সুন্দরবনের জীবিকা মানেই ঝুঁকি: বাঘ, কুমির, ঝড়, আর মানুষের তৈরি আরেক বিপদ, বনদস্যু। ‘অমুক বাহিনী’ নামে পরিচিত সশস্ত্র দলগুলো গভীর বনে জেলে, কাঠুরে আর মৌয়ালদের ট্রলারে হামলা চালাত, মুক্তিপণের জন্য জেলেদের অপহরণ করত (দ্য ডেইলি স্টার, ২০১৬)। এ ভয় যে পুরোনো, তার আভাস মেলে বাংলাপিডিয়ার বাওয়ালি-বিবরণে: গোলপাতা কাটার মৌসুমে বাওয়ালিরা জলদস্যুর ভয়ে দল বেঁধে বড় নৌকায় থাকেন। টিবিএসের ভাষায়, শত শত বছর ধরেই দস্যুতা সুন্দরবনকে তাড়া করেছে।
পালাবদলের শুরু মোংলায়। প্রথম আলোর ইংরেজি সংস্করণের ২০১৬ সালের ২৯ মে তারিখের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সুন্দরবনের কুখ্যাত দস্যুদল ‘মাস্টার বাহিনী’র প্রধানসহ আটজন মোংলা উপজেলার চরপুটিয়া এলাকায় র্যাব-৮-এর কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং ৪৪টি আগ্নেয়াস্ত্র ও কয়েক হাজার গুলি জমা দেয়; অনুষ্ঠানে ছিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও র্যাবের মহাপরিচালক। দ্য ডেইলি স্টারের পরের এক প্রতিবেদনে এই আত্মসমর্পণে দলনেতাসহ ১০ জনের কথা এবং তারিখ ৩১ মে বলা হয়েছে, অর্থাৎ খুঁটিনাটি নিয়ে সূত্রভেদ আছে। টিবিএস জানায়, দস্যুদের আত্মসমর্পণে মধ্যস্থতা করেছিলেন সাংবাদিক মোহসীন-উল হাকিম।
এরপর একে একে অন্য বাহিনীগুলো অস্ত্র ছাড়ে। টিবিএসের হিসাবে ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ৩২টি দস্যু ও ডাকাত দলের ৩২৮ জন অস্ত্র জমা দিয়ে গ্রামে ও নদীবন্দরে ফিরে যান। আত্মসমর্পণকারীদের পুনর্বাসনে সহায়তা দেওয়া হয়; সাবেক এক দস্যুনেতা টিবিএসকে বলেছেন, প্রত্যেকে এক লাখ ২০ হাজার টাকা আর ঘর, দোকান বা গরু পেয়েছিলেন, যদিও তাঁর মতে তা ছিল কোনোমতে টিকে থাকার মতো। কারও কারও মামলাও প্রত্যাহার করা হয়।
শেষ পর্বটি হয় ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর, বাগেরহাটের শেখ হেলাল উদ্দীন স্টেডিয়ামে। ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, সেদিন ছয়টি বাহিনীর ৫৪ জন সদস্য ৫৮টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৩ হাজার ৩৫১টি গুলি জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করেন, আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়ে সুন্দরবনকে ‘দস্যুমুক্ত’ ঘোষণা করেন। একই প্রতিবেদনে আগের বছরগুলোতে ২৯টি বাহিনীর ২৭৪ জনের আত্মসমর্পণ এবং ৪০৪টি আগ্নেয়াস্ত্র জমা পড়ার কথাও আছে।
তবে গল্পটি এখানেই থামেনি। টিবিএসের ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদন বলছে, আত্মসমর্পণকারীদের বেশির ভাগ স্বাভাবিক জীবনে থাকলেও হাতে গোনা কয়েকজন আবার বনে ফিরেছে; জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে ১০-১৫টি দস্যুদল নতুন করে সক্রিয় হয়ে জেলে, মৌয়াল ও বাওয়ালিদের অপহরণ শুরু করেছে। কোস্টগার্ডের হিসাবে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২৬টি অভিযানে ৩৭টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার এবং ৪৪ জন দস্যু ও সহযোগীকে আটক করা হয়েছে। মোংলায় শুরু হওয়া শান্তির অধ্যায় তাই এখনো অসম্পূর্ণ।