পীর আলী ও ‘পিরালী’ অপবাদের কাহিনি

ইতিহাস ও জনশ্রুতিসুলতানি আমল ও খান জাহানপনের শতক (কাহিনি লিপিবদ্ধ ১৮৭১–১৯১৪)খানজাহান আলী মাজার কমপ্লেক্স, বাগেরহাট সদর (কাহিনির পটভূমি দক্ষিণডিহি, খুলনা)

খানজাহানের সমাধির পাশে মুহম্মদ তাহিরের সমাধিবেদি। লোকে তাঁকে চেনে ‘পীর আলী’ নামে—যাঁর নাম জড়িয়ে আছে এক লেবুর ঘ্রাণ, এক ভোজসভা আর ঠাকুর পরিবারের ‘পিরালী’ পরিচয়ের সঙ্গে।

নথিভুক্ত: খানজাহানের দরগায় মুহম্মদ তাহিরের নামাঙ্কিত সমাধিবেদি (৮৬৩ হিজরি) এবং ঠাকুর পরিবারের ‘পিরালী’ পরিচয় ও তার সামাজিক প্রভাব। লেবু ও গোমাংসের ঘ্রাণের কাহিনি ঘটকদের পুঁথি ও জনশ্রুতি; সূত্রভেদে কে কাকে ঠকিয়েছিলেন, সেটিই বদলে যায়।

খানজাহানের সমাধিসৌধের ঠিক পশ্চিমে একই ধাঁচের আরেকটি পাথরের সমাধিবেদি। ১৯০৮ সালের খুলনা গেজেটিয়ার ও বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী এর লিপিতে লেখা—এটি এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু মুহম্মদ তাহিরের সমাধি, তারিখ ৮৬৩ হিজরির জিলহজ, অর্থাৎ খানজাহানের মৃত্যুর মাসেই। বাংলাপিডিয়া বলছে, লোকমুখে তিনি খানজাহানের প্রিয় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বা দেওয়ান। জেমস ওয়েস্টল্যান্ড (১৮৭১) ও সতীশচন্দ্র মিত্র (১৯১৪) দুজনেই লিখেছেন, এটি ভেতরে ফাঁপা একটি স্মৃতিসমাধি, নিচে নামার পথ আছে; মিত্রের মতে তাহির এখানে মারা যাননি। লোকে তাঁকে চেনে ‘পীর আলী’ নামে।

এই পীর আলীকে ঘিরেই বাংলার সমাজ-ইতিহাসের এক আলোচিত কাহিনি: ‘পিরালী ব্রাহ্মণ’। কাহিনিটির একাধিক রূপ আছে, আর প্রায় সবই ঘটকদের (কুলজি-লেখকদের) পুঁথি ও লোকশ্রুতিনির্ভর। মিত্রের বিবরণে মুহম্মদ তাহির আগে ছিলেন এক ব্রাহ্মণ; ঘটকদের মতে এক মুসলিম নারীর প্রতি আসক্ত হয়ে তিনি ধর্মান্তরিত হন। খানজাহান পয়োগ্রাম কসবায় (বর্তমান খুলনার ফুলতলা অঞ্চল) তাঁকে উজির করে রেখে যান। দক্ষিণডিহির রায়চৌধুরী পরিবারের দুই ভাই কামদেব ও জয়দেব কাজ করতেন তাঁর অধীনে।

কাহিনি অনুযায়ী, রোজার দিনে কেউ একটি সুগন্ধি লেবু উপহার দিলে তাহির সেটি শুঁকছিলেন। কামদেব বলে বসেন, শাস্ত্রে আছে ঘ্রাণে অর্ধভোজন—তাহলে তো রোজা ভেঙে গেল! অপমানিত তাহির পরে এক দরবারে সবাইকে ডাকেন, পাশের ঘরে তখন গোমাংস রান্না হচ্ছিল। দুই ভাই নাকে কাপড় দিতেই তিনি তাঁদের কথাই ফিরিয়ে দেন: ঘ্রাণে যদি অর্ধভোজন হয়, তবে তোমাদের জাত গেছে। কাহিনিতে জোর করে খাওয়ানোর কথাও আছে। দুই ভাই মুসলমান হয়ে কামালউদ্দিন ও জামালউদ্দিন খাঁ চৌধুরী নাম পান; বাকি দুই ভাই রতিদেব ও শুকদেব হিন্দু থাকলেও সমাজে ‘পিরালী’ বলে একঘরে হন।

এই পরিবারের সঙ্গে বিয়ের সূত্রে কুশারী বংশের একটি শাখাও ‘পিরালী’ হয়ে যায়; সেই শাখা থেকেই কলকাতার ঠাকুর পরিবার। মিত্রের মতে কুশারী পুরুষোত্তম বিদ্যাবাগীশ এই পরিবারে বিয়ে করেছিলেন; ডেইলি স্টারে সৈয়দ আশরাফ আলীর লেখায় নামটি জগন্নাথ কুশারী। বাংলাপিডিয়ার ‘ঠাকুর পরিবার’ ভুক্তি বলছে, নিরপেক্ষ গবেষকদের মতে ঠাকুরেরা যশোরের ‘পিরালী ব্রাহ্মণ’ নামে পরিচিত এক নিম্ন গণ্য উপবর্ণের ছিলেন, আর কথিত এই বর্ণগত হীনতার কারণে রবীন্দ্রনাথসহ পরিবারের কেউ উঁচু কুলীন পরিবারে বিয়ের সম্পর্ক গড়তে পারেননি।

তবে খুঁটিনাটিতে সূত্রগুলো একমত নয়। ১৯০৮ সালের খুলনা গেজেটিয়ারে গল্পটি উল্টো: সেখানে পীর আলী নিজেই সেই ব্রাহ্মণ, যিনি খানজাহানকে ফুলের তোড়া শুঁকতে দেখে খোঁটা দিয়েছিলেন, আর খানজাহানের পাল্টা কৌশলে জাত হারিয়ে মুসলমান হয়ে মুহম্মদ তাহির নাম নেন। ওয়েস্টল্যান্ড ১৮৭১ সালে শুধু লিখেছিলেন, পীর আলী ধর্মান্তরিত ব্রাহ্মণ, তাঁর নামে হিন্দুদের একটি গোষ্ঠী পরিচিত, কিন্তু কীভাবে তা তিনি জানেন না। নিশ্চিতভাবে বলা যায় দুটি কথা: খানজাহানের দরগায় মুহম্মদ তাহিরের নামে ৮৬৩ হিজরির একটি সমাধিবেদি আছে, আর ‘পিরালী’ অপবাদ শতাব্দীর পর শতাব্দী বাস্তব সামাজিক বৈষম্য হয়ে ছিল। লেবু আর গোমাংসের ঘ্রাণের নাটকীয় গল্পটি ঘটকদের পুঁথির, যার সত্যতা যাচাইয়ের উপায় নেই।

গল্পের জায়গাগুলো

তথ্যসূত্র

  1. Khan Jahan's Tomb, Bagerhat · বাংলাপিডিয়া (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ), ২০২১
  2. Bengal District Gazetteers: Khulna — L. S. S. O'Malley · ইন্টারনেট আর্কাইভ (মূল প্রকাশ, কলকাতা), ১৯০৮
  3. A Report on the District of Jessore: Its Antiquities, Its History, and Its Commerce — J. Westland · ইন্টারনেট আর্কাইভ (মূল প্রতিবেদন, কলকাতা), ১৮৭১
  4. যশোহর-খুলনার ইতিহাস, প্রথম খণ্ড — সতীশচন্দ্র মিত্র · চক্রবর্তী চ্যাটার্জি অ্যান্ড কোং, কলকাতা (ইন্টারনেট আর্কাইভে সংরক্ষিত), ১৯১৪
  5. Tagore Family · বাংলাপিডিয়া (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ)
  6. From Thakur to Tagore (Behind the Name) · দ্য ডেইলি স্টার, ২০১৩
  7. Trails of Khan Jahan Ali · দ্য ডেইলি স্টার, ২০১৯

কোনো তথ্য ভুল মনে হলে বা আরও ভালো সূত্র জানা থাকলে নিচে জানান; যাচাই করে ঠিক করা হবে।

বাগেরহাট সদর-এর আরও গল্প

সব দেখুন
সমাধির পাথরে লেখা শেষ কথাখানজাহানের সমাধিবেদির পাথরই তাঁর সম্পর্কে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য দলিল। সেখানে তিনি নিজেকে বলেছেন বৃদ্ধ, দুর্বল এক প্রবাসী—আর লিখে রেখেছেন মৃত্যুর তারিখ।প্রমাণিত ইতিহাসখলিফাতাবাদ: খানজাহানের পরের টাকশাল-শহর আর মোগল ‘সরকার’খানজাহানের মৃত্যুর পরও খলিফাতাবাদ হারিয়ে যায়নি। সুলতানদের মুদ্রায় এর নাম উঠেছে, মোগল রাজস্বের খাতায় এটি ছিল আস্ত এক ‘সরকার’—আর বাগেরহাটের ‘দশানী’ নামেও হয়তো লুকিয়ে আছে সেই হিসাবের ছাপ।প্রমাণিত ইতিহাসপ্রতাপাদিত্য, ফিরিঙ্গি আর মগ: বারো ভূঁইয়ার যুগে বাগেরহাটষোড়শ-সপ্তদশ শতকে যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজ্য ছুঁয়ে ছিল আজকের বাগেরহাট; একই সময়ে পর্তুগিজ ‘ফিরিঙ্গি’ আর আরাকানি মগ জলদস্যুর হানায় উজাড় হয়েছিল দক্ষিণের বহু জনপদ। কোনটা প্রমাণিত, কোনটা জনশ্রুতি?ইতিহাস ও জনশ্রুতিভৈরবের বাঁকে বাঁকে: নদী, হাট আর নৌপথের বাগেরহাটএকসময় বাগেরহাটে চলাফেরা মানেই ছিল নৌকা। কলকাতাগামী ধানের জাহাজ, মোড়েলগঞ্জের বন্দর, স্টিমারের হুইসেল—মরে আসা ভৈরব আর বদলে যাওয়া নদীপথের গল্প।প্রমাণিত ইতিহাস