সিডরের রাত: শরণখোলা, সাউথখালী আর টেকসই বাঁধের অপেক্ষা

প্রমাণিত ইতিহাসস্বাধীন বাংলাদেশ১৫ নভেম্বর ২০০৭ ও পরবর্তী বছরগুলোসাউথখালী, বগী, গাবতলা, রাজৈর — শরণখোলা

২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বরের রাতে সিডরের জলোচ্ছ্বাসে সবচেয়ে বেশি প্রাণ হারায় বাগেরহাটের শরণখোলা, বিশেষ করে সাউথখালী। কত মানুষ মারা গিয়েছিলেন, কীভাবে আবার ঘর উঠল, আর কেন মানুষ বলেন ‘ত্রাণ নয়, বাঁধ চাই’।

২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর রাতে ঘূর্ণিঝড় সিডর বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত হানে। বাগেরহাটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শরণখোলা উপজেলা, আর শরণখোলার মধ্যে সাউথখালী ইউনিয়ন। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদন অনুযায়ী বগী, গাবতলা ও সাউথখালীর গ্রামগুলোতে আট শতাধিক মানুষ মারা যান, যাঁদের বেশির ভাগের মৃত্যু হয় জলোচ্ছ্বাসে।

সরকারি হিসাবে বাগেরহাট জেলায় নিহত হন ৯০৮ জন; ইউএনবির ২০১৯ সালের প্রতিবেদনে উদ্ধৃত সরকারি তথ্য অনুযায়ী এর মধ্যে শরণখোলায় ৬৯৫ জন মারা যান এবং ৭৬ জন নিখোঁজ থাকেন। বেসরকারি হিসাবে সংখ্যাটা আরও বেশি বলে ধারণা করা হয়; কোনো কোনো প্রতিবেদনে শুধু শরণখোলাতেই অন্তত ৯০৮ জনের মৃত্যুর কথা লেখা হয়েছে, যা জেলার সরকারি সংখ্যার সঙ্গে হুবহু মিলে যায়—তাই সংখ্যাগুলো সাবধানে পড়া দরকার। জেলায় প্রায় ৬৫ হাজার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, প্রায় চার লাখ মানুষ দুর্গত হন। কোনো কোনো পরিবারের প্রায় সবাই হারিয়ে যান; ইউএনবি জানিয়েছে, রাজৈরের একটি পরিবারেরই ২৬ জন প্রাণ হারান। অনেকের লাশ আর পাওয়া যায়নি।

বিশেষজ্ঞরা এত প্রাণহানির একটি বড় কারণ হিসেবে কাছাকাছি আশ্রয়কেন্দ্রের অভাবকে চিহ্নিত করেছিলেন। এরপর এলাকায় দোতলা-তিনতলা ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি হয়েছে, অনেক জায়গায় আগের চেয়ে মজবুত ঘর উঠেছে, গাছপালা আবার বড় হয়েছে। ২০২৫ সালে দ্য ডেইলি স্টার দেখেছে, মাঠে আবার ধান পাকে; কিন্তু স্বজন হারানো অনেকে এখনো আগের জীবনে ফিরতে পারেননি, আর প্রতিবার ঝড়ের সংকেতে আতঙ্ক ফিরে আসে।

শরণখোলার মানুষের সবচেয়ে বড় দাবি ছিল টেকসই বেড়িবাঁধ। বগী বন্দরের এক দোকানি ২০১৯ সালে বিডিনিউজকে বলেছিলেন, ‘আমরা আর ত্রাণ চাই না’—তাঁরা চান নদীশাসনসহ টেকসই বাঁধ। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন প্রকল্পের (সিইআইপি-১) আওতায় শরণখোলা-মোরেলগঞ্জের ৩৫/১ পোল্ডারে ৬২ কিলোমিটার বাঁধের কাজ শুরু হয় ২০১৬ সালে; নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে তা শেষ হয় বলে সারাবাংলা জানিয়েছে। কিন্তু হস্তান্তরের কিছুদিনের মধ্যেই গাবতলা, রায়েন্দা ও রাজৈরে বাঁধের ঢালের ব্লক ধসে পড়ে; স্থানীয়রা আশঙ্কা করেন, নদীশাসন ছাড়া এই বাঁধ টিকবে না।

এই উপকূলে ঝড়ের ক্ষত নতুন নয়। ১৮৭৪ সালে প্রকাশিত যশোর জেলার প্রতিবেদনে জেমস ওয়েস্টল্যান্ড লিখেছিলেন, ১৮৬৯ সালের ১৬ মে-র ঘূর্ণিঝড়ে কেবল মোরেলগঞ্জের আশপাশেই ২৫০ জন মারা যান। দেড় শ বছর পরও প্রতিবছর ১৫ নভেম্বর এলে শরণখোলার স্বজনহারা মানুষের কথা সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে—শোকের সঙ্গে থাকে একটি নিরাপদ বাঁধের প্রত্যাশা।

তথ্যসূত্র

  1. সিডরের একযুগ: স্বজনহারা দুর্গতদের মনের ক্ষত আজও শুকায়নি · দ্য ডেইলি স্টার বাংলা (ইউএনবি), ২০১৯
  2. সিডরের পর বাঁধের অপেক্ষায় এক যুগ · বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ২০১৯
  3. সিডরের ১৮ বছর: শরণখোলার মানুষের মনে এখনো শঙ্কার ছায়া · দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, ২০২৫
  4. সিডরের ১৪ বছর, ভয়ংকর সেই দিন · প্রথম আলো, ২০২১
  5. ঘূর্ণিঝড় সিডরের আঘাতের ১৭ বছর আজ · সারাবাংলা, ২০২৪
  6. শরণখোলা উপজেলা · বাংলাপিডিয়া, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি
  7. A Report on the District of Jessore: its antiquities, its history and its commerce (2nd edition) · J. Westland, Bengal Secretariat Press, Calcutta, ১৮৭৪

কোনো তথ্য ভুল মনে হলে বা আরও ভালো সূত্র জানা থাকলে নিচে জানান; যাচাই করে ঠিক করা হবে।

শরণখোলা-এর আরও গল্প

সব দেখুন
খানজাহানের আগের বাগেরহাট: লবণের চুল্লি, ইটের ঘাট আর হারানো বসতিখানজাহান আলী আসার বহু আগেও সুন্দরবনের কোলে মানুষ লবণ জ্বাল দিত, ইটের ঘাট বাঁধত। কটকার ডুবে যাওয়া চুল্লি আর পুরোনো নথি সেই হারানো বসতির কথা বলে।ইতিহাস ও জনশ্রুতিবলেশ্বরের পাড়ে রায়েন্দা: বন কেটে গড়া জনপদ, বাঁধ কাটার বিদ্রোহ‘শক্তির অধিপতি’ বলেশ্বরের তীরে বরিশাল থেকে আসা মানুষেরা বন কেটে গড়েছিলেন শরণখোলা। তার প্রাণকেন্দ্র রায়েন্দা বাজার দেখেছে ১৯৬৯ সালের বাঁধ কাটার কৃষক-বিদ্রোহ, ভাসানীর জনসভা আর নদীভাঙনে বগী বন্দরের হারিয়ে যাওয়া।প্রমাণিত ইতিহাসদুবলার চরের রাস: হরিভজনের পূজা থেকে সাগরতীরের উৎসবকার্তিকের রাস পূর্ণিমায় সুন্দরবনের শেষ প্রান্তে সাগরের প্রথম জোয়ারে পুণ্যস্নান। কে শুরু করেছিলেন এই উৎসব, কেন মন্দিরে রাধাকৃষ্ণের পাশে বনবিবি আর গাজী-কালু, আর কেন এখন আর মেলা বসে না।ইতিহাস ও জনশ্রুতিএকাত্তরের শরণখোলা: কাঠের রাইফেল, রায়েন্দা ক্যাম্প আর বগীর লড়াইবাঁশের লাঠি আর কাঠমিস্ত্রির বানানো কাঠের রাইফেলে শুরু হয়েছিল শরণখোলার প্রস্তুতি। রায়েন্দা ক্যাম্পে হামলা, বগী-গাবতলার রক্তাক্ত দিন, আর বিজয় দিবসের দুই দিন পর—১৮ ডিসেম্বর—শরণখোলার পূর্ণ মুক্তি।প্রমাণিত ইতিহাস