বাঘের পিঠে গাজী: গাজী, কালু ও চম্পাবতীর কিংবদন্তি

লোককথা / জনশ্রুতিলোককথালোককাহিনি; সাহিত্যিক রূপ ১৬৮৬ (রায়মঙ্গল) ও ১৭৯৮-৯৯ (গাজী কালু-চম্পাবতী)সুন্দরবন ও দক্ষিণবঙ্গ

রাজপুত্র থেকে ফকির, বাঘের বাহিনী নিয়ে যুদ্ধ, রাজকন্যা চম্পাবতী: সুন্দরবনের বাওয়ালি-জেলেরা যে গাজীর দোহাই দেন, তাঁর কাহিনি কোথা থেকে এল আর তার কতটা ইতিহাস।

গাজী-কালু-চম্পাবতীর কাহিনি লোককথা; গাজীর ঐতিহাসিকতা ও সময়কাল অনিশ্চিত। দলিলভিত্তিক অংশ: রায়মঙ্গল ও গাজী কালু-চম্পাবতী কাব্যের রচয়িতা ও রচনাকাল, গাজীর গান ও গাজীর পটের লোকশিল্প (বাংলাপিডিয়া)।

সুন্দরবনের গ্রামে বাঘের ভয় থেকে বাঁচতে বনবিবি ও দক্ষিণ রায়ের পাশাপাশি স্মরণ করা হয় গাজী পীরকে; ইংরেজি উইকিপিডিয়া নৃবিজ্ঞানী আন্নু জালাইসের গবেষণার বরাতে এ কথা বলেছে। বাংলাপিডিয়া জানায়, বাওয়ালিরা সারা দিনের কাজ শেষে সন্ধ্যায় ‘গাজী কালু চম্পাবতী’ পুথি থেকে বাঘ-সাপের কাহিনি শোনেন। দুবলার চরের রাস উৎসবের মন্দিরেও গাজী-কালুর মূর্তি বসে। পটুয়াদের আঁকা ‘গাজীর পট’-এর মাঝখানের ছবিতে গাজী বসে থাকেন বাঘের পিঠে, দুই পাশে মানিক পীর ও কালু; আরেক প্যানেলে কুমিরের পিঠে দেবী গঙ্গা।

লোককথায় গাজী (বড় খাঁ গাজী) ছিলেন বৈরাট নগরের শাসক সিকান্দার শাহের বড় ছেলে, আর কালু তাঁর পালিত ভাই। প্রথম আলোর এক উপাখ্যানধর্মী লেখায় পুনর্কথিত কাহিনি অনুযায়ী, সংসারবিমুখ গাজী রাজপ্রাসাদ ছেড়ে ফকির হন, সঙ্গী হন কালু। নানা অলৌকিক কাজের পর ব্রাহ্মণনগরের রাজা মুকুট রায়ের মেয়ে চম্পাবতীকে দেখে তিনি বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। রাজা অপমানিত বোধ করে কালুকে বন্দী করেন; শুরু হয় যুদ্ধ। গাজীর বাঘের বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে রাজার সেনাদের ওপর, আর মুকুট রায়ের সেনাপতি দক্ষিণ রায় নামেন কুমিরের বাহিনী নিয়ে। শেষে রাজা হারেন, চম্পাবতী গাজীকে বিয়ে করেন। ঝিনাইদহের বারোবাজারে গাজী, কালু ও চম্পাবতীর বলে পরিচিত তিনটি পাশাপাশি কবর আছে।

কাহিনিটির সাহিত্যিক শেকড় পুরোনো। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, জনমতে দক্ষিণ রায় ছিলেন যশোরের রাজা মুকুট রায়ের সেনাপতি, যিনি দক্ষিণের আঠারো ভাটি জয় করেন; পরে গাজী খাঁ ও গাজী কালুর সঙ্গে যুদ্ধে হেরে ভাটির একাংশ ছেড়ে দিয়ে সন্ধি করেন। এই ঘটনা নিয়েই হিন্দু কবি লিখেছেন ‘রায়মঙ্গল’, মুসলমান কবি ‘গাজী-কালু-চম্পাবতী’। নিমিতা গ্রামের কৃষ্ণরাম দাসের রায়মঙ্গলে (১৬৮৬; কোনো সূত্রে ১৬৮৪) গাজী ও দক্ষিণ রায়ের শত্রুতা ও পরে বন্ধুত্বের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়। শেখ খোদা বখশ ১৭৯৮-৯৯ সালে ‘গাজী কালু-চম্পাবতী’ রচনা করেন; উনিশ শতকে এটি ব্যাপক জনপ্রিয় হয় এবং সৈয়দ হালু মীর, আবদুর রহিম, আবদুল গফুরের মতো পরের কবিদের প্রভাবিত করে।

গাজীর গল্প শুধু পুথিতে নয়, আসরেও বেঁচে ছিল। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায় ‘গাজীর গান’-এর মূল গায়েন আলখাল্লা-পাগড়ি পরে ‘আশা দণ্ড’ দুলিয়ে আসর ঘুরে গাইতেন; বন্দনায় থাকত হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের সালাম। গানে আসত সমুদ্রের ঝড় থেকে সওদাগরের নৌকা রক্ষা, এমনকি জমিদারের অত্যাচার থেকে প্রজাদের বাঁচানোর গল্প। ইংরেজি উইকিপিডিয়া জানায়, আনুমানিক ১৮০০ সালের ৫৪টি ছবির একটি ‘গাজী স্ক্রল’ ব্রিটিশ মিউজিয়ামে আছে। তবে বাংলাপিডিয়ার মতে গাজীর গানের প্রচলন এখন নেই বললেই চলে।

গাজী কোন শতকের মানুষ, এমনকি আদৌ ঐতিহাসিক ব্যক্তি কি না, তার নিশ্চিত প্রমাণ নেই। ইংরেজি উইকিপিডিয়া তাঁকে বারো-তেরো শতকের সম্ভাব্য যোদ্ধা-পীর বলেছে, আর প্রথম আলোর লেখাটি কাহিনিকে সুলতানি আমলের পটভূমিতে রেখেছে। তাই গাজী-কালু-চম্পাবতীকে পড়তে হবে কিংবদন্তি হিসেবে; এমন এক কিংবদন্তি, যেখানে বাঘের রাজ্যে হিন্দু দেবী গঙ্গা আর মুসলমান পীর একসঙ্গে মানুষের সহায়।

গল্পের জায়গাগুলো

তথ্যসূত্র

  1. Gazi Kalu-Champavati · Banglapedia
  2. রায়মঙ্গল · বাংলাপিডিয়া
  3. গাজীর গান · বাংলাপিডিয়া
  4. Gazir Pat · Banglapedia
  5. বাওয়ালি · বাংলাপিডিয়া
  6. Gazi Pir · Wikipedia
  7. লোককথার বনে গাজী ও বনবিবি · প্রথম আলো, ২০২৬
  8. দুবলার চরের রাসমেলা ঐতিহ্যের সাম্প্রতিক রূপ · সমকাল, ২০২৫

কোনো তথ্য ভুল মনে হলে বা আরও ভালো সূত্র জানা থাকলে নিচে জানান; যাচাই করে ঠিক করা হবে।

মোংলা-এর আরও গল্প

সব দেখুন
জয়মনির ঘোল থেকে মোংলা: একটি বন্দরের জন্মকথা১৯৫০ সালের ডিসেম্বরে সুন্দরবনের ভেতরে পশুর নদীতে নোঙর ফেলেছিল একটি ব্রিটিশ জাহাজ। সেখান থেকে চালনা ঘুরে বন্দরটি কীভাবে শেলাবুনিয়া নামের এক অচেনা গ্রামে এসে ‘মোংলা’ হলো, এ তারই গল্প।প্রমাণিত ইতিহাসশেলাবুনিয়ার ফাদার রিগন: ইতালি থেকে আসা এক বাঙালিইতালির এক গ্রামে জন্ম, কিন্তু জীবনের প্রায় পুরোটা কেটেছে মোংলার শেলাবুনিয়ায়। রবীন্দ্রনাথকে ইতালীয় ভাষায় নিয়ে যাওয়া, একাত্তরে আহত মুক্তিযোদ্ধার চিকিৎসা আর মৃত্যুর পর বাংলার মাটিতে ফেরার গল্প।প্রমাণিত ইতিহাসরুদ্রের মিঠেখালী: ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’-এর কবির শেকড়আশির দশকের কবিতার মঞ্চ কাঁপানো রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর শৈশব কেটেছে মোংলার মিঠেখালীতে। সেখানে তিনি গানের দল গড়েছেন, সেখানেই তিনি চিরঘুমে।প্রমাণিত ইতিহাসঅপারেশন জ্যাকপট: মোংলা বন্দরে নৌ-কমান্ডোদের রাতহাতে শুধু ছুরি, সঙ্গে লিমপেট মাইন। ১৯৭১ সালের ১৫ আগস্ট মধ্যরাতে চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, নারায়ণগঞ্জের সঙ্গে একযোগে মোংলা বন্দরেও আঘাত হানে বাঙালি নৌ-কমান্ডোরা।প্রমাণিত ইতিহাস