বনবিবি, দুখে, দক্ষিণ রায় ও শাহ জঙ্গলির কাহিনি লোককথা। ফকিরের আচার, বাঘে মৃত্যুর পরিসংখ্যান, মধু মৌসুমের তথ্য ও ২০২৩ সালের ঘটনা দলিল ও সংবাদভিত্তিক। শরণখোলায় নির্দিষ্টভাবে কোথায় বনবিবির থান আছে, তার কোনো সূত্র পাওয়া যায়নি।
শরণখোলার পশ্চিম আর দক্ষিণজুড়ে সুন্দরবন—সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জ। উপজেলা তথ্য বাতায়নের বর্ণনায়, এখানকার মানুষের জীবিকার বড় অংশ এই বনের সঙ্গে বাঁধা: কৃষির পাশাপাশি নদী-সাগরে মাছ ধরা, আর সুন্দরবন থেকে গোলপাতা, জ্বালানি কাঠ, মধু ও কাঁকড়া সংগ্রহ। এই বনজীবীদের জীবনে সবচেয়ে বড় ভয় বাঘ, আর সবচেয়ে বড় ভরসা বিশ্বাস।
এক শতাব্দী আগেও ছবিটা প্রায় একই ছিল। ১৯০৮ সালের খুলনা জেলা গেজেটিয়ার লিখেছে, বাঘের ভয়ে কাঠুরেরা এমন এক ফকিরকে সঙ্গে না নিয়ে বনে কাজে যেত না, যিনি বাঘ বশ করতে পারেন বলে বিশ্বাস করা হতো। কাজের আগে ফকির বনের কিনারে জায়গা সাফ করে কয়েকটি ছোট কুঁড়েঘর বানিয়ে তাতে দেবদেবীর মূর্তি রাখতেন, সবাই নৈবেদ্য দিত। দলের কাউকে বাঘে নিলে ফকির সরে পড়তেন, আর অন্যদের সতর্ক করতে জায়গার কোণে কোণে পতাকা পুঁতে দেওয়া হতো। একই গেজেটিয়ার জানায়, ১৯০৫-০৬ সালে সুন্দরবনে বাঘের হাতে ১০১ জন এবং ১৯০৬-০৭ সালে ৮৩ জন মারা যান। বাংলাপিডিয়ার তথ্যে, বাঘ-বাঁধা মন্ত্র জানা ‘বাউল’দের সাহায্য নেয় বলেই কাঠুরেদের নাম হয়েছে বাওয়ালি; তাঁরা মাটি থেকে প্রায় ছয় ফুট উঁচু টোঙে রাত কাটান, আর সন্ধ্যায় সুর করে পড়েন গাজী-কালু-চম্পাবতী, বনবিবির জহুরনামা কিংবা রায়মঙ্গলের কাহিনি।
এই বিশ্বাসের কেন্দ্রে বনবিবি। লোককাহিনি অনুযায়ী, দরিদ্র মায়ের ছেলে দুখেকে মধু সংগ্রহে বনে নিয়ে যায় ধনা ও মনা নামের দুই সওদাগর। বাঘরূপী অপদেবতা দক্ষিণ রায় স্বপ্নে দুখেকে উৎসর্গ চাইলে তারা তাকে বনে ফেলে আসে; দুখের আকুল ডাকে বনবিবি এসে তাকে রক্ষা করেন এবং কুমিরের পিঠে চড়িয়ে মায়ের কাছে ফেরত পাঠান। বনবিবির ভাই শাহ জঙ্গলি দক্ষিণ রায়কে পরাস্ত করেন, আর গাজীও বনবিবির পক্ষে আসেন। প্রথম আলোর বাগেরহাট প্রতিনিধির ২০১৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পয়লা মাঘ সুন্দরবন-সংলগ্ন বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরার বহু জায়গায় বনবিবির পূজা হয়, হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের বনজীবীরাই মানত করেন। এগুলো লোকবিশ্বাস ও কিংবদন্তি, ঐতিহাসিক ঘটনা নয়।
আজকের মৌয়ালদের যাত্রাও ঝুঁকিতে ভরা। সুন্দরবন পূর্ব বিভাগে মধু আহরণের মৌসুম শুরু হয় ১ এপ্রিল। ইত্তেফাকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৫ এপ্রিল শরণখোলা থেকে ১০টি নৌকায় ৭০ জন মৌয়াল বনে রওনা দেন; বনদস্যুদের অপহরণ ও মুক্তিপণের ভয়ে সে বছর তখন পর্যন্ত শরণখোলা রেঞ্জ থেকে মাত্র ১০টি নৌকার পাস নেওয়া হয়েছিল, আগের বছর একই সময়ে যা ছিল ৬০টি। রেঞ্জটির লক্ষ্য ছিল ৩৪৯ কুইন্টাল মধু ও ১০৪ কুইন্টাল মোম, যা পূরণ হওয়া নিয়েই বন বিভাগ সংশয় প্রকাশ করেছিল।
বাঘের ভয়ও ফুরায়নি। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ধানসাগর ইউনিয়নের পশ্চিম রাজাপুরের ২২ বছরের এক জেলে একা মাছ ধরতে বনে ঢুকে আর ফেরেননি; পাঁচ দিন পর গ্রামবাসী তুলাতলা এলাকায় তাঁর দেহাবশেষ খুঁজে পান, আশপাশে ছিল বাঘের পায়ের ছাপ। বন বিভাগ জানিয়েছিল, তিনি অনুমতি ছাড়া বনে ঢুকেছিলেন। সুন্দরবনের অন্য এলাকায় বাঘের আক্রমণে স্বামী হারানো নারীদের ‘বাঘবিধবা’ বলা হয়; শরণখোলায় এমন পরিবারগুলো নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো গবেষণা বা হিসাব আমরা খুঁজে পাইনি—এই অধ্যায়টি এখনো লেখার অপেক্ষায়।