এটি প্রমাণিত ইতিহাস। তারিখ, নিহতের সংখ্যা ও দায় আদালতের রায় থেকে নেওয়া; অন্য সূত্রের ভিন্ন সংখ্যা ও তারিখ গল্পে আলাদা করে উল্লেখ করা হয়েছে।
কচুয়া উপজেলার বাধাল ইউনিয়নের দক্ষিণ প্রান্তে শাঁখারীকাঠি বাজার। একাত্তরে এখানে সপ্তাহে দুদিন, সোমবার আর শুক্রবার, হাট বসত। আশপাশের শাঁখারীকাঠি, আলোকদিয়া, রঘুদত্তকাঠি, মসনি, রামচন্দ্রপুরের মতো হিন্দুপ্রধান গ্রাম থেকে মানুষ আসতেন সবজি বেচতে, সংসারের সওদা করতে। কাছেই দৈবজ্ঞহাটিতে ছিল রাজাকারদের একটি শক্ত ক্যাম্প। নভেম্বরের শুরুতে মুক্তিযোদ্ধারা সেই ক্যাম্পে আক্রমণ চালান। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষের বিবরণ অনুযায়ী, রাতভর লড়াইয়ের পর স্থানীয় রাজাকাররা বাগেরহাট ও কচুয়ার ক্যাম্প থেকে বাড়তি লোক ডেকে আনে।
৫ নভেম্বর ১৯৭১ ছিল শুক্রবার, হাটবার। বিকেলের দিকে পঞ্চাশ-ষাটজন সশস্ত্র রাজাকার (কোনো বিবরণে শতাধিক) তিন দিক থেকে বাজার ঘিরে ফেলে। মুক্তিযোদ্ধা খোঁজার কথা বলে তারা হাটে আসা হিন্দু পুরুষদের আলাদা করে, গামছা আর দড়ি দিয়ে দুজন-দুজন করে বাঁধে। এরপর বন্দিদের বাজারের পশ্চিমে একটি খালের পাড়ে সারি করে দাঁড় করিয়ে গুলি চালানো হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় অনুযায়ী সেদিন ৪২ জন নিরস্ত্র মানুষ নিহত হন; অনেকে গুলিবিদ্ধ হয়েও বেঁচে যান। পরদিন গ্রামবাসীদের দিয়ে নৌকায় করে লাশ সরিয়ে বিষখালী নদীর পাড়ে রামচন্দ্রপুর গ্রামে একটি বড় গর্তে মাটিচাপা দেওয়া হয়।
নিহতের সংখ্যা ও তারিখ নিয়ে সূত্রগুলোর মধ্যে ফারাক আছে। মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ বলছে, সেদিন ৮২ জনকে আটক করা হয়েছিল এবং অর্ধশতাধিক মানুষ নিহত হন; সেখানে প্রায় পঞ্চাশজন শহীদের নামও আছে। ইংরেজি উইকিপিডিয়া ঘটনার তারিখ লিখেছে ৪ নভেম্বর, আর বাংলাপিডিয়ার কচুয়া উপজেলা নিবন্ধে এটিকে ৩ মে পাকবাহিনীর হত্যাকাণ্ড বলা হয়েছে। সাক্ষ্য-প্রমাণ যাচাই করে ট্রাইব্যুনাল যে তথ্য প্রমাণিত বলে রায় দিয়েছে, তা হলো: তারিখ ৫ নভেম্বর, নিহত ৪২ জন, আর হামলাকারী রাজাকার বাহিনী।
২০১৫ সালের ১১ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ (আইসিটি-বিডি মামলা নং ০৩/২০১৪) রায় ঘোষণা করে। আদালত বলেছে, তৎকালীন বাগেরহাট মহকুমার রাজাকার বাহিনীর নেতা শেখ সিরাজুল হক ওরফে সিরাজ মাস্টারের নেতৃত্বে একদল রাজাকার শাঁখারীকাঠি বাজারে হামলা চালিয়ে ৪২ জনকে অপহরণ করে খালপাড়ে গুলি করে হত্যা করে। এই অভিযোগে (৫ নম্বর অভিযোগ) তাঁকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়; মোট পাঁচটি প্রমাণিত অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। এক প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী আদালতে বলেছিলেন, সিরাজ মাস্টার তিনবার বাঁশি বাজানোর পর গুলি শুরু হয়। এই লেখা তৈরির সময় (অক্টোবর ২০২৬) তাঁর আপিলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির খবর আমরা কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রে নিশ্চিত হতে পারিনি।
শহীদদের গণকবরে ১৯৯৬ সালে সরকার ৩১ জনের নামসংবলিত একটি স্মৃতিফলক বসায়। ২০২১ সালে দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ফলকের নামগুলো প্রায় মুছে গেছে, সীমানাপ্রাচীর নেই, জায়গাটি মোটরসাইকেল রাখা আর ময়লা ফেলার কাজে ব্যবহার হচ্ছে। শহীদ পরিবার ও মুক্তিযোদ্ধারা তখন দ্রুত সংরক্ষণের দাবি জানান, আর উপজেলা প্রশাসন জানায়, স্মৃতিসৌধ নির্মাণ ও জায়গাটি সংরক্ষণের প্রক্রিয়া চলছে। বাজারের কাছে নির্মিত শাঁখারীকাঠি স্মৃতিস্তম্ভে খোদাই করা আছে রবীন্দ্রনাথের পঙ্ক্তি: “উদয়ের পথে শুনি কার বাণী, ভয় নাই ওরে ভয় নাই”।