বিবি বেগনী, সোনাবিবি আর বিষপুকুর

ইতিহাস ও জনশ্রুতিসুলতানি আমল ও খান জাহানপনের শতক (জনশ্রুতি লিপিবদ্ধ ১৯০৮–১৯১৪)ঘোড়া দিঘির পশ্চিম পাড়, ষাটগম্বুজ, বাগেরহাট সদর

ঘোড়া দিঘির পাড়ের ছোট্ট মসজিদটি কি খানজাহানের প্রিয় স্ত্রীর নামে? পুরোনো লোককথায় আছে দুই স্ত্রী, এক বিষপুকুর আর এক করুণ মৃত্যু—আর ইতিহাসবিদদের সন্দেহ।

মসজিদটি পনের শতকের এবং বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ—এটি নথিভুক্ত। বিবি বেগনী খানজাহানের স্ত্রী ছিলেন, সোনাবিবির বিষপানে মৃত্যু ও বিষপুকুরের কাহিনি জনশ্রুতি; ১৯০৮ ও ১৯১৪ সালের সূত্রে এর ভিন্ন রূপ আছে, আর মিত্র নিজেই এতে সন্দেহ করেছেন।

ঘোড়া দিঘির পশ্চিম পাড়ে, ষাট গম্বুজ থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার পশ্চিমে এক গম্বুজের ছোট্ট একটি মসজিদ—বিবি বেগনী মসজিদ। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর স্পষ্ট বলেছে, এর নামকরণ সম্পর্কে কোনো সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি; তবে স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী বিবি বেগনী ছিলেন খানজাহানের প্রিয়তমা স্ত্রী, তাঁর নামেই মসজিদ। গঠনে এটি সিংগাইর মসজিদের মতো, তবে পশ্চিম দেয়ালে মিহরাব তিনটি। ১৯৮৫ সালে এটিও বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হয়।

পুরোনো সূত্রে গল্পটি আরও নাটকীয়। ১৯০৮ সালের খুলনা গেজেটিয়ার অনুযায়ী প্রচলিত কাহিনি হলো—খানজাহানের মৃত্যুর পর তাঁর এক স্ত্রী সোনাবিবি বিষ খেয়ে ষাট গম্বুজের উত্তরের একটি পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে মারা যান। সেই পুকুরের নাম হয় ‘বিষপুকুর’, যার পানি তখন কেউ নিত না। আরেক স্ত্রী ‘বাঘী বিবি’কে কবর দেওয়া হয় ঘোড়া দিঘির পশ্চিম পাড়ে, আর তাঁর কবরের পাশের ছোট মসজিদটির নাম হয় তাঁর নামে।

সতীশচন্দ্র মিত্র (১৯১৪) একই জনশ্রুতির আরেক রূপ শুনেছিলেন। তাঁর বর্ণনায় খানজাহানের দুই স্ত্রী সোনাবিবি ও রূপাবিবি ষাট গম্বুজের উত্তরে ভৈরব তীরের পরিখাঘেরা বাড়িতে থাকতেন; লোকে সেই ধ্বংসস্তূপকে বলত ‘সোনাবিবির বাড়ি’। দুই সতিনের ঝগড়ার জেরে একজন বিষ খেয়ে পাশের পুকুরে ঝাঁপ দেন—সেটিই ‘বিষপুকুরিয়া’; অন্যজনকে ঘোড়া দিঘির দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে সমাহিত করা হয়, জায়গাটিকে বলা হতো ‘বিবিজানের মসজিদ’।

মিত্র নিজেই এই গল্পে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর যুক্তি, খানজাহানের কোনো সন্তানের কথা কোথাও নেই; আর বিবাহিত স্ত্রী হলে তাঁর কবর থাকত খানজাহানের সমাধির পাশে, শহরের এক কোণে ছোট মসজিদের পাশে নয়। তাই তাঁর অনুমান, সোনাবিবি-রূপাবিবি হয়তো পরিচারিকা ছিলেন। অন্যদিকে জেলা তথ্য বাতায়ন লিখেছে, যতদূর জানা যায় খানজাহানের এক বা একাধিক স্ত্রী ছিল, তবে তিনি নিঃসন্তান ছিলেন। ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে স্থানীয় বিশ্বাস উদ্ধৃত হয়েছে—মসজিদটি খানজাহানের স্ত্রী বা কোনো সঙ্গিনীর জন্য বানানো।

অর্থাৎ বিবি বেগনী কে ছিলেন, আদৌ ছিলেন কি না, ইতিহাস তা জানে না; কোনো শিলালিপিতে তাঁর উল্লেখ নেই। তবু ঘোড়া দিঘির পাড়ের এই নিরিবিলি মসজিদ আর বিষপুকুরের কাহিনি খলিফাতাবাদের মানবিক দিকটা কল্পনা করতে সাহায্য করে—যে শহরে দরবার আর মসজিদের পাশাপাশি সংসার, ভালোবাসা আর ঈর্ষার গল্পও ছিল। মজার ব্যাপার, মিত্রের ‘সোনাবিবির বাড়ি’র অবস্থান—ষাট গম্বুজের উত্তরে পুরোনো ভৈরবের তীর—আজকের ‘খানজাহানের বসতভিটা’ প্রত্নস্থলের অবস্থানের সঙ্গে মেলে, যেখানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর খনন চালিয়েছে।

গল্পের জায়গাগুলো

তথ্যসূত্র

  1. এক নজরে — বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য: ঐতিহাসিক মসজিদের শহর বাগেরহাট · প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, বাগেরহাট, ২০২৪
  2. Bengal District Gazetteers: Khulna — L. S. S. O'Malley · ইন্টারনেট আর্কাইভ (মূল প্রকাশ, কলকাতা), ১৯০৮
  3. যশোহর-খুলনার ইতিহাস, প্রথম খণ্ড — সতীশচন্দ্র মিত্র · চক্রবর্তী চ্যাটার্জি অ্যান্ড কোং, কলকাতা (ইন্টারনেট আর্কাইভে সংরক্ষিত), ১৯১৪
  4. হযরত খানজাহান আলী (রঃ) ও তাঁর মাজার · বাগেরহাট জেলা তথ্য বাতায়ন, ২০১৯
  5. Rediscovering Bagerhat's forgotten grandeur · দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ২০২৫
  6. Historic Mosque City of Bagerhat (Outstanding Universal Value) · UNESCO World Heritage Centre, ১৯৮৫

কোনো তথ্য ভুল মনে হলে বা আরও ভালো সূত্র জানা থাকলে নিচে জানান; যাচাই করে ঠিক করা হবে।

বাগেরহাট সদর-এর আরও গল্প

সব দেখুন
সমাধির পাথরে লেখা শেষ কথাখানজাহানের সমাধিবেদির পাথরই তাঁর সম্পর্কে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য দলিল। সেখানে তিনি নিজেকে বলেছেন বৃদ্ধ, দুর্বল এক প্রবাসী—আর লিখে রেখেছেন মৃত্যুর তারিখ।প্রমাণিত ইতিহাসখলিফাতাবাদ: খানজাহানের পরের টাকশাল-শহর আর মোগল ‘সরকার’খানজাহানের মৃত্যুর পরও খলিফাতাবাদ হারিয়ে যায়নি। সুলতানদের মুদ্রায় এর নাম উঠেছে, মোগল রাজস্বের খাতায় এটি ছিল আস্ত এক ‘সরকার’—আর বাগেরহাটের ‘দশানী’ নামেও হয়তো লুকিয়ে আছে সেই হিসাবের ছাপ।প্রমাণিত ইতিহাসপ্রতাপাদিত্য, ফিরিঙ্গি আর মগ: বারো ভূঁইয়ার যুগে বাগেরহাটষোড়শ-সপ্তদশ শতকে যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজ্য ছুঁয়ে ছিল আজকের বাগেরহাট; একই সময়ে পর্তুগিজ ‘ফিরিঙ্গি’ আর আরাকানি মগ জলদস্যুর হানায় উজাড় হয়েছিল দক্ষিণের বহু জনপদ। কোনটা প্রমাণিত, কোনটা জনশ্রুতি?ইতিহাস ও জনশ্রুতিভৈরবের বাঁকে বাঁকে: নদী, হাট আর নৌপথের বাগেরহাটএকসময় বাগেরহাটে চলাফেরা মানেই ছিল নৌকা। কলকাতাগামী ধানের জাহাজ, মোড়েলগঞ্জের বন্দর, স্টিমারের হুইসেল—মরে আসা ভৈরব আর বদলে যাওয়া নদীপথের গল্প।প্রমাণিত ইতিহাস