মোংলা বন্দরকে দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথের সঙ্গে যুক্ত রাখার পুরোনো পথ মোংলা-ঘষিয়াখালী চ্যানেল। দ্য ডেইলি স্টারে ২০১৪ সালে প্রকাশিত এক নিবন্ধ অনুযায়ী, ২২ কিলোমিটারের এই নৌপথ আনুষ্ঠানিকভাবে খোলা হয়েছিল ১৯৭৩ সালের নভেম্বরে; পরের প্রতিবেদনগুলোতে খননযোগ্য চ্যানেলের দৈর্ঘ্য ৩১ কিলোমিটার বলা হয়েছে। বিআইডব্লিউটিএর তৎকালীন চেয়ারম্যান ২০১৪ সালে বলেছিলেন, গত ৪০ বছরে পথটি কখনো খনন করা হয়নি। স্যাটেলাইট ছবিতে ২০১০ সালেও এতে জাহাজ চলতে দেখা যায়, কিন্তু ২০১৩ সালের মধ্যে তা ভরাট হয়ে যায়।
চ্যানেলটি নাব্যতা হারাতে থাকায় এক দশকের বেশি সময় ধরে জাহাজগুলো বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করছিল সুন্দরবনের ভেতরের শেলা নদী। ডেইলি স্টার জানায়, বন বিভাগের আপত্তি সত্ত্বেও বিআইডব্লিউটিএ এই পথ ব্যবহারের অনুমতি দেয়, আর ২০১২ সালে বাংলাদেশ-ভারত নৌ-প্রটোকল পুনরুজ্জীবিত হওয়ার পর এ পথে চলাচল আরও বাড়ে। পরিবেশবাদীরা শুরু থেকেই বনের ভেতর দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিয়ে সতর্ক করে আসছিলেন।
২০১৪ সালের ৯ ডিসেম্বর ভোরে ঘন কুয়াশার মধ্যে সেই আশঙ্কাই সত্যি হয়। দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৬৬৪ লিটার ফার্নেস অয়েল বোঝাই ট্যাংকার ‘ওটি সাউদার্ন স্টার-৭’ সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের মৃগমারী এলাকায় শেলা নদীতে ‘এমভি টোটাল’ নামের একটি কার্গো জাহাজের ধাক্কায় ডুবে যায়। উইকিপিডিয়ায় সংকলিত তথ্যমতে, সাতজন নাবিক সাঁতরে তীরে ওঠেন, কিন্তু ট্যাংকারের মাস্টার মারা যান। জোয়ার-ভাটায় তেল ছড়িয়ে পড়ে খাল আর বনের কিনারে; ফরাসি সংস্থা সেদ্রের হিসাবে প্রায় ৮০ কিলোমিটার তটরেখা আক্রান্ত হয়।
তেল ব্যবস্থাপনার সরকারি সক্ষমতা কম থাকায় তেল তোলার প্রধান ভরসা হয়ে ওঠেন স্থানীয় মানুষ। স্পঞ্জ, বস্তা, বালতি, কাপড় আর মাছ ধরার জাল দিয়ে হাতে হাতে তেল তোলেন তাঁরা; পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিটারপ্রতি ৩০ টাকায় সেই তেল কিনে নেয়। সুরক্ষাসামগ্রী ছাড়া কাজ করায় অনেকের চর্মরোগসহ নানা স্বাস্থ্য-সমস্যা দেখা দেয়। রাসায়নিক দিয়ে তেল ছত্রভঙ্গ করার পরিকল্পনা বন ও প্রাণীর ক্ষতির আশঙ্কায় বাদ দেওয়া হয়। জাতিসংঘের একটি দল এসে পরিস্থিতি দেখে। প্রায় ৫২ ঘণ্টা পর ডুবন্ত ট্যাংকারটি তোলা হয়।
দুর্ঘটনার পর শেলা নদী নৌযানের জন্য বন্ধ করা হয়; তবু ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের তথ্যমতে ২০১৫ সালের মে মাসে সারবাহী আর ২০১৬ সালের মার্চে কয়লাবাহী জাহাজডুবির ঘটনা ঘটে, আর ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্র পথটি স্থায়ীভাবে বন্ধের তাগিদ দেয়। বিকল্প হিসেবে ঘষিয়াখালী চ্যানেলের খনন জোরদার হয়: ২০১৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ১ কোটি ৭৮ লাখ ৪০ হাজার ঘনমিটার পলি সরানো হয়, আর ২০১৫ সালের অক্টোবর থেকে এক বছরে প্রায় ৩৫ হাজার নৌযান চ্যানেলটি ব্যবহার করে। ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সে পুনঃখনন করা চ্যানেলটি উদ্বোধন করেন। শেলার কালো ডিসেম্বর মনে করিয়ে দেয়, একটি নৌপথের অবহেলা কীভাবে পুরো সুন্দরবনকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।