খানজাহানের নিজের হাতে কুমির ছাড়া ও নাম ধরে ডাকার কাহিনি জনশ্রুতি। ১৮৭১ সাল থেকে দিঘিতে কুমির থাকা, ২০০৪/০৫ সালে ভারত থেকে কুমির আনা, ২০১৫ সালে পুরোনো বংশের শেষ কুমিরের মৃত্যু এবং ২০২৬ সালের ঘটনা সংবাদ ও প্রতিবেদনে নথিভুক্ত; আমদানির সাল ও সংখ্যায় সূত্রভেদ আছে। জাদুঘরের কুমিরটি কালাপাহাড় বা ধলাপাহাড়ের—এটি ‘কথিত’।
খানজাহানের মাজারে গেলে একসময় সবার প্রথম কৌতূহল ছিল দিঘির কুমির। জনশ্রুতি আছে, খানজাহান নিজে এই দিঘিতে দুটি কুমির ছেড়েছিলেন, নাম কালাপাহাড় ও ধলাপাহাড়; তিনি নাম ধরে ডাকলে দিঘির দূর কোণ থেকেও তারা ছুটে আসত। এর কোনো সমসাময়িক দলিল নেই, তবে কিংবদন্তিটি অন্তত দেড়শ বছরের লিখিত সূত্রে পাওয়া যায়।
১৮৭১ সালে জেমস ওয়েস্টল্যান্ড দিঘিতে আটটি পোষা কুমির দেখেছিলেন, যাদের একটিই বড়। ফকির ডাকলে তারা ঘাটে এসে খাবার নিত, তবে হাত থেকে নয়। তিনি নাম দুটি লিখেছিলেন ‘কালাপার’ ও ‘ধলাপার’—কালো পাশ ও সাদা পাশ। সতীশচন্দ্র মিত্র (১৯১৪) লিখেছেন, হিন্দু-মুসলমান সবাই মানত করে কুমিরকে মুরগি, পায়রা, খই-চিড়া দিত; ঘাটে দাঁড়িয়ে ‘আয় আয়’ বলে ডাকলে কুমির মাথা তুলত। মিত্রের ধারণা, কাছের বিল থেকেও কুমির এসে দিঘিতে পড়ে থাকতে পারে। ১৯০৮ সালের খুলনা গেজেটিয়ার জানায়, চৈত্রের মেলায় নারীরা সন্তান কামনায় কুমিরকে মুরগি দিতেন।
বিশ শতকের শেষ দিক থেকে কুমিরের সংখ্যা কমতে থাকে। প্রথম আলোর ২০২৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৯০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে পুরোনো বংশের ছয়টি কুমির মারা যায়; ২০০০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সবচেয়ে বড় মাদি কুমিরটি খাদেমদের জালে পেঁচিয়ে মারা যায়। সংখ্যা কমে যাওয়ায় ২০০৪ সালের ২৬ জুন ভারতের মাদ্রাজ ক্রোকোডাইল ব্যাংক থেকে ছয়টি মিঠাপানির কুমির এনে ছাড়া হয়। ঢাকা ট্রিবিউন সালটি ২০০৫ লিখেছে, আর ইংরেজি উইকিপিডিয়ায় সংখ্যাটি চারটি। নতুন পুরুষ কুমিরের আক্রমণে পুরোনো কুমির মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। শেষে ২০১৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি কালাপাহাড়-ধলাপাহাড়ের বংশের শেষ কুমিরটি মারা যায়।
পরে টিকে থাকে ভারত থেকে আনা দুটি কুমির—ঢাকা ট্রিবিউনের ভাষায় পুরুষ ‘মাদ্রাজ’ ও মাদি ‘পিলপিল’। ডেইলি স্টার ২০১৮ সালে মাদি কুমিরের ডিম পাড়ার খবর দিয়েছিল; তবে ঢাকা ট্রিবিউনের তথ্যমতে কয়েক বছর ডিম পাড়লেও কোনো বাচ্চা ফোটেনি। ২০২৩ সালের অক্টোবরে পুরুষটি মারা যায়। এরপর দিঘিতে ছিল একটিমাত্র মাদি কুমির। ২০২৬ সালের ১ জুন রাতে সেটি দিঘির নারীদের ঘাট থেকে এক শিশুকে টেনে নেয়; শিশুটি মারা যায়। জননিরাপত্তার কারণে ৩ জুন বন বিভাগ কুমিরটিকে খুলনার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে সরিয়ে নেয়। করমজল কুমির প্রজনন কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত বন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেছেন, দর্শনার্থীদের সামনে জীবন্ত প্রাণী ছুড়ে দেওয়া, খাবারে ঘুমের ওষুধ মেশানো, দিঘিতে জাল আর একাকিত্ব—সব মিলিয়েই কুমিরটির আচরণ বদলে গিয়েছিল। ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত এর স্থায়ী ঠিকানা নিয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি।
কালাপাহাড়-ধলাপাহাড়ের স্মৃতি এখন বাগেরহাট জাদুঘরেও। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সেখানে রাখা কুমিরের ‘মমি’টি কালাপাহাড় বা ধলাপাহাড়ের দেহ বা চামড়া দিয়ে তৈরি বলে কথিত, যদিও মাথাটি কৃত্রিম। কয়েক শতাব্দীর এক কিংবদন্তির শেষ অধ্যায়ে একটি শিশুর মৃত্যু মনে করিয়ে দেয়, ভক্তির পাশাপাশি বন্যপ্রাণীর বিজ্ঞানসম্মত ও নিরাপদ পরিচর্যাও সমান জরুরি।