শ্রীকৃষ্ণের রাসলীলার গল্প ধর্মীয় কিংবদন্তি। ‘২০০ বছরের’ দাবি আয়োজকদের, প্রমাণসহ নয়। ১৯২৩ সালে হরিভজনের সূচনার তথ্য লোকসংস্কৃতি গবেষকের লেখায় আছে, তবে অন্য প্রতিবেদনের সঙ্গে সময় নিয়ে অমিল রয়েছে।
সুন্দরবনের দক্ষিণ প্রান্তে, কুঙ্গা ও মরা পশুর নদীর মাঝে জেগে থাকা দ্বীপ দুবলার চর। বর্ষা শেষে অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত এখানে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের হাজারো জেলে অস্থায়ী ঘর বেঁধে মাছ ধরেন, শুঁটকি বানান। দ্য ডেইলি স্টারের বরাতে বাংলা উইকিপিডিয়া জানায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে এখানে প্রায় ৫ হাজার ১০০ টন শুঁটকি হয়েছিল। বন প্রশাসনের দিক থেকে চরটি সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জের অধীন, বন বিভাগের সেবা-তথ্যে এভাবেই লেখা; আর ২০১৪ সালে দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস আলোরকোলের উৎসবস্থলকে বাগেরহাটের ‘মোংলা থানার অধীন’ বলে উল্লেখ করেছিল।
প্রতিবছর কার্তিকের রাস পূর্ণিমায় চরের আলোরকোলে হয় রাস উৎসব। রাতে রাধাকৃষ্ণের পূজা, শঙ্খ-কাঁসি-ঢোলের সঙ্গে সংকীর্তন; ভোরে সাগরের প্রথম জোয়ারে পুণ্যস্নান। লোকসংস্কৃতি গবেষক সাইমন জাকারিয়া সমকালে লিখেছেন, ভক্তরা সাগরকে ‘মা-গঙ্গা’ কল্পনা করে ফল, ফুল আর মিষ্টান্ন ভাসিয়ে দেন, তারপর স্নান করে সূর্যপ্রণাম করেন। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, তিন দিনের এই উৎসবের মধ্য দিয়েই সুন্দরবনে মাছ ধরার মৌসুমের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়।
উৎসবটি কবে শুরু, তা নিয়ে তিন রকম কথা চালু আছে। আয়োজক কমিটির নেতারা বলেন, প্রায় ২০০ বছর ধরে এখানে রাস হচ্ছে (টিবিএস, ২০২০)। অনেকের বিশ্বাস, দ্বাপর যুগে শ্রীকৃষ্ণ এই দ্বীপেই রাধার অষ্টসখীর সঙ্গে রাসলীলা করেছিলেন; এটি নিছক ধর্মীয় কিংবদন্তি। আর সাইমন জাকারিয়ার লেখায় সবচেয়ে নির্দিষ্ট তথ্য: মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রবর্তক হরিচাঁদ ঠাকুরের এক বনবাসী ভক্ত ‘পাগল হরিভজন’ (১৮২৯–১৯২৩) ১৯২৩ সালে এখানে প্রথম রাসমেলার আয়োজন করেন; সে হিসাবে ২০২৪ সালে উৎসব শতবর্ষ পেরিয়েছে। প্রথম আলোর ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে অবশ্য হরিভজনের পূজা শুরুর সময় ‘উনিশ শতকের শুরুর দিক’ বলা হয়েছে, যা তাঁর জীবনকালের সঙ্গে মেলে না। তাই সূচনার সঠিক বছর নিশ্চিত নয়।
দুবলার রাস কেবল একটি সম্প্রদায়ের উৎসব হয়ে থাকেনি। সমকালের লেখায় দেখা যায়, অস্থায়ী মন্দিরে রাধাকৃষ্ণ, গঙ্গা ও শিবের পাশে বসানো হয় বনবিবি আর মুসলিম পীর গাজী-কালুর মূর্তি; উদ্যাপন কমিটিতে থাকেন খুলনা-বাগেরহাটের হিন্দু ও মুসলমান নেতারা; পুণ্যার্থীদের বহনকারী নৌকা, ট্রলার ও লঞ্চের মাঝি, চালক আর বাবুর্চিদের বেশির ভাগই মুসলমান। ২০২৪ সালে প্রায় ২০-২৫ বছর পর আবার ‘পাগল হরিভজন’ পুথি পাঠের আসর বসে।
সময়ের সঙ্গে উৎসবের চেহারা বদলেছে। টিবিএসের হিসাবে সাধারণত ৫০-৬০ হাজার পুণ্যার্থী ও দর্শনার্থী আসতেন। কিন্তু প্রথম আলো জানায়, ২০১৭ সাল থেকে বন বিভাগের সিদ্ধান্তে মেলা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন বন্ধ; এখন কেবল পূজা আর পুণ্যস্নান হয়। ২০২৫ সালে শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বী পুণ্যার্থীরা জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে বন বিভাগের নির্ধারিত পাঁচটি পথে আলোরকোলে যেতে পেরেছেন। বন কর্মকর্তারা জানান, অতীতে পুণ্যার্থী বা জেলের ছদ্মবেশে হরিণ শিকারিরা বনে ঢোকার চেষ্টা করেছে; সেবারও হরিণ ধরার ১০০টি ফাঁদসহ সাতজনকে আটক করা হয়।