খলিফাতাবাদ যে টাঁকশাল-শহর ছিল, তা মুদ্রা-প্রমাণে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু টাঁকশাল মিঠাপুকুরের কাছে ছিল, এটি সরকারি পোর্টালের ‘সম্ভাব্য’ মত, প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ নয়। পুকুরের খননকারী অজানা; কিছু অনলাইন প্রশ্নোত্তর সাইটে নসরত শাহকে খননকারী বলা হলেও নির্ভরযোগ্য সূত্রে তা পাওয়া যায়নি।
বাগেরহাট শহরের শালতলা এলাকায়, শহরের প্রায় মাঝখানে একটি বড় পুকুর আছে, নাম মিঠাপুকুর। নামটাই এর পরিচয়: ‘মিঠা’ মানে লবণহীন, ব্যবহারের উপযোগী জল। বাগেরহাটের বেশির ভাগ জলাশয়ের পানি যেখানে লোনা, সেখানে এমন একটি মিঠা পানির পুকুর শহরের মানুষের কাছে আলাদা গুরুত্ব পায়। ২০২৩ সালে বিডিনিউজ২৪-এর শিশু-কিশোর পাতায় বাগেরহাটের এক কিশোর প্রতিবেদক লিখেছিল, আশপাশের মানুষ এখনো এই পুকুরের পানিতে রান্না করেন, কাপড় ধোন, গোসল করেন; ছোটরা এখানে সাঁতার শেখে, আর পুকুরঘেঁষে আছে ফল-ফুলের চারার একটি নার্সারি। ওপেনস্ট্রিটম্যাপে পুকুরটি ‘Mithapukur’ নামে চিহ্নিত, এর উত্তর-পশ্চিম কোণে আছে ‘মিঠা পুকুরপাড় জামে মসজিদ’।
পুকুরটি কে, কবে খনন করেছিলেন, তার কোনো লিখিত প্রমাণ আমরা খুঁজে পাইনি। তবে বাগেরহাটের সরকারি ইতিহাসে মিঠাপুকুরের নাম এসেছে একটি বিশেষ প্রসঙ্গে। জেলা তথ্য বাতায়ন, জেলা পরিষদ ও জেলা পুলিশের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত জেলার পটভূমিতে একই কথা লেখা: খানজাহানের মৃত্যুর (১৪৫৯) পর হোসেনশাহী বংশের শাসকেরা এ অঞ্চল শাসন করতেন, আর ‘বঙ্গেশ্বর’ নসরত শাহের খলিফাতাবাদ টাঁকশাল বাগেরহাট শহরের সম্ভবত মিঠাপুকুরের কাছে ছিল। একই লেখায় আছে, মিঠাপুকুরপাড়ে সেই আমলের একটি মসজিদ রয়েছে।
টাঁকশালের দাবির পেছনে একটি শক্ত ভিত্তি আছে: খলিফাতাবাদ যে সত্যিই টাঁকশাল-শহর ছিল, তা মুদ্রা থেকেই জানা যায়। বাংলাপিডিয়ার ‘খলিফাতাবাদ’ নিবন্ধ অনুযায়ী, ৯২২ হিজরিতে (১৫১৬ খ্রিস্টাব্দ) নসিরউদ্দিন নসরত শাহের প্রশাসনকালে শহরটি টাঁকশাল-শহর হিসেবে দেখা দেয় এবং গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহের (১৫৩২–১৫৩৮) আমল পর্যন্ত সেই মর্যাদা ধরে রাখে। বাংলাপিডিয়া খলিফাতাবাদকে ভৈরব নদের তীরের আজকের বাগেরহাট শহরের সঙ্গেই শনাক্ত করেছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বাগেরহাট কার্যালয়ও লিখেছে, মুদ্রা-প্রমাণের ভিত্তিতে পণ্ডিতদের ধারণা, ষোড়শ শতকে শহরটি খলিফাতাবাদ নামেই পরিচিত ছিল।
কিন্তু টাঁকশালটি ঠিক কোথায় ছিল, তা এখনো অনুমান মাত্র। সরকারি লেখাতেই ‘সম্ভবত’ শব্দটি আছে, আর স্থানীয় ওয়েবসাইট বাগেরহাট ইনফো বিষয়টিকে ‘অনেকে মনে করেন’ বলে উল্লেখ করেছে। মিঠাপুকুরপাড়ে খনন করে টাঁকশালের কোনো চিহ্ন পাওয়া গেছে, এমন কোনো প্রকাশিত প্রতিবেদন আমরা পাইনি। পুকুরপাড়ের বর্তমান মসজিদটিই সুলতানি আমলের সেই মসজিদ কি না, কিংবা পুরোনো মসজিদের কোনো অংশ টিকে আছে কি না, সেটিও নিশ্চিত নয়।
আজকের মিঠাপুকুরের বড় সংকট দূষণ। স্থানীয় বাসিন্দাদের বরাতে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিদিন প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেটসহ নানা আবর্জনা পড়ছে পুকুরে; শিশুরা মাঝেমধ্যে নিজেরা পরিষ্কার করলেও কয়েক দিনেই আবার ময়লা জমে যায়, তাই বাসিন্দারা কর্তৃপক্ষের নজর চেয়েছেন। পাঁচ শতাব্দী আগের টাঁকশালের গল্প প্রমাণিত হোক বা না হোক, লোনা মাটির শহরে এক টুকরো মিঠা জল হিসেবে মিঠাপুকুর নিজেই একটি ঐতিহ্য।