শিলালিপির আংশিক পাঠ (এক ব্রাহ্মণ, তারকব্রহ্ম) নথিভুক্ত। প্রতাপাদিত্য ও অবিলম্ব সরস্বতীর স্মৃতিস্তম্ভের গল্প এবং চিতাভস্মের ওপর নির্মাণের কথা জনশ্রুতি।
বাগেরহাট শহর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার উত্তরে, পুরোনো ভৈরব নদের পূর্ব তীরে বারুইপাড়া ইউনিয়নের কোদলা গ্রাম। গ্রামটির আরেক নাম অযোধ্যা, তাই এখানকার মঠটি ‘কোদলা মঠ’ ও ‘অযোধ্যার মঠ’ দুই নামেই পরিচিত। পুরাতন বাগেরহাট–রূপসা সড়কের যাত্রাপুর বাজার থেকে এর দূরত্ব সদর উপজেলা পোর্টালে প্রায় চার কিলোমিটার, জেলা পোর্টাল ও উইকিপিডিয়ায় প্রায় ছয় কিলোমিটার। পর্যটন করপোরেশনের পাতায় দূরত্বটি মাপা হয়েছে যাত্রাপুর রেলস্টেশন থেকে, যা মনে করিয়ে দেয় একসময় খুলনা–বাগেরহাট রেলপথের যাত্রাপুর স্টেশনই ছিল মঠের কাছের স্টেশন।
বর্গাকার ভিতের ওপর পিরামিডের মতো ক্রমশ সরু হয়ে ওঠা মঠটির উচ্চতা বাংলাপিডিয়া ও উইকিপিডিয়ার হিসাবে প্রায় ১৮.২৯ মিটার; সদর উপজেলা পোর্টালে ৬৪ ফুট ৬ ইঞ্চি, আর পর্যটন করপোরেশনের পাতায় বর্তমান উচ্চতা ১৯.৫৪ মিটার। দেয়াল তৈরি পালিশ করা উঁচুমানের লাল ইটে; পূর্ব, পশ্চিম ও দক্ষিণে তিনটি প্রবেশপথ, উত্তরে কোনো দরজা নেই। বাংলাপিডিয়া জানায়, একসময় প্রায় পুরো মঠ পোড়ামাটির ফলকে ঢাকা ছিল; উত্তর দেয়ালের মাঝের ফুল-লতাপাতার নকশাটিই এখন সবচেয়ে ভালোভাবে টিকে আছে। গবেষকেরা এর গড়নে শিখর বা ‘রেখা’ রীতির প্রভাব দেখেন, যা উড়িষ্যায় ষোড়শ শতক পর্যন্ত প্রচলিত ছিল। পর্যটন করপোরেশনের পাতায় আছে, প্রত্নতত্ত্ববিদ সৈয়দ মাহমুদুল হাসান এর শিল্পমানের প্রশংসা করেছেন।
রহস্যের চাবি দক্ষিণ দরজার ওপরের একটি ক্ষয়ে যাওয়া বাংলা লিপি। জেলা ও উপজেলা পোর্টালে লিপির যে পাঠ দেওয়া আছে, তাতে পড়া যায় ‘…শর্মনা’ এবং ‘তারকং (ব্রহ্ম) … বিনির্মিত’। এর ভিত্তিতে অনুমান করা হয়, তারক বা তারকব্রহ্মের প্রসাদ লাভের উদ্দেশ্যে একজন ব্রাহ্মণ মঠটি নির্মাণ করেছিলেন। বাংলাপিডিয়ার নিবন্ধে নাসরীন আক্তারও লিখেছেন, সম্ভবত সপ্তদশ শতকের প্রথম ভাগে এক ব্রাহ্মণ তারকব্রহ্মের উদ্দেশে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। নির্মাতার পুরো নাম লিপি থেকে উদ্ধার করা যায়নি।
লিপির পাশাপাশি টিকে আছে একটি জোরালো জনশ্রুতি। লোকমুখে বলা হয়, যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্য, যিনি বারো ভূঁইয়াদের একজন, তাঁর সভাপণ্ডিত ও বন্ধুকবি অবিলম্ব সরস্বতীর স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে মঠটি বানিয়েছিলেন। কথিত আছে, মুখে মুখে মুহূর্তে কবিতা বানাতে পারতেন বলেই তাঁর নাম হয়েছিল ‘অবিলম্ব’। আরেক জনশ্রুতি বলে, কারো চিতাভস্মের ওপর এই মঠ তৈরি। জেলা পোর্টাল এমনও লিখেছে যে এটি কোনো দেবমন্দির নয়, সম্ভবত কোনো মহাত্মার সমাধিস্তম্ভ। প্রতাপাদিত্যের সঙ্গে সম্পর্কের পক্ষে কোনো লিখিত প্রমাণ নেই; একে জনশ্রুতি হিসেবেই পড়তে হবে।
নির্মাণকাল নিয়েও মতভেদ আছে। বাংলাপিডিয়া ও উইকিপিডিয়া সপ্তদশ শতকের কথা বলে, অন্যদিকে জেলা ও উপজেলা পোর্টাল কোনো সাল না দিয়ে শুধু উড়িষ্যার ষোড়শ শতকীয় রীতির প্রভাবের কথা বলেছে। বাংলাপিডিয়া একে ফরিদপুরের মথুরাপুর দেউলের মতো সমসাময়িক নাগর রীতির মন্দিরের সঙ্গে তুলনা করেছে। নির্মাতা আর সময়ের এই অনিশ্চয়তাই কোদলা মঠকে রহস্যময় করে রেখেছে। মসজিদের শহর হিসেবে পরিচিত বাগেরহাটে এই মঠ মনে করিয়ে দেয়, এ অঞ্চলের স্থাপত্য-ইতিহাসে হিন্দু ঐতিহ্যেরও এক উজ্জ্বল অধ্যায় আছে।