মহকুমা থেকে জেলা: বাগেরহাটের প্রশাসনিক জন্মকথা (১৮৬৩–১৯৮৪)

প্রমাণিত ইতিহাসব্রিটিশ আমল১৮৬৩–১৯৮৪বাগেরহাট সদর ও জেলার ৯ উপজেলা

১৮৬৩ সালে ভৈরবের তীরে এক টুকরো নিচু জঙ্গলে বসেছিল বাগেরহাট মহকুমার দপ্তর। ১২১ বছর পর, ১৯৮৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি সেই মহকুমাই হয় জেলা। মাঝের পথটা ছিল কেমন?

তারিখগুলো জেলা প্রশাসন, বাংলাপিডিয়া ও ওয়েস্টল্যান্ডের প্রতিবেদনভিত্তিক; থানা গঠনের কয়েকটি সাল সূত্রভেদে আলাদা, গল্পে দুটোই দেওয়া হয়েছে। মহকুমা স্থাপনে বঙ্কিমচন্দ্রের সুপারিশের তথ্য কেবল জেলা তথ্য বাতায়নে পাওয়া গেছে।

ব্রিটিশ আমলের শুরুতে আজকের বাগেরহাট ছিল বিশাল যশোর জেলার অংশ। জে. ওয়েস্টল্যান্ডের ১৮৭১ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী যশোর জেলা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৭৮৬ সালে (জেলা প্রশাসনের এক পাতায় সালটি ১৭৮১ লেখা)। জেলা তথ্য বাতায়ন জানায়, ১৮৪২ সালে খুলনা যখন যশোরের একটি মহকুমা, তখন বাগেরহাট ছিল খুলনার অধীন একটি থানা। ওয়েস্টল্যান্ড আরও লিখেছেন, ১৮৬৩ সালের আগে কচুয়া নিজেই ছিল থানা, সেখানে মুনসেফ আদালত আর লবণের চৌকিও ছিল।

মোড় ঘোরে ১৮৬১ সালে। জেলা তথ্য বাতায়নের বিবরণে, সে বছরের ২৬ নভেম্বর মোড়েলগঞ্জে মোরেল ও রহিমুল্লাহর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর খুলনার তৎকালীন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ঘটনার তদন্ত করেন এবং প্রশাসনিক প্রয়োজনে বাগেরহাটে একটি মহকুমা স্থাপনের সুপারিশ করেন। ফলে ১৮৬৩ সালে যশোর জেলার অধীনে বাগেরহাট মহকুমা গঠিত হয়; প্রথম মহকুমা প্রশাসক ছিলেন মি. সান্ডার্স। ওয়েস্টল্যান্ড লিখেছেন, জায়গাটি তখন নদীর পাড়ে ‘নিচু জঙ্গল’ মাত্র; জঙ্গল সাফ করে দপ্তর, রাস্তা ও মাঠ তৈরি হয়। তখন মহকুমায় যাতায়াত চলত কেবল নদীপথে।

১৮৮২ সালে নতুন খুলনা জেলা গঠিত হলে বাগেরহাট তার অংশ হয়। দ্য ডেইলি স্টার বাংলার এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৫ এপ্রিল ১৮৮২ প্রজ্ঞাপন জারি হয় এবং ১ জুন থেকে কাজ শুরু হয়; যশোর থেকে খুলনা ও বাগেরহাট মহকুমা আর সাতক্ষীরা মহকুমা মিলে জেলা হয়। এই সময়ে একে একে থানাও গড়ে ওঠে। জেলা প্রশাসনের হিসাবে বাগেরহাট ও রামপাল থানা ১৮৬৩, মোড়েলগঞ্জ ১৮৬৬, কচুয়া ও ফকিরহাট ১৮৬৯, শরণখোলা ১৯০৮, মোংলা ১৯৭৫ আর চিতলমারী ১৯৮১ সালে স্থাপিত। বাংলাপিডিয়ায় কয়েকটির সাল আলাদা—যেমন রামপাল ১৮৯২, কচুয়া ১৮৮৬, মোড়েলগঞ্জ ১৯০৯, মোংলা ১৯৭৬; আর মোল্লাহাট থানা ১৮৬৭ সালে গঠিত, যা ওয়েস্টল্যান্ডের বিবরণে প্রায় ওই সময়েই মধুমতীর তীরে উদয়পুরে সরিয়ে নেওয়া হয়।

পাকিস্তান আমলে প্রশাসন নামে থানা পর্যায়ে। জেলা প্রশাসনের ইতিহাস-পাতা বলছে, ১৯৬৩ সালে সার্কেল অফিসার (উন্নয়ন) পদ সৃষ্টি করে থানা পরিষদের মাধ্যমে কাজ শুরু হয়। জেলা প্রশাসনের তালিকা অনুযায়ী ১৯৪৬ সাল থেকে ১৯৮৪ পর্যন্ত ৩১টি মেয়াদে মহকুমা প্রশাসকেরা দায়িত্ব পালন করেন; শেষজন আমিনুর রহমান শাহরিয়ার, ৩১ জানুয়ারি ১৯৮৪ পর্যন্ত। ১৯৮২ সালের অধ্যাদেশে থানাগুলো প্রথমে ‘উন্নীত থানা’ ও পরে উপজেলা হয়; বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী মোল্লাহাট ২ জুলাই, ফকিরহাট ১ আগস্ট, কচুয়া ও মোংলা ১৪ সেপ্টেম্বর ১৯৮৩ সালে উপজেলা হয়; মোড়েলগঞ্জের ক্ষেত্রে বাংলাপিডিয়া ১৯৮৫ সাল লিখেছে।

সবশেষে ১৯৮৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি সরকারি আদেশে বাগেরহাট মহকুমা জেলায় উন্নীত হয়। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী তৎকালীন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জেলা উদ্বোধন করেন, আর প্রথম জেলা প্রশাসক ছিলেন মো. রেজওয়ানুল হক (১৯৮৪–৮৬)। আজ বাগেরহাট ৯টি উপজেলা, ৭৫টি ইউনিয়ন ও ৩টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত একটি ‘এ’ শ্রেণির জেলা।

তথ্যসূত্র

  1. বাগেরহাট জেলার পটভূমি · বাগেরহাট জেলা তথ্য বাতায়ন (জেলা প্রশাসন), ২০১৪
  2. জেলা প্রশাসনের পটভূমি · বাগেরহাট জেলা তথ্য বাতায়ন (জেলা প্রশাসন), ২০১২
  3. পূর্বাতন এস.ডি.ও বৃন্দ (বাগেরহাট মহকুমা প্রশাসকগণের তালিকা) · বাগেরহাট জেলা তথ্য বাতায়ন (জেলা প্রশাসন), ২০১৯
  4. পূর্বতন জেলা প্রশাসকবৃন্দ · বাগেরহাট জেলা তথ্য বাতায়ন (জেলা প্রশাসন), ২০২৫
  5. A Report on the District of Jessore: Its Antiquities, Its History, and Its Commerce (J. Westland) · Bengal Secretariat Office, Calcutta (Internet Archive-এ স্ক্যান), ১৮৭১
  6. খুলনা: অনেক হারানো এক ‘মায়ানগরের’ ১৪৩ বছর (দীপংকর রায়) · দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, ২০২৫
  7. Morrelganj Upazila · বাংলাপিডিয়া (ইংরেজি), ২০২১
  8. Fakirhat Upazila · বাংলাপিডিয়া (ইংরেজি), ২০২১
  9. Kachua Upazila (Bagerhat District) · বাংলাপিডিয়া (ইংরেজি), ২০২১
  10. Rampal Upazila · বাংলাপিডিয়া (ইংরেজি), ২০২১
  11. Mongla Upazila · বাংলাপিডিয়া (ইংরেজি), ২০২১
  12. মোল্লাহাট উপজেলা · বাংলাপিডিয়া, ২০২১

কোনো তথ্য ভুল মনে হলে বা আরও ভালো সূত্র জানা থাকলে নিচে জানান; যাচাই করে ঠিক করা হবে।

বাগেরহাট সদর-এর আরও গল্প

সব দেখুন
সমাধির পাথরে লেখা শেষ কথাখানজাহানের সমাধিবেদির পাথরই তাঁর সম্পর্কে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য দলিল। সেখানে তিনি নিজেকে বলেছেন বৃদ্ধ, দুর্বল এক প্রবাসী—আর লিখে রেখেছেন মৃত্যুর তারিখ।প্রমাণিত ইতিহাসখলিফাতাবাদ: খানজাহানের পরের টাকশাল-শহর আর মোগল ‘সরকার’খানজাহানের মৃত্যুর পরও খলিফাতাবাদ হারিয়ে যায়নি। সুলতানদের মুদ্রায় এর নাম উঠেছে, মোগল রাজস্বের খাতায় এটি ছিল আস্ত এক ‘সরকার’—আর বাগেরহাটের ‘দশানী’ নামেও হয়তো লুকিয়ে আছে সেই হিসাবের ছাপ।প্রমাণিত ইতিহাসপ্রতাপাদিত্য, ফিরিঙ্গি আর মগ: বারো ভূঁইয়ার যুগে বাগেরহাটষোড়শ-সপ্তদশ শতকে যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজ্য ছুঁয়ে ছিল আজকের বাগেরহাট; একই সময়ে পর্তুগিজ ‘ফিরিঙ্গি’ আর আরাকানি মগ জলদস্যুর হানায় উজাড় হয়েছিল দক্ষিণের বহু জনপদ। কোনটা প্রমাণিত, কোনটা জনশ্রুতি?ইতিহাস ও জনশ্রুতিভৈরবের বাঁকে বাঁকে: নদী, হাট আর নৌপথের বাগেরহাটএকসময় বাগেরহাটে চলাফেরা মানেই ছিল নৌকা। কলকাতাগামী ধানের জাহাজ, মোড়েলগঞ্জের বন্দর, স্টিমারের হুইসেল—মরে আসা ভৈরব আর বদলে যাওয়া নদীপথের গল্প।প্রমাণিত ইতিহাস