শাঁখারীকাঠির হাটে এক শুক্রবার

প্রমাণিত ইতিহাসমুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১৫ নভেম্বর ১৯৭১শাঁখারীকাঠি বাজার, বাধাল ইউনিয়ন, কচুয়া

১৯৭১ সালের ৫ নভেম্বর, হাটের দিনে কচুয়ার শাঁখারীকাঠি বাজার ঘিরে রাজাকাররা হিন্দু হাটুরেদের বেঁধে নিয়ে খালপাড়ে গুলি করে হত্যা করে। ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এ হত্যাকাণ্ডে সিরাজ মাস্টারকে দোষী সাব্যস্ত করে।

এটি প্রমাণিত ইতিহাস। তারিখ, নিহতের সংখ্যা ও দায় আদালতের রায় থেকে নেওয়া; অন্য সূত্রের ভিন্ন সংখ্যা ও তারিখ গল্পে আলাদা করে উল্লেখ করা হয়েছে।

কচুয়া উপজেলার বাধাল ইউনিয়নের দক্ষিণ প্রান্তে শাঁখারীকাঠি বাজার। একাত্তরে এখানে সপ্তাহে দুদিন, সোমবার আর শুক্রবার, হাট বসত। আশপাশের শাঁখারীকাঠি, আলোকদিয়া, রঘুদত্তকাঠি, মসনি, রামচন্দ্রপুরের মতো হিন্দুপ্রধান গ্রাম থেকে মানুষ আসতেন সবজি বেচতে, সংসারের সওদা করতে। কাছেই দৈবজ্ঞহাটিতে ছিল রাজাকারদের একটি শক্ত ক্যাম্প। নভেম্বরের শুরুতে মুক্তিযোদ্ধারা সেই ক্যাম্পে আক্রমণ চালান। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষের বিবরণ অনুযায়ী, রাতভর লড়াইয়ের পর স্থানীয় রাজাকাররা বাগেরহাট ও কচুয়ার ক্যাম্প থেকে বাড়তি লোক ডেকে আনে।

৫ নভেম্বর ১৯৭১ ছিল শুক্রবার, হাটবার। বিকেলের দিকে পঞ্চাশ-ষাটজন সশস্ত্র রাজাকার (কোনো বিবরণে শতাধিক) তিন দিক থেকে বাজার ঘিরে ফেলে। মুক্তিযোদ্ধা খোঁজার কথা বলে তারা হাটে আসা হিন্দু পুরুষদের আলাদা করে, গামছা আর দড়ি দিয়ে দুজন-দুজন করে বাঁধে। এরপর বন্দিদের বাজারের পশ্চিমে একটি খালের পাড়ে সারি করে দাঁড় করিয়ে গুলি চালানো হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় অনুযায়ী সেদিন ৪২ জন নিরস্ত্র মানুষ নিহত হন; অনেকে গুলিবিদ্ধ হয়েও বেঁচে যান। পরদিন গ্রামবাসীদের দিয়ে নৌকায় করে লাশ সরিয়ে বিষখালী নদীর পাড়ে রামচন্দ্রপুর গ্রামে একটি বড় গর্তে মাটিচাপা দেওয়া হয়।

নিহতের সংখ্যা ও তারিখ নিয়ে সূত্রগুলোর মধ্যে ফারাক আছে। মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ বলছে, সেদিন ৮২ জনকে আটক করা হয়েছিল এবং অর্ধশতাধিক মানুষ নিহত হন; সেখানে প্রায় পঞ্চাশজন শহীদের নামও আছে। ইংরেজি উইকিপিডিয়া ঘটনার তারিখ লিখেছে ৪ নভেম্বর, আর বাংলাপিডিয়ার কচুয়া উপজেলা নিবন্ধে এটিকে ৩ মে পাকবাহিনীর হত্যাকাণ্ড বলা হয়েছে। সাক্ষ্য-প্রমাণ যাচাই করে ট্রাইব্যুনাল যে তথ্য প্রমাণিত বলে রায় দিয়েছে, তা হলো: তারিখ ৫ নভেম্বর, নিহত ৪২ জন, আর হামলাকারী রাজাকার বাহিনী।

২০১৫ সালের ১১ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ (আইসিটি-বিডি মামলা নং ০৩/২০১৪) রায় ঘোষণা করে। আদালত বলেছে, তৎকালীন বাগেরহাট মহকুমার রাজাকার বাহিনীর নেতা শেখ সিরাজুল হক ওরফে সিরাজ মাস্টারের নেতৃত্বে একদল রাজাকার শাঁখারীকাঠি বাজারে হামলা চালিয়ে ৪২ জনকে অপহরণ করে খালপাড়ে গুলি করে হত্যা করে। এই অভিযোগে (৫ নম্বর অভিযোগ) তাঁকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়; মোট পাঁচটি প্রমাণিত অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। এক প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী আদালতে বলেছিলেন, সিরাজ মাস্টার তিনবার বাঁশি বাজানোর পর গুলি শুরু হয়। এই লেখা তৈরির সময় (অক্টোবর ২০২৬) তাঁর আপিলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির খবর আমরা কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রে নিশ্চিত হতে পারিনি।

শহীদদের গণকবরে ১৯৯৬ সালে সরকার ৩১ জনের নামসংবলিত একটি স্মৃতিফলক বসায়। ২০২১ সালে দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ফলকের নামগুলো প্রায় মুছে গেছে, সীমানাপ্রাচীর নেই, জায়গাটি মোটরসাইকেল রাখা আর ময়লা ফেলার কাজে ব্যবহার হচ্ছে। শহীদ পরিবার ও মুক্তিযোদ্ধারা তখন দ্রুত সংরক্ষণের দাবি জানান, আর উপজেলা প্রশাসন জানায়, স্মৃতিসৌধ নির্মাণ ও জায়গাটি সংরক্ষণের প্রক্রিয়া চলছে। বাজারের কাছে নির্মিত শাঁখারীকাঠি স্মৃতিস্তম্ভে খোদাই করা আছে রবীন্দ্রনাথের পঙ্‌ক্তি: “উদয়ের পথে শুনি কার বাণী, ভয় নাই ওরে ভয় নাই”।

তথ্যসূত্র

  1. The Chief Prosecutor vs. Sheikh Sirajul Haque alias Siraj Master & others — Judgment, ICT-BD Case No. 03 of 2014 (International Crimes Tribunal-1) · আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ (রায়ের অনুলিপি, SATP আর্কাইভ), ২০১৫
  2. War trial: Death for Siraj, Akram jailed until death · The Daily Star, ২০১৫
  3. Siraj, cohorts killed 42 Hindus in gunfire burst · The Daily Star, ২০১৪
  4. Forgotten graveyard for unforgettable war heroes · The Daily Star, ২০২১
  5. শাঁখারীকাঠি গণহত্যা (কচুয়া, বাগেরহাট) · সংগ্রামের নোটবুক (মূল সূত্র: বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ, ৯ম খণ্ড)
  6. মুক্তিযুদ্ধে কচুয়া উপজেলা (বাগেরহাট) · সংগ্রামের নোটবুক (মূল সূত্র: বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ, ২য় খণ্ড)
  7. Shankharikathi massacre · Wikipedia (English), ২০২৬
  8. Kachua Upazila (Bagerhat District) · Banglapedia (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ), ২০২৩

কোনো তথ্য ভুল মনে হলে বা আরও ভালো সূত্র জানা থাকলে নিচে জানান; যাচাই করে ঠিক করা হবে।

কচুয়া-এর আরও গল্প

সব দেখুন
কচু রায়ের নামে কচুয়া?উপজেলার সরকারি তথ্য বাতায়ন বলছে, জমিদার কচু রায়ের নাম থেকে এসেছে কচুয়া। সেই জমিদারের কোনো দলিল মেলেনি; তবে জনপদের ইতিহাসের কিছু চিহ্ন বেশ পুরোনো।ইতিহাস ও জনশ্রুতিভাসা বাজার থেকে মঘিয়ার খালপাড়হাটবারে ভাসা বাজার থেকে ধরে নেওয়া মানুষদের সন্ধ্যায় মঘিয়ায় খালের পাড়ে হত্যা করে রাজাকাররা। নিহতের সংখ্যা নিয়ে সূত্রগুলোতে বড় ফারাক থাকলেও ১৫ জন শহীদের নাম লেখা আছে।প্রমাণিত ইতিহাসযে থানায় ঢুকতে পারেনি পাকিস্তানি সেনারাসেতুর পাটাতন খুলে আর স্থানীয় বাহিনী গড়ে কচুয়ার মানুষ পাকিস্তানি সেনাদের থানায় ঢুকতে দেননি। তবু রাজাকারদের হাতে এ জনপদ রক্ত দিয়েছে; ১৩ ডিসেম্বর কচুয়া মুক্ত হয়।প্রমাণিত ইতিহাসমঘিয়ার জমিদারবাড়ির কালীবাড়ি আর শিববাড়িলোকমুখে মঘিয়ার দুটি মন্দির খান জাহানের আমলের, কিন্তু প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর স্থাপত্যরীতি দেখে এগুলোকে সপ্তদশ শতকের বলছে। ২০২৬ সালে মন্দির দুটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ঘোষিত হয়, আর পাশের জমিদারবাড়ি ভাঙা থামে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে।ইতিহাস ও জনশ্রুতি