শরণখোলা উপজেলা তথ্য বাতায়ন জানায়, বলেশ্বর থেকে পানগুছি হয়ে নৌপথে বাগেরহাট, এমনকি ঢাকায় যাতায়াতের ব্যবস্থা ছিল।

এই জনপদের বয়স খুব বেশি নয়। রায়েন্দা ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য বাতায়নে বলা হয়েছে, ১৮৬১ সালের দিকে পাশের বরিশাল অঞ্চল থেকে আসা মানুষ বলেশ্বর-তীরের সুন্দরবন কেটে বসতি গড়েন; সেই জনপদের নাম শরণখোলা, আর তার দক্ষিণ অংশে গড়ে ওঠে রায়েন্দা। উপজেলা বাতায়নও বলছে, বন সরিয়ে গড়া এই জনপদে নানা জেলা থেকে মানুষ এসেছেন বলে কথ্যভাষায় বরিশালের প্রভাব স্পষ্ট। ১৯০৮ সালের গেজেটিয়ারে শরণখোলাকে একটি পুলিশ ‘আউটপোস্ট’ হিসেবে দেখানো হয়েছে; বাংলাপিডিয়া অবশ্য শরণখোলা থানা গঠনের সাল ১৯০৭ বলেছে। পরে রায়েন্দা বাজারই হয়ে ওঠে থানা সদর ও এলাকার প্রাণকেন্দ্র; ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় রায়েন্দা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়।

নদী আর সাগরের এত কাছে বলে লোনা পানি ঠেকানো ছিল বড় সমস্যা। বাংলাপিডিয়া জানায়, ১৯৬৫ সালে লবণাক্ততা থেকে জমি বাঁচাতে নদী বরাবর বেড়িবাঁধ দেওয়া হয় এবং খালগুলোর মুখ বেঁধে দেওয়া হয়; কিন্তু পানি নামতে না পেরে জলাবদ্ধতায় ব্যাপক ফসল নষ্ট হতে থাকে। সরকারের কাছে আবেদন-নিবেদনে প্রতিকার না পেয়ে ১৯৬৯ সালের ১০ মার্চ স্থানীয় কৃষকেরা একযোগে রায়েন্দা, তাফালবাড়ী, খোন্তাকাটা ও কুমারখালী খালের বাঁধ কেটে দেন। এ ঘটনার নেতৃত্ব বা পরিণতি নিয়ে আর কোনো বিস্তারিত বিবরণ আমরা খুঁজে পাইনি।

দুই বছর পর এই বাজারই হয়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের এক কেন্দ্র। ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ মওলানা ভাসানী রায়েন্দা স্কুল মাঠে জনসভা করেন; পরে এই মাঠেই শুরু হয় সংগ্রাম পরিষদের প্রশিক্ষণ। যুদ্ধের সময় বাজারের দুটি ক্যাম্পে চলত নির্যাতন, আর বলেশ্বর-তীরের ‘পুরোনো স্টিমারঘাট’ পরিণত হয় বধ্যভূমিতে—ঘাটটির নামই মনে করিয়ে দেয় নদীপথে স্টিমার চলাচলের দিনের কথা। ১৪ ডিসেম্বর রায়েন্দা বাজারের সম্মুখযুদ্ধে পাঁচজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।

রায়েন্দার সাংস্কৃতিক জীবনেরও নিজস্ব চিহ্ন আছে—বাংলাপিডিয়া রায়েন্দা শীতলা কালী মন্দির এবং রায়েন্দা বটতলার বৈশাখী মেলার উল্লেখ করেছে। তবে বলেশ্বরের ভাঙন এই উপকূলের মানচিত্র বারবার বদলাচ্ছে। দ্য ডেইলি স্টার (২০২৫) জানিয়েছে, একসময়ের জনপ্রিয় বগী বন্দর নদীতে বিলীন হয়ে গেছে; সিডরের পর বানানো টেকসই বাঁধেও গাবতলা, রায়েন্দা ও রাজৈরে ব্লক ধসে পড়ার খবর এসেছে (সারাবাংলা, ২০২৪)।

তথ্যসূত্র

  1. Bengal District Gazetteers: Khulna · L. S. S. O'Malley, Bengal Secretariat Book Depot, Calcutta, ১৯০৮
  2. রায়েন্দা ইউনিয়নের ইতিহাস · রায়েন্দা ইউনিয়ন পরিষদ তথ্য বাতায়ন, ২০১৪
  3. শরণখোলা উপজেলার পটভূমি · শরণখোলা উপজেলা তথ্য বাতায়ন, ২০১৪
  4. ভাষা ও সংস্কৃতি · শরণখোলা উপজেলা তথ্য বাতায়ন, ২০১৪
  5. নদ-নদী · শরণখোলা উপজেলা তথ্য বাতায়ন, ২০১৪
  6. শরণখোলা উপজেলা · বাংলাপিডিয়া, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি
  7. মুক্তিযুদ্ধে শরণখোলা উপজেলা (বাগেরহাট) — বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ, ৯ম খণ্ড থেকে উদ্ধৃত · সংগ্রামের নোটবুক (মূল: বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ২০২০)
  8. সিডরের ১৮ বছর: শরণখোলার মানুষের মনে এখনো শঙ্কার ছায়া · দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, ২০২৫
  9. ঘূর্ণিঝড় সিডরের আঘাতের ১৭ বছর আজ · সারাবাংলা, ২০২৪

কোনো তথ্য ভুল মনে হলে বা আরও ভালো সূত্র জানা থাকলে নিচে জানান; যাচাই করে ঠিক করা হবে।

শরণখোলা-এর আরও গল্প

সব দেখুন
খানজাহানের আগের বাগেরহাট: লবণের চুল্লি, ইটের ঘাট আর হারানো বসতিখানজাহান আলী আসার বহু আগেও সুন্দরবনের কোলে মানুষ লবণ জ্বাল দিত, ইটের ঘাট বাঁধত। কটকার ডুবে যাওয়া চুল্লি আর পুরোনো নথি সেই হারানো বসতির কথা বলে।ইতিহাস ও জনশ্রুতিদুবলার চরের রাস: হরিভজনের পূজা থেকে সাগরতীরের উৎসবকার্তিকের রাস পূর্ণিমায় সুন্দরবনের শেষ প্রান্তে সাগরের প্রথম জোয়ারে পুণ্যস্নান। কে শুরু করেছিলেন এই উৎসব, কেন মন্দিরে রাধাকৃষ্ণের পাশে বনবিবি আর গাজী-কালু, আর কেন এখন আর মেলা বসে না।ইতিহাস ও জনশ্রুতিএকাত্তরের শরণখোলা: কাঠের রাইফেল, রায়েন্দা ক্যাম্প আর বগীর লড়াইবাঁশের লাঠি আর কাঠমিস্ত্রির বানানো কাঠের রাইফেলে শুরু হয়েছিল শরণখোলার প্রস্তুতি। রায়েন্দা ক্যাম্পে হামলা, বগী-গাবতলার রক্তাক্ত দিন, আর বিজয় দিবসের দুই দিন পর—১৮ ডিসেম্বর—শরণখোলার পূর্ণ মুক্তি।প্রমাণিত ইতিহাসসিডরের রাত: শরণখোলা, সাউথখালী আর টেকসই বাঁধের অপেক্ষা২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বরের রাতে সিডরের জলোচ্ছ্বাসে সবচেয়ে বেশি প্রাণ হারায় বাগেরহাটের শরণখোলা, বিশেষ করে সাউথখালী। কত মানুষ মারা গিয়েছিলেন, কীভাবে আবার ঘর উঠল, আর কেন মানুষ বলেন ‘ত্রাণ নয়, বাঁধ চাই’।প্রমাণিত ইতিহাস