অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন: পিসি কলেজের শিক্ষক, একাত্তরের শহীদ

প্রমাণিত ইতিহাসমুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১১৯৩২–১৯৭১সরকারি পিসি কলেজ, বাগেরহাট

অর্থনীতির অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন একাত্তরে গ্রামের তরুণদের সংগঠিত করেছিলেন। ২৮ অক্টোবর রাতে নৌকায় বাড়ি ফেরার পথে গুলিতে নিহত হন তিনি।

জীবনের শেষ মাসগুলোর বিবরণ পারিবারিক স্মৃতিকথানির্ভর; হত্যার স্থান (গ্রামের নাম) ও হামলাকারীদের পরিচয় কোনো সূত্রে পাওয়া যায়নি। জ্ঞানকোষের তালিকার ‘মোয়াজ্জেম হোসেন’ ও এই অধ্যাপক একই ব্যক্তি বলে ধরে নেওয়া হয়েছে; সম্পাদকের যাচাই প্রয়োজন।

বাগেরহাট সরকারি প্রফুল্লচন্দ্র কলেজের ইতিহাসে যাঁদের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়, তাঁদের একজন অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন (১৯৩২–১৯৭১)। তিনি ছিলেন কলেজের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, বাংলা ও ইংরেজিতে অর্থনীতির বইও লিখেছিলেন। ২০১৭ সালে কলেজের শতবর্ষ নিয়ে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে কলেজের উল্লেখযোগ্য শিক্ষকদের মধ্যে শহীদ অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেনের নাম আছে। বাগেরহাট সদর উপজেলা পোর্টালও তাঁকে উপজেলার প্রখ্যাত ব্যক্তিদের তালিকায় রেখেছে।

তাঁর জীবনের শেষ মাসগুলোর কথা সবচেয়ে বিশদভাবে জানা যায় মেয়ে রোকেয়া খানের স্মৃতিকথা থেকে, যা বাংলা একাডেমির ‘স্মৃতি: ১৯৭১’ গ্রন্থ থেকে নিয়ে ২০২৩ সালের শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে প্রথম আলো প্রকাশ করে। সেখানে আছে, মার্চের গণহত্যার পর তিনি পরিবারকে গ্রামে পাঠিয়ে দেন। গ্রামের তরুণদের নিয়ে গড়ে তোলেন ছোট একটি প্রতিরক্ষা দল, যারা পাহারা দিত এবং হামলা-লুটপাট থেকে মানুষকে রক্ষার চেষ্টা করত। পরে একদল তরুণকে নিয়ে প্রশিক্ষণের জন্য ভারতে যান এবং এলাকায় ফিরে আসেন। স্মৃতিকথা অনুযায়ী তাঁকে ৯ নম্বর সেক্টরের প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল; শান্তি কমিটির তালিকায় তাঁর নাম ওঠে, বন্ধ করে দেওয়া হয় বেতন।

১৯৭১ সালের ২৮ অক্টোবর রাতে নৌকায় করে নিজ বাড়ির ঘাটে ফেরার সময় নদীর অপর পাড় থেকে অজ্ঞাত বন্দুকধারীরা তাঁকে গুলি করে। পিঠে ও পেটে গুলিবিদ্ধ হয়ে নৌকাতেই তিনি মারা যান। স্মৃতিকথায় মেয়ে লিখেছেন, তাঁকে সঙ্গে পাহারাদার রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু প্রায়ই তিনি একা চলাফেরা করতেন। হামলাকারীদের পরিচয় স্মৃতিকথায় নেই; লেখক তাদের ছদ্মবেশী দুর্বৃত্ত বলেছেন, আর সেই সময়ের বৃহত্তর সহিংসতার দায় দিয়েছেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের স্থানীয় সহযোগীদের।

পরিবারের জন্য সেই রাত আর শেষ হয়নি। স্মৃতিকথায় আছে, মা কখনো পুরোপুরি সেই আঘাত সামলে উঠতে পারেননি; পরিবার বহু বছর আগলে রেখেছিল তাঁর ভাঙা টর্চলাইট আর রক্তমাখা লুঙ্গি। মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষের বাগেরহাট সদর অংশে সরকারি তালিকাভুক্ত ১৩ জন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার তালিকার প্রথম নামটিও মোয়াজ্জেম হোসেন।

একজন শিক্ষক কীভাবে শ্রেণিকক্ষ থেকে প্রতিরোধের মাঠে গিয়েছিলেন, অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেনের জীবন তার উদাহরণ। পিসি কলেজের শতবর্ষী ইতিহাসে তাই তাঁর নাম শুধু একজন শিক্ষকের নয়, একাত্তরের বাগেরহাটেরও এক প্রতীক।

তথ্যসূত্র

  1. বাবার বিরাট দেহটা এক নৌকা রক্তের মধ্যে ভাসছিল (রোকেয়া খান) · প্রথম আলো, ২০২৩
  2. বাগেরহাট সরকারি পিসি কলেজ শত বছরে · প্রথম আলো, ২০১৭
  3. প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব · বাগেরহাট সদর উপজেলা তথ্য বাতায়ন, ২০১৩
  4. মুক্তিযুদ্ধে বাগেরহাট সদর উপজেলা (সূত্র: বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ, ৬ষ্ঠ খণ্ড) · সংগ্রামের নোটবুক

কোনো তথ্য ভুল মনে হলে বা আরও ভালো সূত্র জানা থাকলে নিচে জানান; যাচাই করে ঠিক করা হবে।

বাগেরহাট সদর-এর আরও গল্প

সব দেখুন
সমাধির পাথরে লেখা শেষ কথাখানজাহানের সমাধিবেদির পাথরই তাঁর সম্পর্কে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য দলিল। সেখানে তিনি নিজেকে বলেছেন বৃদ্ধ, দুর্বল এক প্রবাসী—আর লিখে রেখেছেন মৃত্যুর তারিখ।প্রমাণিত ইতিহাসখলিফাতাবাদ: খানজাহানের পরের টাকশাল-শহর আর মোগল ‘সরকার’খানজাহানের মৃত্যুর পরও খলিফাতাবাদ হারিয়ে যায়নি। সুলতানদের মুদ্রায় এর নাম উঠেছে, মোগল রাজস্বের খাতায় এটি ছিল আস্ত এক ‘সরকার’—আর বাগেরহাটের ‘দশানী’ নামেও হয়তো লুকিয়ে আছে সেই হিসাবের ছাপ।প্রমাণিত ইতিহাসপ্রতাপাদিত্য, ফিরিঙ্গি আর মগ: বারো ভূঁইয়ার যুগে বাগেরহাটষোড়শ-সপ্তদশ শতকে যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজ্য ছুঁয়ে ছিল আজকের বাগেরহাট; একই সময়ে পর্তুগিজ ‘ফিরিঙ্গি’ আর আরাকানি মগ জলদস্যুর হানায় উজাড় হয়েছিল দক্ষিণের বহু জনপদ। কোনটা প্রমাণিত, কোনটা জনশ্রুতি?ইতিহাস ও জনশ্রুতিভৈরবের বাঁকে বাঁকে: নদী, হাট আর নৌপথের বাগেরহাটএকসময় বাগেরহাটে চলাফেরা মানেই ছিল নৌকা। কলকাতাগামী ধানের জাহাজ, মোড়েলগঞ্জের বন্দর, স্টিমারের হুইসেল—মরে আসা ভৈরব আর বদলে যাওয়া নদীপথের গল্প।প্রমাণিত ইতিহাস