ভৈরব আর দড়াটানা: যে নদকে ঘিরে গড়ে উঠল শহর

প্রমাণিত ইতিহাসস্বাধীন বাংলাদেশপঞ্চদশ শতক থেকে আজবাগেরহাট শহর, সুপারিপট্টি খেয়াঘাট থেকে মুনিগঞ্জ

উত্তরে ভৈরব, দক্ষিণে দড়াটানা: একই জলধারার দুই নাম। এর বাঁকে বসা হাট থেকেই হয়তো শহরের নাম; আর আজ সেই নদ দখল-দূষণে ক্রমে সরু হচ্ছে।

‘বাঁকেরহাট’ থেকে নামের ব্যাখ্যা জনশ্রুতি। নদের গতিপথ ও নাম সদর উপজেলা পোর্টালের; দখল-দূষণের তথ্য প্রথম আলোর ২০২৪ সালের প্রতিবেদনের।

বাগেরহাট শহরের ইতিহাস আসলে একটি নদের ইতিহাস। প্রথম আলোর ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদন শুরুই হয়েছে এই কথায় যে ভৈরব নদকে কেন্দ্র করেই বাগেরহাট শহরের গোড়াপত্তন। নদটি উত্তর দিক থেকে এসে শহরের সুপারিপট্টি খেয়াঘাটের কাছে পূর্ব দিকে বাঁক নিয়েছে; দক্ষিণের অংশের নাম দড়াটানা। নদের পশ্চিম তীরে শহরের প্রধান বাজার, যা আজও বাগেরহাটের বড় বাণিজ্যকেন্দ্র।

সদর উপজেলা পোর্টাল এই জলধারার পুরো যাত্রাটা লিখে রেখেছে। মোল্লাহাটের কেন্দুয়া বিল থেকে চিত্রা নামে যাত্রা শুরু করে নদীটি ভৈরব নাম নেয়, তারপর দড়াটানা, পরে পয়লাহারা, তারপর পানগুছি, শেষে বলেশ্বর হয়ে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়ে; আনুমানিক দৈর্ঘ্য ১৭৫ কিলোমিটার। এক নদীর এত নাম আসলে বাঁকে বাঁকে বদলে যাওয়া স্থানীয় পরিচয়েরই চিহ্ন।

নদের এই বাঁকই হয়তো শহরের নামও দিয়েছে। জেলা প্রশাসনের ভাষ্যে, ভৈরবের উত্তর দিকে হাড়িখালী থেকে নাগের বাজার পর্যন্ত লম্বা বাঁকের পুরাতন বাজার এলাকায় একসময় হাট বসত, আর ‘বাঁকেরহাট’ থেকেই কালক্রমে ‘বাগেরহাট’; এটি অবশ্য জনশ্রুতিনির্ভর ব্যাখ্যা। জেলা পোর্টাল আরও জানায়, পঞ্চদশ শতকের গোড়ায় খানজাহান যশোরের বারবাজার হয়ে ভৈরব পার হয়েই বাগেরহাটে পৌঁছান। নদের ইতিহাসে বেদনার অধ্যায়ও আছে: মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ অনুযায়ী একাত্তরে দড়াটানার তীরের ডাকবাংলো ঘাট ছিল বাগেরহাট থানার সবচেয়ে বড় বধ্যভূমি, আর ১৭ ডিসেম্বর সকালে মুক্তিযোদ্ধারা এই দড়াটানা পার হয়েই মুক্ত শহরে ঢোকেন।

প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বাসিন্দারা মনে করেছেন, একসময় নৌকা ভিড়ত প্রায় বাড়ির দোরগোড়ায়; এক বাসিন্দার পরিবারের স্মৃতিতে যেখানে নৌকায় যাতায়াত হতো, সেই গ্রাম এখন নদী থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে। আজ নদের প্রবাহ অনেক সরু, তলদেশ ভরাট। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাজারের বর্জ্য ফেলে ভরাট করে পরে দখল করা হয়েছে তীর; বাজার থেকে মুনিগঞ্জ পর্যন্ত দোকান, কাঠ, ইট-বালুর ব্যবসায় তীর দখল, শহরের নালার ময়লাও পড়ছে নদে। ডাকবাংলো এলাকায় নদের ভেতর পর্যন্ত স্থাপনা উঠেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। ২০২৪ সালে চেকপোস্ট নির্মাণের নামে নদ ভরাটের অভিযোগ তুলে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) জেলা প্রশাসনকে চিঠি দেয়; প্রতিবেদন অনুযায়ী কয়েক দিনের মধ্যে কাজটি বন্ধ হয় এবং নতুন জেলা প্রশাসক দখল-দূষণ খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেন।

পাঁচ শতাব্দী আগে যে নদ পেরিয়ে খলিফাতাবাদ গড়ে উঠেছিল, যে নদের বাঁকের হাট থেকে হয়তো শহরের নাম, সেই ভৈরব-দড়াটানার ভবিষ্যৎ এখন শহরবাসী আর প্রশাসনের হাতে। প্রতিবেদনে এক উন্নয়নকর্মীর মন্তব্য ছিল, নদী রক্ষার বদলে নদীকে মেরে ফেলা হচ্ছে; শহরের জন্মদাতা নদের জন্য এর চেয়ে বড় সতর্কবার্তা আর হয় না।

তথ্যসূত্র

  1. বাগেরহাটে ভৈরব নদকে ‘সবাই গলা টিপে ধরেছে’ (সরদার ইনজামামুল হক) · প্রথম আলো, ২০২৪
  2. নদ-নদী · বাগেরহাট সদর উপজেলা তথ্য বাতায়ন, ২০১৩
  3. বাগেরহাট জেলার পটভূমি · বাগেরহাট জেলা তথ্য বাতায়ন, ২০১৪
  4. মুক্তিযুদ্ধে বাগেরহাট সদর উপজেলা (সূত্র: বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ, ৬ষ্ঠ খণ্ড) · সংগ্রামের নোটবুক
  5. Bagerhat Sadar Upazila · বাংলাপিডিয়া, ২০২১

কোনো তথ্য ভুল মনে হলে বা আরও ভালো সূত্র জানা থাকলে নিচে জানান; যাচাই করে ঠিক করা হবে।

বাগেরহাট সদর-এর আরও গল্প

সব দেখুন
সমাধির পাথরে লেখা শেষ কথাখানজাহানের সমাধিবেদির পাথরই তাঁর সম্পর্কে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য দলিল। সেখানে তিনি নিজেকে বলেছেন বৃদ্ধ, দুর্বল এক প্রবাসী—আর লিখে রেখেছেন মৃত্যুর তারিখ।প্রমাণিত ইতিহাসখলিফাতাবাদ: খানজাহানের পরের টাকশাল-শহর আর মোগল ‘সরকার’খানজাহানের মৃত্যুর পরও খলিফাতাবাদ হারিয়ে যায়নি। সুলতানদের মুদ্রায় এর নাম উঠেছে, মোগল রাজস্বের খাতায় এটি ছিল আস্ত এক ‘সরকার’—আর বাগেরহাটের ‘দশানী’ নামেও হয়তো লুকিয়ে আছে সেই হিসাবের ছাপ।প্রমাণিত ইতিহাসপ্রতাপাদিত্য, ফিরিঙ্গি আর মগ: বারো ভূঁইয়ার যুগে বাগেরহাটষোড়শ-সপ্তদশ শতকে যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজ্য ছুঁয়ে ছিল আজকের বাগেরহাট; একই সময়ে পর্তুগিজ ‘ফিরিঙ্গি’ আর আরাকানি মগ জলদস্যুর হানায় উজাড় হয়েছিল দক্ষিণের বহু জনপদ। কোনটা প্রমাণিত, কোনটা জনশ্রুতি?ইতিহাস ও জনশ্রুতিভৈরবের বাঁকে বাঁকে: নদী, হাট আর নৌপথের বাগেরহাটএকসময় বাগেরহাটে চলাফেরা মানেই ছিল নৌকা। কলকাতাগামী ধানের জাহাজ, মোড়েলগঞ্জের বন্দর, স্টিমারের হুইসেল—মরে আসা ভৈরব আর বদলে যাওয়া নদীপথের গল্প।প্রমাণিত ইতিহাস