মসজিদের স্থাপত্য ও সংরক্ষণ নথিভুক্ত। গ্রামের নামের সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট যুদ্ধের যোগ অজানা; মগ ও জলদস্যুদের পরাজয়ের কাহিনি জনশ্রুতি।
ষাট গম্বুজ থেকে খানজাহানের মাজারের পথে রণবিজয়পুর গ্রাম। নাম ভাঙলে ‘রণ’ মানে যুদ্ধ, আর ‘বিজয়’। এখানেই দাঁড়িয়ে আছে রণবিজয়পুর মসজিদ, স্থানীয়ভাবে যার আরেক নাম ফকিরবাড়ি মসজিদ। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর একে বাংলাদেশের এক গম্বুজ মসজিদের মধ্যে সর্ববৃহৎ বলেছে।
গ্রামের নামের পেছনে কোন যুদ্ধ? নিশ্চিত কিছু জানা যায় না। সতীশচন্দ্র মিত্র (১৯১৪) লক্ষ করেছিলেন, বাগেরহাটের কাছে রণবিজয়পুর, রণজিৎপুর, রণভূমি, ফতেপুরের মতো যুদ্ধ-জয়ের স্মৃতিবাহী কয়েকটি নাম আছে, কিন্তু কার সঙ্গে কোন যুদ্ধের স্মৃতি এগুলো বহন করছে, তা নির্ণয় করা দুঃসাধ্য। তাঁর মতে খানজাহানের সেনা থাকলেও এ অঞ্চলে তাঁকে খুব বেশি যুদ্ধ করতে হয়নি; জনহিতকর কাজই মানুষকে তাঁর অনুগত করেছিল। অন্যদিকে লোকমুখে প্রচলিত আছে, খানজাহান রণবিজয়পুর এলাকায় মগ ও জলদস্যুদের পরাজিত করেছিলেন—২০১৮ সালে ইউএনবির এক প্রতিবেদনে ষাটগম্বুজ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এই জনশ্রুতির কথা বলেছেন। এর কোনো লিখিত প্রমাণ নেই।
মসজিদটি অবশ্য নিজেই এক বিজয়—স্থাপত্যের। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী এর ভেতরের প্রতিটি দিক প্রায় ১০.৮২ মিটার, দেয়াল ২.৭৪ মিটার পুরু, আর মাথার ওপর একটিমাত্র বিশাল অর্ধগোলাকার ইটের গম্বুজ, যা চার কোণের অর্ধগম্বুজাকৃতি স্কুইঞ্চ ও খিলানের ওপর বসানো। পূর্ব, উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে তিনটি করে দরজা, পশ্চিমে তিনটি মিহরাব, চার কোণে খানজাহানি রীতির গোল বুরুজ।
বাংলাপিডিয়া একটি কৌতূহলজাগানো তথ্যও দিয়েছে: গম্বুজের বাইরের দিকে মূলত ইটের কোনা বের করে বৃত্তাকার সারিতে সাজানো ছিল, যা বাংলায় বিরল; লেখক এম এ বারির ধারণা, এর অনুপ্রেরণা হয়তো বুখারার ইসমাইল সামানির সমাধিসৌধ। এখন অবশ্য গম্বুজটি মসৃণ প্লাস্টারে ঢাকা। পোড়ামাটির অলংকরণের বেশির ভাগ হারিয়ে গেলেও প্রবেশপথ, মিহরাব আর কার্নিশে গোলাপ, জালি, লতাপাতা ও ঝুলন্ত নকশা এখনো দেখা যায়। কোনো শিলালিপি নেই; গঠনশৈলী দেখে এটিকে খানজাহানের আমলের বলে ধরা হয়।
সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ঘোষণার সাল নিয়েও সূত্রভেদ আছে—বাংলাপিডিয়া বলছে ১৯৬১, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের পাতায় ১৯৫৯। পরে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ব্যাপক সংস্কার করে, আর ১৯৮৫ সালে এটি বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হয়। মিত্রের সময়ে রণবিজয়পুরে খানজাহানের অনুচর দরিয়া খাঁ ও আহম্মদ খাঁর নামে মসজিদ ও দিঘি ছিল বলে তিনি লিখেছেন; তিনি এটাও লিখেছেন যে গ্রামের একটি প্রাচীরঘেরা মসজিদ ভেঙে কেউ নিজের বাড়ি বানিয়েছিলেন।