যে থানায় ঢুকতে পারেনি পাকিস্তানি সেনারা

প্রমাণিত ইতিহাসমুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১মার্চ–ডিসেম্বর ১৯৭১কচুয়া থানা (ধোপাখালী, মাধবকাঠি, সন্তোষপুর, ভাসা)

সেতুর পাটাতন খুলে আর স্থানীয় বাহিনী গড়ে কচুয়ার মানুষ পাকিস্তানি সেনাদের থানায় ঢুকতে দেননি। তবু রাজাকারদের হাতে এ জনপদ রক্ত দিয়েছে; ১৩ ডিসেম্বর কচুয়া মুক্ত হয়।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে কচুয়া-মোড়েলগঞ্জ আসন থেকে প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের মীর সাখাওয়াত আলী দারু। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ অনুযায়ী, ২৫ মার্চের পর তাঁর নেতৃত্বে কচুয়ায় সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়। কচুয়া ফুটবল মাঠে স্বেচ্ছাসেবক যুবকদের প্রশিক্ষণ শুরু হয়; প্রশিক্ষক ছিলেন আনসার কমান্ডার, সাবেক মুজাহিদ ও অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্যরা। থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়মের তোয়াক্কা না করে থানা থেকে ৪০টি রাইফেল স্বেচ্ছাসেবকদের হাতে তুলে দেন।

ধোপাখালী হাইস্কুলে খোলা হয় রিক্রুটিং ক্যাম্প ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র; সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে আসা কয়েকজন বাঙালি সৈনিকও সেখানে যোগ দেন। কচুয়া ছিল মেজর এম এ জলিলের ৯ নম্বর সেক্টরে। বাগেরহাট ও কচুয়া নিয়ে গঠিত সাব-সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন তাজুল ইসলাম, আর সেক্টরের উত্তরাঞ্চলের সাব-সেক্টর সদর বসেছিল সন্তোষপুরের তহশিল অফিস ও স্কুলে। জায়গাটি তখন কচুয়া থানায় ছিল, এখন চিতলমারী উপজেলায়।

থানার পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম সীমানা পাহারা দিত দুটি স্থানীয় বাহিনী: হাবিবুর রহমান হবির ‘হবি বাহিনী’ আর রফিকুল ইসলাম খোকনের ‘রফিক বাহিনী’, যার বেশির ভাগ সদস্য ছিলেন বামপন্থী ছাত্রকর্মী। দুই বাহিনী মিলে মাধবকাঠি মাদ্রাসায় অবস্থান নেওয়া রাজাকার ও মিলিশিয়াদের ক্যাম্প আক্রমণ করে দখল নেয়। প্রতিরোধযোদ্ধারা সড়কের সেতুগুলোর পাটাতন খুলে ফেলায় যোগাযোগ ভেঙে পড়ে। জ্ঞানকোষের ভাষ্য, পুরো যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনারা কচুয়া থানায় ঢোকেনি, কোনো ক্যাম্পও বসায়নি। বাংলাপিডিয়াও লিখেছে, এ উপজেলায় পাকবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের সরাসরি কোনো যুদ্ধ হয়নি, তবে মুক্তিযোদ্ধারা একাধিকবার রাজাকার ক্যাম্পে হানা দিয়েছেন।

সেনারা না এলেও কচুয়া রেহাই পায়নি। ৮ মে থানায় শান্তি কমিটি গঠনের পর থেকেই লুটপাট শুরু হয়, যার প্রধান শিকার ছিলেন হিন্দু পরিবারগুলো; অনেককে জোর করে ধর্মান্তরিত করা হয়। ২৭ আগস্ট থানা সদরের তৎকালীন সিও অফিস দখল করে রাজাকাররা ক্যাম্প বসায়; শুরুতে সদস্য ছিল ৪১ জন, ডিসেম্বরে ১৪১। ক্যাম্পের সামনে ভৈরব নদের ঘাট হয়ে ওঠে বধ্যভূমি। শাঁখারীকাঠি আর মঘিয়ার হত্যাকাণ্ডও এই সময়ের। ৩ ডিসেম্বর ভাসা বাজারে রাজাকারদের সঙ্গে যুদ্ধে পাঁচজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।

শেষ পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের পাল্টা আক্রমণে টিকতে না পেরে ১৩ ডিসেম্বর রাত আড়াইটার দিকে রাজাকাররা বাগেরহাটের দিকে পালিয়ে যায়, আর সেদিনই কচুয়া হানাদারমুক্ত হয়। আজ উপজেলা পরিষদের সামনের সেই পুরোনো বধ্যভূমিতে আছে মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিস্তম্ভ; ভাসা, মঘিয়া ও শাঁখারীকাঠিতেও আলাদা স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়েছে।

তথ্যসূত্র

  1. মুক্তিযুদ্ধে কচুয়া উপজেলা (বাগেরহাট) · সংগ্রামের নোটবুক (মূল সূত্র: বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ, ২য় খণ্ড)
  2. ভৈরব নদের ঘাট বধ্যভূমি (কচুয়া, বাগেরহাট) · সংগ্রামের নোটবুক (মূল সূত্র: বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ, ৭ম খণ্ড)
  3. কচুয়া উপজেলা (বাগেরহাট) · বাংলাপিডিয়া (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ)
  4. Kachua Upazila (Bagerhat District) · Banglapedia (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ), ২০২৩

কোনো তথ্য ভুল মনে হলে বা আরও ভালো সূত্র জানা থাকলে নিচে জানান; যাচাই করে ঠিক করা হবে।

কচুয়া-এর আরও গল্প

সব দেখুন
কচু রায়ের নামে কচুয়া?উপজেলার সরকারি তথ্য বাতায়ন বলছে, জমিদার কচু রায়ের নাম থেকে এসেছে কচুয়া। সেই জমিদারের কোনো দলিল মেলেনি; তবে জনপদের ইতিহাসের কিছু চিহ্ন বেশ পুরোনো।ইতিহাস ও জনশ্রুতিভাসা বাজার থেকে মঘিয়ার খালপাড়হাটবারে ভাসা বাজার থেকে ধরে নেওয়া মানুষদের সন্ধ্যায় মঘিয়ায় খালের পাড়ে হত্যা করে রাজাকাররা। নিহতের সংখ্যা নিয়ে সূত্রগুলোতে বড় ফারাক থাকলেও ১৫ জন শহীদের নাম লেখা আছে।প্রমাণিত ইতিহাসশাঁখারীকাঠির হাটে এক শুক্রবার১৯৭১ সালের ৫ নভেম্বর, হাটের দিনে কচুয়ার শাঁখারীকাঠি বাজার ঘিরে রাজাকাররা হিন্দু হাটুরেদের বেঁধে নিয়ে খালপাড়ে গুলি করে হত্যা করে। ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এ হত্যাকাণ্ডে সিরাজ মাস্টারকে দোষী সাব্যস্ত করে।প্রমাণিত ইতিহাসমঘিয়ার জমিদারবাড়ির কালীবাড়ি আর শিববাড়িলোকমুখে মঘিয়ার দুটি মন্দির খান জাহানের আমলের, কিন্তু প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর স্থাপত্যরীতি দেখে এগুলোকে সপ্তদশ শতকের বলছে। ২০২৬ সালে মন্দির দুটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ঘোষিত হয়, আর পাশের জমিদারবাড়ি ভাঙা থামে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে।ইতিহাস ও জনশ্রুতি