তিনটি নামকরণ-ব্যাখ্যাই জনশ্রুতি; সরকারি পোর্টালগুলোও এগুলোকে মত হিসেবে উপস্থাপন করেছে। খলিফাতাবাদ, খলিফাতাবাদ-বদরপুর, হাভেলি খলিফাতাবাদ ও মানচিত্রের ‘Cuipata-vaz’ বাংলাপিডিয়ায় নথিভুক্ত।
বাগেরহাট নামটি কে দিয়েছিলেন, কবে থেকে চালু, এ প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর নেই। জেলা তথ্য বাতায়নের ‘বাগেরহাট জেলার পটভূমি’ পাতাই শুরু হয়েছে এই স্বীকারোক্তি দিয়ে যে বিষয়টি গবেষণাসাপেক্ষ এবং আজ তা নির্ণয় করা কঠিন। সদর উপজেলা পোর্টালও বলছে, নামকরণের ঐতিহাসিক ভিত্তি নিয়ে তেমন কোনো প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। তবু লোকমুখে ও সরকারি লেখায় তিনটি ব্যাখ্যা টিকে আছে।
প্রথম ব্যাখ্যা বাঘ নিয়ে। সুন্দরবন কাছে বলে একসময় এ অঞ্চলে বাঘের উপদ্রব ছিল; তাই জায়গাটি ‘বাঘেরহাট’ নামে পরিচিত হয় এবং ক্রমে তা ‘বাগেরহাট’ হয়ে যায়, এমনটি অনেকে মনে করেন। গল্পটি সবচেয়ে জনপ্রিয় হলেও এর পক্ষে কোনো পুরোনো দলিল পাওয়া যায় না। দ্বিতীয় ব্যাখ্যা বাগান নিয়ে। ‘বাগ’ মানে বাগান; কারো মতে খানজাহানের প্রতিষ্ঠিত ‘খলিফাত-ই-আবাদ’-এর বাগবাগিচা এত সমৃদ্ধ হয়েছিল যে ‘বাগের আবাদ’ থেকেই নাম দাঁড়ায় বাগেরহাট। সদর উপজেলা পোর্টালে এর সরল রূপ: এলাকাটি বাগ-বাগিচায় পূর্ণ, তাই নাম বাগেরহাট।
তৃতীয় ব্যাখ্যাটিকে জেলা প্রশাসন, জেলা পরিষদ ও জেলা পুলিশের ওয়েবসাইট ‘সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য’ বলেছে। শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ভৈরব নদের উত্তর দিকে হাড়িখালী থেকে আজকের নাগের বাজার পর্যন্ত একটি লম্বা বাঁক আছে। আগে সেই বাঁকের পুরাতন বাজার এলাকায় একটি হাট বসত। নদীর বাঁকের হাট বলে জায়গাটির নাম হয় ‘বাঁকেরহাট’, আর কালক্রমে উচ্চারণ বদলে তা হয়েছে বাগেরহাট। এই ব্যাখ্যার জোর ভূগোলে: শহরটি যে ভৈরবকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে এবং প্রধান বাজার যে আজও নদের পশ্চিম তীরে, তা চোখেই দেখা যায়। তবু এটিও শেষ পর্যন্ত ঐতিহ্যগত ব্যাখ্যা, দলিলভিত্তিক প্রমাণ নয়।
নামের প্রশ্নে যা দলিলে পাওয়া যায়, তা হলো পুরোনো নাম ‘খলিফাতাবাদ’। বাংলাপিডিয়া জানায়, ষোড়শ শতকে শহরটি টাঁকশাল-শহর হিসেবে এই নামেই মুদ্রায় উঠে আসে; ১৫৩৫ সালে সুলতান গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহ তাঁর উপাধি অনুসারে নাম দেন ‘খলিফাতাবাদ-বদরপুর’; আর আবুল ফজলের আইন-ই-আকবরীতে আশপাশের অঞ্চলের নাম ‘হাভেলি খলিফাতাবাদ’, যা আঠারো শতকের শেষ পর্যন্ত চালু ছিল। ষোড়শ শতকের ওলন্দাজ-পর্তুগিজ মানচিত্রে শহরটির নাম এসেছে ‘Cuipata-vaz’ রূপে, বাংলাপিডিয়ার মতে যা খলিফাতাবাদেরই বিকৃত রূপ। এমনকি ১৯১৭ সালে পিসি কলেজ প্রতিষ্ঠার বাস্তব সিদ্ধান্তও এসেছিল ‘হাবেলী খলিফাতাবাদ’-এর একটি সভা থেকে, কলেজের ওয়েবসাইট তা-ই বলছে।
তাহলে বাঘ, বাগান না বাঁক, কোনটি সত্যি? উত্তর আজও খোলা। বাঘের গল্প মুখে মুখে সবচেয়ে বেশি ঘোরে, বাঁকের হাটের ব্যাখ্যা সরকারি লেখায় সবচেয়ে বেশি সমর্থন পায়, আর বাগানের ব্যাখ্যা জুড়ে আছে খানজাহানের কিংবদন্তির সঙ্গে। নতুন দলিল না মেলা পর্যন্ত তিনটিকেই ‘মত’ হিসেবে পড়া উচিত; নিশ্চিত শুধু এটুকু যে বহু শতাব্দী ধরে এ শহরের সরকারি পরিচয় ছিল খলিফাতাবাদ।