খান জাহানের আমলে নির্মাণের কথাটি জনশ্রুতি। সপ্তদশ শতকের সময়কাল প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের স্থাপত্যভিত্তিক অনুমান; নির্মাতা হিসেবে গন্ধর্ব নারায়ণ চৌধুরীর নাম অধিদপ্তরের বিবরণে আছে, শিলালিপিতে নয়। ১৯৪৭ সালের সংস্কারের তথ্য মন্দিরের ফলকে লেখা।
কচুয়া উপজেলার মঘিয়া গ্রামে পুরোনো জমিদারবাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে আছে দুটি আয়তাকার মন্দির, স্থানীয়ভাবে কালীবাড়ি ও শিববাড়ি নামে পরিচিত। চুন-সুরকির গাঁথুনিতে তৈরি মন্দির দুটিকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ২০২৬ সালের ৯ জুলাইয়ের বাংলাদেশ গেজেটে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ঘোষণা করেছে। অধিদপ্তরের হালনাগাদ তালিকায় বাগেরহাট জেলার ২০টি সংরক্ষিত পুরাকীর্তির বেশির ভাগই সদর উপজেলার খান জাহানি স্থাপনা; কচুয়া থেকে আছে কেবল এই মন্দির দুটি। বাংলাপিডিয়াও কচুয়ার প্রাচীন নিদর্শনের তালিকায় ‘মঘিয়া জমিদার বাড়ি সংলগ্ন কালী মন্দির’-এর নাম রেখেছে।
মন্দির দুটির বয়স নিয়ে লোকমুখে একটি গল্প চালু আছে। জনশ্রুতি বলে, হযরত খান জাহান আলী (র.)-এর আগমন আর তাঁর স্থাপনাগুলোর সমসাময়িক কালেই, অর্থাৎ পনেরো শতকে, এগুলো তৈরি হয়েছিল। কিন্তু প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বিবরণ ভিন্ন কথা বলে: আটচালা রীতির শিবমন্দিরের স্থাপত্যশৈলী দেখে মন্দিরগুলোকে সপ্তদশ শতকের নির্মাণ বলে ধারণা করা হয়। অর্থাৎ খান জাহানের যুগের কথাটি জনশ্রুতি, আর সপ্তদশ শতকের অনুমান এসেছে স্থাপত্য বিচার থেকে।
অধিদপ্তরের মতে মন্দির দুটি নির্মাণ করেন তৎকালীন জমিদার গন্ধর্ব নারায়ণ চৌধুরী, যদিও মন্দিরের গায়ে তাঁর নামে কোনো ফলক নেই। যে ফলকটি আছে, তা অনেক পরের: তাতে লেখা, ১৯৪৭ সালে তৎকালীন জমিদার সুকুমারী চৌধুরাণী ও তাঁর মেজো ছেলে বীরেন্দ্র কুমার রায় চৌধুরী মন্দির সংস্কার করেন। জমিদার পরিবারটি কবে মঘিয়ায় বসতি গড়েছিল বা জমিদারির বিস্তার কতদূর ছিল, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য লিখিত তথ্য আমরা পাইনি। কচুয়ার আরেক পুরোনো নিদর্শন হিসেবে বাংলাপিডিয়ায় শিবপুরের শিববাড়ির কথা আছে; সেটি মঘিয়ার মন্দির থেকে আলাদা স্থাপনা।
মন্দির দুটি সংরক্ষণের তালিকায় উঠলেও পাশের জমিদারবাড়ির ভাগ্য ছিল অনিশ্চিত। দৈনিক আমার দেশের ১৫ জানুয়ারি ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, জমিদারবাড়ির পুরোনো ভবনটি ১৯৮৬ সাল থেকে ক্রয়সূত্রে ব্যক্তিমালিকানায় আছে; এর ধ্বংসাবশেষ এক ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করা হয়েছিল এবং প্রায় দেড় মাস ধরে ভাঙার কাজ চলছিল। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে উপজেলা প্রশাসন ঘটনাস্থলে যায়, আর ইউএনওর অনুরোধে ভাঙার কাজ আপাতত বন্ধ হয়। মালিকপক্ষ জানায়, ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় বিক্রি করা হয়েছে এবং তাদের বৈধ কাগজপত্র আছে। ভবনটি সংরক্ষণের জন্য প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে একটি আবেদনও জমা ছিল।
এর প্রায় ছয় মাস পর মন্দির দুটি গেজেটভুক্ত হয়। জমিদারবাড়ির মূল ভবনটি অবশ্য সংরক্ষিত পুরাকীর্তির তালিকায় নেই। মঘিয়ার এই মন্দির তাই একই সঙ্গে দুটি গল্প বলে: কয়েক শতাব্দী আগের এক জমিদারি জনপদের, আর ঐতিহ্য রক্ষার আজকের টানাপোড়েনের।