রণবিজয়পুর: যুদ্ধজয়ের নামে গ্রাম, দেশের সবচেয়ে বড় এক গম্বুজ

ইতিহাস ও জনশ্রুতিসুলতানি আমল ও খান জাহানপনের শতক (১৪৫৯ সালের আগে)রণবিজয়পুর, বাগেরহাট সদর

গ্রামের নামে ‘রণ’ আর ‘বিজয়’—কোন যুদ্ধের স্মৃতি, কেউ নিশ্চিত জানে না। তবে গ্রামের মসজিদটির গম্বুজ এক স্থাপত্য-বিজয়: বাংলাদেশের এক গম্বুজ মসজিদের মধ্যে সবচেয়ে বড়।

মসজিদের স্থাপত্য ও সংরক্ষণ নথিভুক্ত। গ্রামের নামের সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট যুদ্ধের যোগ অজানা; মগ ও জলদস্যুদের পরাজয়ের কাহিনি জনশ্রুতি।

ষাট গম্বুজ থেকে খানজাহানের মাজারের পথে রণবিজয়পুর গ্রাম। নাম ভাঙলে ‘রণ’ মানে যুদ্ধ, আর ‘বিজয়’। এখানেই দাঁড়িয়ে আছে রণবিজয়পুর মসজিদ, স্থানীয়ভাবে যার আরেক নাম ফকিরবাড়ি মসজিদ। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর একে বাংলাদেশের এক গম্বুজ মসজিদের মধ্যে সর্ববৃহৎ বলেছে।

গ্রামের নামের পেছনে কোন যুদ্ধ? নিশ্চিত কিছু জানা যায় না। সতীশচন্দ্র মিত্র (১৯১৪) লক্ষ করেছিলেন, বাগেরহাটের কাছে রণবিজয়পুর, রণজিৎপুর, রণভূমি, ফতেপুরের মতো যুদ্ধ-জয়ের স্মৃতিবাহী কয়েকটি নাম আছে, কিন্তু কার সঙ্গে কোন যুদ্ধের স্মৃতি এগুলো বহন করছে, তা নির্ণয় করা দুঃসাধ্য। তাঁর মতে খানজাহানের সেনা থাকলেও এ অঞ্চলে তাঁকে খুব বেশি যুদ্ধ করতে হয়নি; জনহিতকর কাজই মানুষকে তাঁর অনুগত করেছিল। অন্যদিকে লোকমুখে প্রচলিত আছে, খানজাহান রণবিজয়পুর এলাকায় মগ ও জলদস্যুদের পরাজিত করেছিলেন—২০১৮ সালে ইউএনবির এক প্রতিবেদনে ষাটগম্বুজ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এই জনশ্রুতির কথা বলেছেন। এর কোনো লিখিত প্রমাণ নেই।

মসজিদটি অবশ্য নিজেই এক বিজয়—স্থাপত্যের। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী এর ভেতরের প্রতিটি দিক প্রায় ১০.৮২ মিটার, দেয়াল ২.৭৪ মিটার পুরু, আর মাথার ওপর একটিমাত্র বিশাল অর্ধগোলাকার ইটের গম্বুজ, যা চার কোণের অর্ধগম্বুজাকৃতি স্কুইঞ্চ ও খিলানের ওপর বসানো। পূর্ব, উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে তিনটি করে দরজা, পশ্চিমে তিনটি মিহরাব, চার কোণে খানজাহানি রীতির গোল বুরুজ।

বাংলাপিডিয়া একটি কৌতূহলজাগানো তথ্যও দিয়েছে: গম্বুজের বাইরের দিকে মূলত ইটের কোনা বের করে বৃত্তাকার সারিতে সাজানো ছিল, যা বাংলায় বিরল; লেখক এম এ বারির ধারণা, এর অনুপ্রেরণা হয়তো বুখারার ইসমাইল সামানির সমাধিসৌধ। এখন অবশ্য গম্বুজটি মসৃণ প্লাস্টারে ঢাকা। পোড়ামাটির অলংকরণের বেশির ভাগ হারিয়ে গেলেও প্রবেশপথ, মিহরাব আর কার্নিশে গোলাপ, জালি, লতাপাতা ও ঝুলন্ত নকশা এখনো দেখা যায়। কোনো শিলালিপি নেই; গঠনশৈলী দেখে এটিকে খানজাহানের আমলের বলে ধরা হয়।

সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ঘোষণার সাল নিয়েও সূত্রভেদ আছে—বাংলাপিডিয়া বলছে ১৯৬১, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের পাতায় ১৯৫৯। পরে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ব্যাপক সংস্কার করে, আর ১৯৮৫ সালে এটি বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হয়। মিত্রের সময়ে রণবিজয়পুরে খানজাহানের অনুচর দরিয়া খাঁ ও আহম্মদ খাঁর নামে মসজিদ ও দিঘি ছিল বলে তিনি লিখেছেন; তিনি এটাও লিখেছেন যে গ্রামের একটি প্রাচীরঘেরা মসজিদ ভেঙে কেউ নিজের বাড়ি বানিয়েছিলেন।

গল্পের জায়গাগুলো

তথ্যসূত্র

  1. Ranvijaypur Mosque · বাংলাপিডিয়া (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ)
  2. এক নজরে — বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য: ঐতিহাসিক মসজিদের শহর বাগেরহাট · প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, বাগেরহাট, ২০২৪
  3. যশোহর-খুলনার ইতিহাস, প্রথম খণ্ড — সতীশচন্দ্র মিত্র · চক্রবর্তী চ্যাটার্জি অ্যান্ড কোং, কলকাতা (ইন্টারনেট আর্কাইভে সংরক্ষিত), ১৯১৪
  4. From ‘Chaad’ to ‘Shat Gambuj’: The mosque that enthralls · দ্য ডেইলি স্টার (ইউএনবি), ২০১৮
  5. Historic Mosque City of Bagerhat (Outstanding Universal Value) · UNESCO World Heritage Centre, ১৯৮৫

কোনো তথ্য ভুল মনে হলে বা আরও ভালো সূত্র জানা থাকলে নিচে জানান; যাচাই করে ঠিক করা হবে।

বাগেরহাট সদর-এর আরও গল্প

সব দেখুন
সমাধির পাথরে লেখা শেষ কথাখানজাহানের সমাধিবেদির পাথরই তাঁর সম্পর্কে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য দলিল। সেখানে তিনি নিজেকে বলেছেন বৃদ্ধ, দুর্বল এক প্রবাসী—আর লিখে রেখেছেন মৃত্যুর তারিখ।প্রমাণিত ইতিহাসখলিফাতাবাদ: খানজাহানের পরের টাকশাল-শহর আর মোগল ‘সরকার’খানজাহানের মৃত্যুর পরও খলিফাতাবাদ হারিয়ে যায়নি। সুলতানদের মুদ্রায় এর নাম উঠেছে, মোগল রাজস্বের খাতায় এটি ছিল আস্ত এক ‘সরকার’—আর বাগেরহাটের ‘দশানী’ নামেও হয়তো লুকিয়ে আছে সেই হিসাবের ছাপ।প্রমাণিত ইতিহাসপ্রতাপাদিত্য, ফিরিঙ্গি আর মগ: বারো ভূঁইয়ার যুগে বাগেরহাটষোড়শ-সপ্তদশ শতকে যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজ্য ছুঁয়ে ছিল আজকের বাগেরহাট; একই সময়ে পর্তুগিজ ‘ফিরিঙ্গি’ আর আরাকানি মগ জলদস্যুর হানায় উজাড় হয়েছিল দক্ষিণের বহু জনপদ। কোনটা প্রমাণিত, কোনটা জনশ্রুতি?ইতিহাস ও জনশ্রুতিভৈরবের বাঁকে বাঁকে: নদী, হাট আর নৌপথের বাগেরহাটএকসময় বাগেরহাটে চলাফেরা মানেই ছিল নৌকা। কলকাতাগামী ধানের জাহাজ, মোড়েলগঞ্জের বন্দর, স্টিমারের হুইসেল—মরে আসা ভৈরব আর বদলে যাওয়া নদীপথের গল্প।প্রমাণিত ইতিহাস