তারিখ ও হতাহতের সংখ্যা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর রায়ের ভাষ্য অনুযায়ী। দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তির নাম রায় উদ্ধৃত করে দেওয়া হয়েছে; খালাসপ্রাপ্ত আসামির নাম দেওয়া হয়নি।
একাত্তরে বাগেরহাট সদরের গ্রামে গ্রামে যে হত্যাযজ্ঞ চলেছিল, তার কয়েকটির বিশদ বিবরণ আজ আদালতের নথিতে আছে। ২০১৫ সালের ১১ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ (চেয়ারম্যান বিচারপতি এম এনায়েতুর রহিম, সদস্য বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি আনোয়ারুল হক) বাগেরহাটের একটি মামলার রায় দেন। রায়ের পূর্ণ পাঠ থেকে এখানে সদর উপজেলার তিনটি ঘটনার কথা। বাংলাপিডিয়ার বাগেরহাট জেলা নিবন্ধে জেলার নয়টি গণকবরের তালিকায় রণজিৎপুর ও কান্দাপাড়া দুটির নামই আছে।
রণজিৎপুর, ১৩ মে ১৯৭১। ট্রাইব্যুনালের রায় অনুযায়ী, এদিন রণজিৎপুর গ্রামে হামলা চালিয়ে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন নিরস্ত্র হিন্দু গ্রামবাসীকে হত্যা করা হয় এবং বাড়িঘর লুট করে আগুন দেওয়া হয়। ট্রাইব্যুনাল ঘটনাটিকে হিন্দু ধর্মীয় গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিক ধ্বংসের উদ্দেশ্যে সংঘটিত গণহত্যা (জেনোসাইড) হিসেবে গণ্য করেছে।
বেসরগাতী ও কান্দাপাড়া, ১৮ জুন ১৯৭১। রায়ে বলা হয়েছে, সকাল আনুমানিক ১০টায় ৩০–৩৫ জন সশস্ত্র রাজাকার ও ২০–২৫ জন পাকিস্তানি সেনা গ্রাম দুটিতে হামলা চালিয়ে ২০ জনকে ধরে নিয়ে যায়; তাঁদের ১৯ জনকে হত্যা করা হয়, একজন প্রাণে বেঁচে যান। প্রথম আলোর নাগরিক সংবাদে গবেষক আবু সাঈদের লেখায় আছে, গ্রামে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প থাকার খবর পেয়ে হামলাকারীরা আসে এবং ধরে আনা গ্রামবাসীদের কান্দাপাড়া বাজারে নিয়ে হত্যা করে।
চুলকাঠি, ১৪ অক্টোবর ১৯৭১। রায় অনুযায়ী, সকাল আনুমানিক ১০টায় ১০০–১৫০ জন সশস্ত্র রাজাকার চুলকাঠি বাজার ও আশপাশে হামলা চালিয়ে প্রায় ৪২টি বাড়ি লুট করে আগুন দেয়, সাতজনকে ধরে নিয়ে নির্যাতনের পর হত্যা করে।
এই মামলায় ট্রাইব্যুনাল রাজাকার নেতা শেখ সিরাজুল হক ওরফে সিরাজ মাস্টারকে রণজিৎপুর, বেসরগাতী-কান্দাপাড়া ও চুলকাঠির ঘটনাসহ রামপালের ডাকরা কালীমন্দির (২১ মে) ও কচুয়ার শাঁখারীকাঠি হাটের হত্যাকাণ্ড মিলিয়ে পাঁচটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেন; একটি অভিযোগ থেকে তিনি খালাস পান। প্রথম আলো জানায়, ২০১৪ সালের ২১ জুলাই সদর উপজেলার ডেমা গ্রাম থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। মামলার তৃতীয় আসামি রায়ের আগেই মারা যান, আর আমৃত্যু কারাদণ্ড পাওয়া আরেক আসামি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আপিল বিভাগে খালাস পান। সিরাজ মাস্টারের আপিলের সর্বশেষ অবস্থা আমরা নির্ভরযোগ্য সূত্রে নিশ্চিত হতে পারিনি। তবে রণজিৎপুর, কান্দাপাড়া আর চুলকাঠির মানুষের কাছে রায়ের চেয়েও বড় সত্য হলো, যাঁদের তাঁরা হারিয়েছেন, তাঁদের স্মৃতি।