ঘটনাপ্রবাহ দুটি সূত্রে (ডেইলি স্টার ও মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ) মেলে; লড়াইভিত্তিক হতাহতের সংখ্যা স্মৃতিনির্ভর বই থেকে আসায় বাদ রাখা হয়েছে।
একাত্তরে বাগেরহাটে যে কয়েকটি আঞ্চলিক মুক্তিবাহিনী গড়ে উঠেছিল, তাদের অন্যতম রফিক বাহিনী। নেতৃত্ব দেন রফিকুল ইসলাম খোকন, ছাত্রজীবনে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের নেতা এবং পরে বামপন্থী রাজনীতিক। দ্য ডেইলি স্টার বাংলায় আহমাদ ইশতিয়াকের ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চের আগেই একটি দল গোপনে সংগঠিত হচ্ছিল; ২৫ মার্চের পর সদস্যরা বাগেরহাট শহর থেকে ভৈরব-দড়াটানার ওপারে বিষ্ণুপুরে চলে যান। মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষও বলছে, প্রথম ঘাঁটি ছিল শহরে, পাকিস্তানি সেনা আসার আশঙ্কায় তাঁরা নদের পূর্ব তীরে বিষ্ণুপুরে সরে যান; সেই ঘাঁটি পরে ‘চিরুলিয়া বিষ্ণুপুর ঘাঁটি’ নামে পরিচিত হয়। প্রধান সহযোগী ছিলেন বাহিরদিয়ার মানস ঘোষ।
ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী বাহিনীর যাত্রা শুরু মাত্র ১১ জন যোদ্ধা নিয়ে, প্রথম অস্ত্র একটি রিভলবার; পরে সদস্য দাঁড়ায় অন্তত ৫০০ জনে। সদর দপ্তর ছিল বিষ্ণুপুরের খালিশপুর গ্রামে, আর সন্তোষপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় ও চিতলমারী ইউনিয়নের সুড়িগাতী গ্রামেও ঘাঁটি ছিল। ২৭ এপ্রিল খোকনের নেতৃত্বে চার পুলিশ ও দুই আনসার সদস্যের কাছ থেকে ছয়টি রাইফেল সংগ্রহ করা হয়; মে মাসে আসে আরও ১৯টি রাইফেল।
প্রথম বড় অভিযান ছিল ৩০ এপ্রিল বাগেরহাট সদর থানায় হামলা; লক্ষ্য ছিল আটক আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দ অজিয়র রহমানকে মুক্ত করা। অভিযান সফল হয়নি; ডেইলি স্টার জানায়, পরে তাঁকে খুলনায় নিয়ে হত্যা করা হয়। জ্ঞানকোষ এই থানা আক্রমণকে ব্যর্থ হলেও পরের নয় মাসের যুদ্ধের সূচনা হিসেবে দেখেছে। ২৪ জুলাই রূপসা থেকে বাগেরহাটগামী রাজাকারবাহী একটি ট্রেনে হামলা চালানো হয়; প্রতিবেদনের হিসাবে ৫০ জনের বেশি রাজাকার হতাহত হয় এবং অস্ত্র-গোলাবারুদ উদ্ধার হয়।
এরপর একের পর এক লড়াই: ৬–৮ আগস্ট প্রায় ১৫০ যোদ্ধার মাধবকাঠি মাদ্রাসা ঘেরাও, ২৪ আগস্ট দেবীবাজারের কাছে সংঘর্ষ, ১৩ সেপ্টেম্বর দোপাড়া সেতুর যুদ্ধ, যাতে শহীদ হন যোদ্ধা বিজয় পাল, এবং ৩০ অক্টোবর ও ৯ নভেম্বর গোটাপাড়া ইউনিয়নের বাবুরহাট বাজারে দুই দফা লড়াই। বাংলাপিডিয়ার বাগেরহাট সদর নিবন্ধেও পানিঘাট, দেবীর বাজার ও মাধবকাঠিতে মুক্তিযোদ্ধা ও পাকিস্তানি বাহিনীর সংঘর্ষের উল্লেখ আছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী বাহিনীটি ২৫টির বেশি সফল লড়াই করেছিল। প্রতিটি লড়াইয়ের হতাহতের সংখ্যা এসেছে মূলত মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিনির্ভর বই থেকে; স্বাধীন নথিতে সেগুলো যাচাইয়ের সুযোগ আমাদের হয়নি, তাই এখানে সংখ্যাগুলো বাদ রাখা হলো।
রফিকুল ইসলাম খোকন মারা যান ২০০১ সালের ২৪ অক্টোবর, আর বাহিনীর সেকেন্ড-ইন-কমান্ড শেখ আনিসুর রহমান ২০০৮ সালের ২১ মে। সদর উপজেলা পোর্টালের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে খোকনের নাম আছে। শহরের ঠিক ওপারের বিষ্ণুপুর-চিরুলিয়া তাই বাগেরহাটের মুক্তিযুদ্ধের মানচিত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ নাম।