বনদস্যুর ছায়া থেকে আত্মসমর্পণ: মোংলায় শুরু হওয়া এক অধ্যায়

প্রমাণিত ইতিহাসস্বাধীন বাংলাদেশ২০১৬–২০১৮ (এবং পরবর্তী সময়)মোংলা ও সুন্দরবন

জেলে, বাওয়ালি আর মৌয়ালদের অপহরণ ও মুক্তিপণের আতঙ্ক ছিল সুন্দরবনের পুরোনো বাস্তবতা। ২০১৬ সালে মোংলায় একটি দস্যুবাহিনীর আত্মসমর্পণ দিয়ে শুরু হওয়া প্রক্রিয়া, ২০১৮ সালের ‘দস্যুমুক্ত’ ঘোষণা আর তার পরের গল্প।

সুন্দরবনের জীবিকা মানেই ঝুঁকি: বাঘ, কুমির, ঝড়, আর মানুষের তৈরি আরেক বিপদ, বনদস্যু। ‘অমুক বাহিনী’ নামে পরিচিত সশস্ত্র দলগুলো গভীর বনে জেলে, কাঠুরে আর মৌয়ালদের ট্রলারে হামলা চালাত, মুক্তিপণের জন্য জেলেদের অপহরণ করত (দ্য ডেইলি স্টার, ২০১৬)। এ ভয় যে পুরোনো, তার আভাস মেলে বাংলাপিডিয়ার বাওয়ালি-বিবরণে: গোলপাতা কাটার মৌসুমে বাওয়ালিরা জলদস্যুর ভয়ে দল বেঁধে বড় নৌকায় থাকেন। টিবিএসের ভাষায়, শত শত বছর ধরেই দস্যুতা সুন্দরবনকে তাড়া করেছে।

পালাবদলের শুরু মোংলায়। প্রথম আলোর ইংরেজি সংস্করণের ২০১৬ সালের ২৯ মে তারিখের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সুন্দরবনের কুখ্যাত দস্যুদল ‘মাস্টার বাহিনী’র প্রধানসহ আটজন মোংলা উপজেলার চরপুটিয়া এলাকায় র‌্যাব-৮-এর কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং ৪৪টি আগ্নেয়াস্ত্র ও কয়েক হাজার গুলি জমা দেয়; অনুষ্ঠানে ছিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও র‌্যাবের মহাপরিচালক। দ্য ডেইলি স্টারের পরের এক প্রতিবেদনে এই আত্মসমর্পণে দলনেতাসহ ১০ জনের কথা এবং তারিখ ৩১ মে বলা হয়েছে, অর্থাৎ খুঁটিনাটি নিয়ে সূত্রভেদ আছে। টিবিএস জানায়, দস্যুদের আত্মসমর্পণে মধ্যস্থতা করেছিলেন সাংবাদিক মোহসীন-উল হাকিম।

এরপর একে একে অন্য বাহিনীগুলো অস্ত্র ছাড়ে। টিবিএসের হিসাবে ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ৩২টি দস্যু ও ডাকাত দলের ৩২৮ জন অস্ত্র জমা দিয়ে গ্রামে ও নদীবন্দরে ফিরে যান। আত্মসমর্পণকারীদের পুনর্বাসনে সহায়তা দেওয়া হয়; সাবেক এক দস্যুনেতা টিবিএসকে বলেছেন, প্রত্যেকে এক লাখ ২০ হাজার টাকা আর ঘর, দোকান বা গরু পেয়েছিলেন, যদিও তাঁর মতে তা ছিল কোনোমতে টিকে থাকার মতো। কারও কারও মামলাও প্রত্যাহার করা হয়।

শেষ পর্বটি হয় ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর, বাগেরহাটের শেখ হেলাল উদ্দীন স্টেডিয়ামে। ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, সেদিন ছয়টি বাহিনীর ৫৪ জন সদস্য ৫৮টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৩ হাজার ৩৫১টি গুলি জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করেন, আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়ে সুন্দরবনকে ‘দস্যুমুক্ত’ ঘোষণা করেন। একই প্রতিবেদনে আগের বছরগুলোতে ২৯টি বাহিনীর ২৭৪ জনের আত্মসমর্পণ এবং ৪০৪টি আগ্নেয়াস্ত্র জমা পড়ার কথাও আছে।

তবে গল্পটি এখানেই থামেনি। টিবিএসের ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদন বলছে, আত্মসমর্পণকারীদের বেশির ভাগ স্বাভাবিক জীবনে থাকলেও হাতে গোনা কয়েকজন আবার বনে ফিরেছে; জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে ১০-১৫টি দস্যুদল নতুন করে সক্রিয় হয়ে জেলে, মৌয়াল ও বাওয়ালিদের অপহরণ শুরু করেছে। কোস্টগার্ডের হিসাবে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২৬টি অভিযানে ৩৭টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার এবং ৪৪ জন দস্যু ও সহযোগীকে আটক করা হয়েছে। মোংলায় শুরু হওয়া শান্তির অধ্যায় তাই এখনো অসম্পূর্ণ।

তথ্যসূত্র

  1. Sundarbans robber gang ‘Master Bahini’ surrenders · Prothom Alo English, ২০১৬
  2. Members of 2 Sundarbans robber gangs surrender · The Daily Star, ২০১৬
  3. PM Hasina declares Sundarbans pirate-free · Dhaka Tribune, ২০১৮
  4. Pirates of the Sundarbans: Fragile peace holds, but for how long? · The Business Standard, ২০২৫
  5. বাওয়ালি · বাংলাপিডিয়া

কোনো তথ্য ভুল মনে হলে বা আরও ভালো সূত্র জানা থাকলে নিচে জানান; যাচাই করে ঠিক করা হবে।

মোংলা-এর আরও গল্প

সব দেখুন
জয়মনির ঘোল থেকে মোংলা: একটি বন্দরের জন্মকথা১৯৫০ সালের ডিসেম্বরে সুন্দরবনের ভেতরে পশুর নদীতে নোঙর ফেলেছিল একটি ব্রিটিশ জাহাজ। সেখান থেকে চালনা ঘুরে বন্দরটি কীভাবে শেলাবুনিয়া নামের এক অচেনা গ্রামে এসে ‘মোংলা’ হলো, এ তারই গল্প।প্রমাণিত ইতিহাসশেলাবুনিয়ার ফাদার রিগন: ইতালি থেকে আসা এক বাঙালিইতালির এক গ্রামে জন্ম, কিন্তু জীবনের প্রায় পুরোটা কেটেছে মোংলার শেলাবুনিয়ায়। রবীন্দ্রনাথকে ইতালীয় ভাষায় নিয়ে যাওয়া, একাত্তরে আহত মুক্তিযোদ্ধার চিকিৎসা আর মৃত্যুর পর বাংলার মাটিতে ফেরার গল্প।প্রমাণিত ইতিহাসরুদ্রের মিঠেখালী: ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’-এর কবির শেকড়আশির দশকের কবিতার মঞ্চ কাঁপানো রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর শৈশব কেটেছে মোংলার মিঠেখালীতে। সেখানে তিনি গানের দল গড়েছেন, সেখানেই তিনি চিরঘুমে।প্রমাণিত ইতিহাসঅপারেশন জ্যাকপট: মোংলা বন্দরে নৌ-কমান্ডোদের রাতহাতে শুধু ছুরি, সঙ্গে লিমপেট মাইন। ১৯৭১ সালের ১৫ আগস্ট মধ্যরাতে চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, নারায়ণগঞ্জের সঙ্গে একযোগে মোংলা বন্দরেও আঘাত হানে বাঙালি নৌ-কমান্ডোরা।প্রমাণিত ইতিহাস