বনবিবি, দক্ষিণ রায় আর দুখে: আঠারো ভাটির দেশের রক্ষাকর্ত্রী

লোককথা / জনশ্রুতিলোককথালোককাহিনি; ১৫০০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে প্রচলিত ছিল বলে উল্লেখ আছেসুন্দরবন (বাগেরহাট অংশসহ বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন)

বাঘের রাজ্যে ঢোকার আগে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সুন্দরবনের মানুষ যাঁকে স্মরণ করেন, সেই বনবিবির কাহিনি: দক্ষিণ রায়ের সঙ্গে লড়াই, অনাথ দুখের উদ্ধার আর ‘জহুরানামা’ পুথির গল্প।

কাহিনিটি পুরোপুরি লোককথা ও পুথিসাহিত্য। দলিলভিত্তিক অংশ: পুথির অস্তিত্ব ও নামের ব্যুৎপত্তি (বাংলাপিডিয়া), ১৯০৮ সালের খুলনা গেজেটিয়ারে বনজীবীদের বিশ্বাসের উল্লেখ, এবং বর্তমান পূজা ও পুথিপাঠের সংবাদভিত্তিক বিবরণ।

সুন্দরবনের জেলে, বাওয়ালি আর মধু-সংগ্রাহক মৌয়ালদের কাছে বনবিবি হলেন বনের রক্ষাকর্ত্রী। বাংলাপিডিয়া তাঁকে বলেছে সুন্দরবনের অধিষ্ঠাত্রী ‘পীরানি’, হিন্দুর বনদুর্গা বা বনদেবীর মুসলমানি রূপ। তাঁর উৎস নিয়ে গবেষকেরা একমত নন: কারও মতে পনেরো শতকে ইসলাম প্রসারের সঙ্গে তাঁর কাহিনির জন্ম, কারও মতে তিনি আগে থেকে পূজিত এক দেবী, যিনি পরে পীর-সংস্কৃতির রূপ পেয়েছেন। ঐতিহাসিক সতীশচন্দ্র মিত্রের বরাতে প্রথম আলো জানিয়েছে, ১৫০০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি সময়েই সুন্দরবনে এসব কাহিনি প্রচলিত ছিল।

পুথিতে বলা কাহিনিটি এ রকম (এটি লোককথা, ইতিহাস নয়): মক্কা থেকে আসা ইব্রাহিম, স্থানীয় উচ্চারণে বেরাহিম ফকিরের প্রথম স্ত্রী ফুলবিবি নিঃসন্তান। দ্বিতীয় স্ত্রী গোলালবিবি অন্তঃসত্ত্বা হলে ফুলবিবির শর্তে তাঁকে বনে রেখে আসা হয়, আর সেখানেই জন্ম নেন যমজ বনবিবি ও শাহ জঙ্গলী। বড় হয়ে দুই ভাইবোন আসেন ‘আঠারো ভাটির দেশে’, অর্থাৎ সুন্দরবনে। তখন বনের অধিপতি দক্ষিণ রায়, যে বাঘের রূপে মানুষ শিকার করে। তাঁর মা নারায়ণী বনবিবির সঙ্গে যুদ্ধে নেমে হেরে যান, পরে বন্ধুত্ব পাতেন; দক্ষিণ রায়ের ভাগে থাকে বনের একটি অংশ।

সবচেয়ে প্রিয় পালাটি দুখেকে নিয়ে। ধনী মধু-ব্যবসায়ী ধোনা সাত নৌকা নিয়ে বনে যাওয়ার সময় সঙ্গে নেয় গরিব রাখাল বালক দুখেকে। যাত্রার আগে মা দুখেকে বলে দেন, বিপদে পড়লে বনবিবিকে ডাকতে। কেন্দুখালির চরে দক্ষিণ রায়কে নৈবেদ্য না দেওয়ায় মধু মেলে না; স্বপ্নে দক্ষিণ রায় দাবি করে নরবলি। লোভী ধোনা দুখেকে চরে ফেলে চলে যায়। বাঘরূপী দক্ষিণ রায় এগিয়ে এলে দুখে বনবিবিকে ডাকে; বনবিবি ও শাহ জঙ্গলী এসে তাকে বাঁচান। পরাজিত দক্ষিণ রায় আশ্রয় নেয় গাজী পীরের কাছে, আর গাজীর মধ্যস্থতায় সন্ধি হয়: বাঘ আর নিরীহ মানুষ মারবে না, মানুষও বন থেকে নেবে কেবল প্রয়োজনটুকু। কোনো বর্ণনায় দুখে কুমিরের পিঠে, কোনোটিতে সাত নৌকা মধু নিয়ে মায়ের কাছে ফেরে।

এই কাহিনি ধরে রেখেছে ‘বনবিবির জহুরানামা’। বাংলাপিডিয়া জানায়, আরবি ‘জহুরা’ বা হিন্দি ‘জহুর’ (অলৌকিক কীর্তি) আর ফারসি ‘নামাহ্’ (পুস্তক) মিলে এই নাম। মঙ্গলকাব্যের ঢঙে লেখা পাঁচালিতে আল্লাহ-রসুল, মক্কা, পীর-পীরানির প্রসঙ্গ এসেছে; দ্বিতীয় অংশের নাম ‘ধোনাই-দুখের পালা’। রচয়িতা নিয়ে সূত্রভেদ আছে: বাংলাপিডিয়ায় দোভাষী পুথিকার মহম্মদ খানের নাম; দ্য ডেইলি স্টারের এক গবেষণাধর্মী লেখায় উনিশ শতকের শেষ দিকে মুনশি মোহাম্মদ খাতেরের ছাপা পুথির কথা; আর বাংলা উইকিপিডিয়া সুকুমার সেনের বরাতে বায়ানউদ্দীন ও মোহাম্মদ খাতেরের নাম দিয়েছে।

বাগেরহাট অঞ্চলে কাহিনিটির একটি ভিন্ন রূপও লিপিবদ্ধ আছে (শীলা বসাকের ‘বাংলার কিংবদন্তি’ গ্রন্থের বরাতে বাংলা উইকিপিডিয়া): এক সওদাগরের নির্বাসিত বড় বউ বনে যমজ সন্তান জন্ম দিয়ে মারা যান; বাঘ, কুমির, হরিণেরা শিশু দুটিকে বড় করে; ছেলেটি হয় বাঘের রাজা, মেয়েটি বনবিবি। চর্চাও আজ জীবন্ত। দ্য ডেইলি স্টারের লেখায় ১৯০৮ সালের খুলনা জেলা গেজেটিয়ারের বরাতে বলা হয়েছে, বনের এই বিশ্বাসে হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায়ই অংশ নিত। মধু সংগ্রহে যাওয়ার আগে মৌয়ালরা বনবিবির উদ্দেশে ক্ষীরের শিরনি দেন; পয়লা মাঘের দিকে অস্থায়ী থানে বনবিবি, শাহ জঙ্গলী, দক্ষিণ রায়, দুখে আর গাজীর মূর্তি বসিয়ে পুরো জহুরানামা পড়া হয়। দুবলার চরের রাস উৎসবের মন্দিরেও রাধাকৃষ্ণের পাশে বনবিবি ও গাজী-কালুর মূর্তি বসানো হয়।

গল্পের জায়গাগুলো

তথ্যসূত্র

  1. বনবিবির জহুরনামা · বাংলাপিডিয়া
  2. Bonbibi: Mother of the eighteen tides · The Daily Star, ২০২১
  3. বনবিবি · বাংলা উইকিপিডিয়া
  4. লোককথার বনে গাজী ও বনবিবি · প্রথম আলো, ২০২৬
  5. অরণ্যের দেবী বনবিবির পূজা: পুঁথির ছন্দে বেঁচে থাকার প্রার্থনা · প্রথম আলো, ২০২৬
  6. দুবলার চরের রাসমেলা ঐতিহ্যের সাম্প্রতিক রূপ · সমকাল, ২০২৫

কোনো তথ্য ভুল মনে হলে বা আরও ভালো সূত্র জানা থাকলে নিচে জানান; যাচাই করে ঠিক করা হবে।

মোংলা-এর আরও গল্প

সব দেখুন
জয়মনির ঘোল থেকে মোংলা: একটি বন্দরের জন্মকথা১৯৫০ সালের ডিসেম্বরে সুন্দরবনের ভেতরে পশুর নদীতে নোঙর ফেলেছিল একটি ব্রিটিশ জাহাজ। সেখান থেকে চালনা ঘুরে বন্দরটি কীভাবে শেলাবুনিয়া নামের এক অচেনা গ্রামে এসে ‘মোংলা’ হলো, এ তারই গল্প।প্রমাণিত ইতিহাসশেলাবুনিয়ার ফাদার রিগন: ইতালি থেকে আসা এক বাঙালিইতালির এক গ্রামে জন্ম, কিন্তু জীবনের প্রায় পুরোটা কেটেছে মোংলার শেলাবুনিয়ায়। রবীন্দ্রনাথকে ইতালীয় ভাষায় নিয়ে যাওয়া, একাত্তরে আহত মুক্তিযোদ্ধার চিকিৎসা আর মৃত্যুর পর বাংলার মাটিতে ফেরার গল্প।প্রমাণিত ইতিহাসরুদ্রের মিঠেখালী: ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’-এর কবির শেকড়আশির দশকের কবিতার মঞ্চ কাঁপানো রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর শৈশব কেটেছে মোংলার মিঠেখালীতে। সেখানে তিনি গানের দল গড়েছেন, সেখানেই তিনি চিরঘুমে।প্রমাণিত ইতিহাসঅপারেশন জ্যাকপট: মোংলা বন্দরে নৌ-কমান্ডোদের রাতহাতে শুধু ছুরি, সঙ্গে লিমপেট মাইন। ১৯৭১ সালের ১৫ আগস্ট মধ্যরাতে চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, নারায়ণগঞ্জের সঙ্গে একযোগে মোংলা বন্দরেও আঘাত হানে বাঙালি নৌ-কমান্ডোরা।প্রমাণিত ইতিহাস