ঘটনাটি প্রামাণ্য ইতিহাস; তবে নিহতের সংখ্যা সূত্রভেদে ১৫ থেকে ৭০ পর্যন্ত। কোনো আদালত এ ঘটনায় কাউকে দণ্ড দিয়েছে বলে আমরা পাইনি, তাই কারও নাম লেখা হয়নি।
কচুয়া সদর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে ভাসা বাজার; বাজার আর কচুয়ার মাঝামাঝি মঘিয়া গ্রাম। ১৯৭১ সালের ১৫ অক্টোবর, বাংলা ২৮ আশ্বিন ১৩৭৮, শুক্রবার ছিল ভাসা বাজারের সাপ্তাহিক হাট। রাজাকারেরা প্রায়ই টহল দিতে এই বাজারে আসত, তাই চারদিকে ভয় ছিল; তবু হাটের দিন বলে লোকসমাগম ছিল অন্য দিনের চেয়ে বেশি। মানুষ তাড়াতাড়ি কাজ সেরে বাড়ি ফিরতে চাইছিলেন।
বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষের বিবরণ অনুযায়ী, বিকেল চারটার দিকে কচুয়া থানার সশস্ত্র রাজাকাররা বাজারে এসে ২৫–৩০ জনকে আটক করে। তাঁদের দুই সারিতে দাঁড় করিয়ে কচুয়ার দিকে হাঁটিয়ে নেওয়া হয়। মঘিয়ার ধোপাবাড়ির মোড়ে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা নামে। রাস্তার পাশে খালের ধারে বন্দিদের গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়, তারপর একে একে খালপাড়ে নিয়ে গুলি করে, রামদা দিয়ে কুপিয়ে ও বেয়নেট চালিয়ে হত্যা করা হয়। গবেষক স্বরোচিষ সরকারের ‘একাত্তরের বাগেরহাট’ বইয়ের সূত্রে জানা যায়, আটক কয়েকজন মুসলমানকে নির্যাতনের পর পাকিস্তানের পক্ষে থাকার ওয়াদা করিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।
ঘাড়ে গুলি আর বুকে বেয়নেটের আঘাত নিয়ে মৃত ভেবে ফেলে যাওয়া এক তরুণ সেদিন বেঁচে যান। স্থানীয় এক ব্যক্তি তাঁকে নিজের বাড়িতে নিয়ে খড়ের গাদায় লুকিয়ে রাখেন, পরে বাড়ি পৌঁছে দেন। তাঁর বর্ণনা থেকেই সেই সন্ধ্যার বিস্তারিত জানা যায়। জ্ঞানকোষে ১৫ জন শহীদের নাম আছে; তাঁরা ছিলেন ভাসা, সানপুকুরিয়া, আন্ধারমানিক, সিটাবাড়ি, রথখোলা ও পাতিলাখালী গ্রামের বাসিন্দা, এক পরিবারের দুই ভাইও ছিলেন তাঁদের মধ্যে।
সংখ্যা নিয়ে অবশ্য সূত্রভেদ বড়। বাংলাপিডিয়ার কচুয়া উপজেলা নিবন্ধে ভাসা বাজার থেকে প্রায় ৬০ জনকে ধরে নিয়ে হত্যার কথা আছে, আর বাগেরহাট জেলা নিবন্ধে সংখ্যাটি ৭০। মুনতাসীর মামুন সম্পাদিত ‘মুক্তিযুদ্ধ কোষ’ জানায়, রাজাকাররা বিভিন্ন এলাকা থেকে লোক ধরে এনেও মঘিয়ার এই জায়গায় হত্যা করত; এই বধ্যভূমিতে মোট কতজন প্রাণ হারিয়েছেন, তার সঠিক হিসাব জানা নেই।
ভাসা বাজার পরে আরেকবার রক্তাক্ত হয়। ৩ ডিসেম্বর সেখানে রাজাকারদের সঙ্গে যুদ্ধে পাঁচজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। তাঁদের স্মরণে ভাসা–গজালিয়া সড়কের পাশে বি সি ভাসা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সামনে একটি স্মৃতিস্তম্ভ আছে; মঘিয়ার হত্যাস্থলে নির্মিত হয়েছে আলাদা স্মৃতিস্তম্ভ। দশ দিন পর, ১৩ ডিসেম্বর গভীর রাতে কচুয়ার রাজাকাররা বাগেরহাটের দিকে পালিয়ে গেলে থানা মুক্ত হয়।