একাত্তরের শরণখোলা: কাঠের রাইফেল, রায়েন্দা ক্যাম্প আর বগীর লড়াই

প্রমাণিত ইতিহাসমুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১মার্চ–ডিসেম্বর ১৯৭১রায়েন্দা, বগী-গাবতলা, রাজাপুর — শরণখোলা

বাঁশের লাঠি আর কাঠমিস্ত্রির বানানো কাঠের রাইফেলে শুরু হয়েছিল শরণখোলার প্রস্তুতি। রায়েন্দা ক্যাম্পে হামলা, বগী-গাবতলার রক্তাক্ত দিন, আর বিজয় দিবসের দুই দিন পর—১৮ ডিসেম্বর—শরণখোলার পূর্ণ মুক্তি।

সুন্দরবনের কোলঘেঁষা শরণখোলায় মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল প্রায় খালি হাতে। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষের (নবম খণ্ড) শরণখোলা-ভুক্তি অনুযায়ী, ৩ মার্চ মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী রায়েন্দা স্কুল মাঠের জনসভায় ভাষণ দেন। পরে রায়েন্দা বাজার পাইলট হাইস্কুল মাঠে সংগ্রাম পরিষদের কর্মীরা প্রথমে বাঁশের লাঠি হাতে প্রশিক্ষণ নেন, তারপর রায়েন্দা বাজারের কাঠমিস্ত্রি মোতাহার মিয়ার বানানো কাঠের রাইফেলে। এপ্রিলের মাঝামাঝি সুন্দরবন সাব-সেক্টরের অধিনায়ক জিয়াউদ্দিন শরণখোলায় এসে থানা থেকে সংগৃহীত অস্ত্র সংগ্রাম কমিটির নেতাদের হাতে দেন; পরে বগীতে তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন ক্যাম্পে অনেকে প্রশিক্ষণ নেন, গড়ে ওঠে সুন্দরবনভিত্তিক মুক্তিবাহিনীর ঘাঁটি।

উপজেলা তথ্য বাতায়নের বিবরণে, এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে একটি পাকিস্তানি গানবোট বলেশ্বর দিয়ে রায়েন্দা পর্যন্ত টহল দিয়ে ফিরে যায়। ১ জুন পাকিস্তানি সেনাদের নেতৃত্বে রাজাকারদের একটি দল এসে শরণখোলা থানার দোতলা ভবনে ক্যাম্প করে, রায়েন্দা ইউনিয়ন পরিষদ ভবনেও একটি ছোট ক্যাম্প বসে; জুলাইয়ের শেষে রায়েন্দা বাজারের একটি দোতলা দালান দখল করে গড়া হয় শক্ত ঘাঁটি, যেখানে বন্দিদের নির্যাতন চলত। ২৮ জুন রাজেশ্বর ও লাকুড়তলা গ্রামে গণহত্যা হয়, লাশ ভাসিয়ে দেওয়া হয় নদী-খালে; ১৩ নভেম্বর রাজাপুরে ২০-৩০ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়। বাংলাপিডিয়া জানায়, যুদ্ধের সময় ত্যাঁড়াবাঁকা খালে শতাধিক মানুষকে ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয়েছিল। বগী-গাবতলা, রাজেশ্বর-লাকুড়তলা, রাজাপুর, বাধাল পোলঘাটা, মঠেরপাড় আর রায়েন্দা বাজারের পুরোনো স্টিমারঘাট বধ্যভূমি হিসেবে চিহ্নিত।

প্রতিরোধের প্রথম বড় আঘাত আসে ১১ জুলাই: ক্যাডেট অফিসার আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে ৪৭ জন মুক্তিযোদ্ধা রায়েন্দা রাজাকার ক্যাম্পে হামলা চালান। সেই লড়াইয়ে আনোয়ার হোসেন, আচমত আলী ও মো. ইসমাইল শহীদ হন। আগস্ট-সেপ্টেম্বরে শেলা নদীতে পাকিস্তানি নৌযানে একাধিক আক্রমণ হয়। ২১ অক্টোবর সকালে বরিশাল থেকে আসা একটি গানবোট বগীর মুক্তিবাহিনী ঘাঁটিতে হামলা করতে এলে ঘাঁটির দুই মাইল উত্তরে গাবতলা ওয়াপদা স্লুইসগেটে অ্যামবুশে থাকা আট সদস্যের একটি দল তাদের বাধা দেয়; ভারী গোলাবর্ষণের মুখে মুক্তিযোদ্ধারা সুন্দরবনের ভেতরে সরে যান। সেদিনই বগী গ্রাম ও গাবতলা বাজারে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকাররা বহু মানুষকে হত্যা করে।

৭ ডিসেম্বর জিয়াউদ্দিনের বাহিনী শরণখোলাকে হানাদারমুক্ত ঘোষণা করে, কিন্তু থানা সদর রায়েন্দায় তখনো রাজাকাররা অস্ত্রসহ একটি দোতলা ভবনে অবস্থান নিয়ে ছিল। ১৪ ডিসেম্বর রায়েন্দা বাজারের সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হন শেখ আবদুল আসাদ, টিপু সুলতান, হাবিলদার আলাউদ্দিন, গুরুপদ বালা ও আলতাফ হোসেন শিকদার। পুরো শরণখোলা মুক্ত হতে লেগে যায় ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত—বিজয় দিবসের দুই দিন পর।

রায়েন্দায় চার শহীদের সমাধিতে স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়েছে, শহীদদের নামে কয়েকটি সড়কের নামকরণ হয়েছে। স্বাধীনতার পরপর শরণখোলা থানার নাম একসময় রাখা হয়েছিল ‘আসাদনগর’। এই লেখার তথ্য মূলত মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ ও উপজেলা তথ্য বাতায়ন থেকে নেওয়া, যার দুটিই স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা ও গবেষক আবু জাফর জব্বারের সংগ্রহের ওপর দাঁড়িয়ে। স্থানীয় বিবরণে কয়েকজন স্বাধীনতাবিরোধীর নাম থাকলেও এসব ঘটনায় আদালতের কোনো রায় না পাওয়ায় এখানে তাঁদের নাম দেওয়া হয়নি।

তথ্যসূত্র

  1. মুক্তিযুদ্ধে শরণখোলা উপজেলা (বাগেরহাট) — বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ, ৯ম খণ্ড থেকে উদ্ধৃত · সংগ্রামের নোটবুক (মূল: বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ২০২০)
  2. মুক্তিযুদ্ধে শরণখোলা উপজেলা (তথ্য সংগ্রহ ও গবেষণা: বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু জাফর জব্বার) · শরণখোলা উপজেলা তথ্য বাতায়ন, ২০১৪
  3. শরণখোলা উপজেলা · বাংলাপিডিয়া, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি
  4. Sarankhola Upazila · Banglapedia, Asiatic Society of Bangladesh

কোনো তথ্য ভুল মনে হলে বা আরও ভালো সূত্র জানা থাকলে নিচে জানান; যাচাই করে ঠিক করা হবে।

শরণখোলা-এর আরও গল্প

সব দেখুন
খানজাহানের আগের বাগেরহাট: লবণের চুল্লি, ইটের ঘাট আর হারানো বসতিখানজাহান আলী আসার বহু আগেও সুন্দরবনের কোলে মানুষ লবণ জ্বাল দিত, ইটের ঘাট বাঁধত। কটকার ডুবে যাওয়া চুল্লি আর পুরোনো নথি সেই হারানো বসতির কথা বলে।ইতিহাস ও জনশ্রুতিবলেশ্বরের পাড়ে রায়েন্দা: বন কেটে গড়া জনপদ, বাঁধ কাটার বিদ্রোহ‘শক্তির অধিপতি’ বলেশ্বরের তীরে বরিশাল থেকে আসা মানুষেরা বন কেটে গড়েছিলেন শরণখোলা। তার প্রাণকেন্দ্র রায়েন্দা বাজার দেখেছে ১৯৬৯ সালের বাঁধ কাটার কৃষক-বিদ্রোহ, ভাসানীর জনসভা আর নদীভাঙনে বগী বন্দরের হারিয়ে যাওয়া।প্রমাণিত ইতিহাসদুবলার চরের রাস: হরিভজনের পূজা থেকে সাগরতীরের উৎসবকার্তিকের রাস পূর্ণিমায় সুন্দরবনের শেষ প্রান্তে সাগরের প্রথম জোয়ারে পুণ্যস্নান। কে শুরু করেছিলেন এই উৎসব, কেন মন্দিরে রাধাকৃষ্ণের পাশে বনবিবি আর গাজী-কালু, আর কেন এখন আর মেলা বসে না।ইতিহাস ও জনশ্রুতিসিডরের রাত: শরণখোলা, সাউথখালী আর টেকসই বাঁধের অপেক্ষা২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বরের রাতে সিডরের জলোচ্ছ্বাসে সবচেয়ে বেশি প্রাণ হারায় বাগেরহাটের শরণখোলা, বিশেষ করে সাউথখালী। কত মানুষ মারা গিয়েছিলেন, কীভাবে আবার ঘর উঠল, আর কেন মানুষ বলেন ‘ত্রাণ নয়, বাঁধ চাই’।প্রমাণিত ইতিহাস