বাঘ, বনবিবি আর মধুর মৌসুম: শরণখোলার বনজীবীদের গল্প

ইতিহাস ও জনশ্রুতিলোককথাউনিশ শতক থেকে বর্তমানশরণখোলা রেঞ্জ, সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ

শরণখোলার মানুষের জীবিকা বাঁধা সুন্দরবনের সঙ্গে—মাছ, গোলপাতা, কাঠ আর মধু। এক শ বছর আগের ফকিরের বাঘ-বন্ধনের আচার থেকে বনবিবির কিংবদন্তি, আর আজকের মৌয়ালদের বনদস্যু-আতঙ্ক পর্যন্ত বনজীবীদের ভয় ও বিশ্বাসের গল্প।

বনবিবি, দুখে, দক্ষিণ রায় ও শাহ জঙ্গলির কাহিনি লোককথা। ফকিরের আচার, বাঘে মৃত্যুর পরিসংখ্যান, মধু মৌসুমের তথ্য ও ২০২৩ সালের ঘটনা দলিল ও সংবাদভিত্তিক। শরণখোলায় নির্দিষ্টভাবে কোথায় বনবিবির থান আছে, তার কোনো সূত্র পাওয়া যায়নি।

শরণখোলার পশ্চিম আর দক্ষিণজুড়ে সুন্দরবন—সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জ। উপজেলা তথ্য বাতায়নের বর্ণনায়, এখানকার মানুষের জীবিকার বড় অংশ এই বনের সঙ্গে বাঁধা: কৃষির পাশাপাশি নদী-সাগরে মাছ ধরা, আর সুন্দরবন থেকে গোলপাতা, জ্বালানি কাঠ, মধু ও কাঁকড়া সংগ্রহ। এই বনজীবীদের জীবনে সবচেয়ে বড় ভয় বাঘ, আর সবচেয়ে বড় ভরসা বিশ্বাস।

এক শতাব্দী আগেও ছবিটা প্রায় একই ছিল। ১৯০৮ সালের খুলনা জেলা গেজেটিয়ার লিখেছে, বাঘের ভয়ে কাঠুরেরা এমন এক ফকিরকে সঙ্গে না নিয়ে বনে কাজে যেত না, যিনি বাঘ বশ করতে পারেন বলে বিশ্বাস করা হতো। কাজের আগে ফকির বনের কিনারে জায়গা সাফ করে কয়েকটি ছোট কুঁড়েঘর বানিয়ে তাতে দেবদেবীর মূর্তি রাখতেন, সবাই নৈবেদ্য দিত। দলের কাউকে বাঘে নিলে ফকির সরে পড়তেন, আর অন্যদের সতর্ক করতে জায়গার কোণে কোণে পতাকা পুঁতে দেওয়া হতো। একই গেজেটিয়ার জানায়, ১৯০৫-০৬ সালে সুন্দরবনে বাঘের হাতে ১০১ জন এবং ১৯০৬-০৭ সালে ৮৩ জন মারা যান। বাংলাপিডিয়ার তথ্যে, বাঘ-বাঁধা মন্ত্র জানা ‘বাউল’দের সাহায্য নেয় বলেই কাঠুরেদের নাম হয়েছে বাওয়ালি; তাঁরা মাটি থেকে প্রায় ছয় ফুট উঁচু টোঙে রাত কাটান, আর সন্ধ্যায় সুর করে পড়েন গাজী-কালু-চম্পাবতী, বনবিবির জহুরনামা কিংবা রায়মঙ্গলের কাহিনি।

এই বিশ্বাসের কেন্দ্রে বনবিবি। লোককাহিনি অনুযায়ী, দরিদ্র মায়ের ছেলে দুখেকে মধু সংগ্রহে বনে নিয়ে যায় ধনা ও মনা নামের দুই সওদাগর। বাঘরূপী অপদেবতা দক্ষিণ রায় স্বপ্নে দুখেকে উৎসর্গ চাইলে তারা তাকে বনে ফেলে আসে; দুখের আকুল ডাকে বনবিবি এসে তাকে রক্ষা করেন এবং কুমিরের পিঠে চড়িয়ে মায়ের কাছে ফেরত পাঠান। বনবিবির ভাই শাহ জঙ্গলি দক্ষিণ রায়কে পরাস্ত করেন, আর গাজীও বনবিবির পক্ষে আসেন। প্রথম আলোর বাগেরহাট প্রতিনিধির ২০১৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পয়লা মাঘ সুন্দরবন-সংলগ্ন বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরার বহু জায়গায় বনবিবির পূজা হয়, হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের বনজীবীরাই মানত করেন। এগুলো লোকবিশ্বাস ও কিংবদন্তি, ঐতিহাসিক ঘটনা নয়।

আজকের মৌয়ালদের যাত্রাও ঝুঁকিতে ভরা। সুন্দরবন পূর্ব বিভাগে মধু আহরণের মৌসুম শুরু হয় ১ এপ্রিল। ইত্তেফাকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৫ এপ্রিল শরণখোলা থেকে ১০টি নৌকায় ৭০ জন মৌয়াল বনে রওনা দেন; বনদস্যুদের অপহরণ ও মুক্তিপণের ভয়ে সে বছর তখন পর্যন্ত শরণখোলা রেঞ্জ থেকে মাত্র ১০টি নৌকার পাস নেওয়া হয়েছিল, আগের বছর একই সময়ে যা ছিল ৬০টি। রেঞ্জটির লক্ষ্য ছিল ৩৪৯ কুইন্টাল মধু ও ১০৪ কুইন্টাল মোম, যা পূরণ হওয়া নিয়েই বন বিভাগ সংশয় প্রকাশ করেছিল।

বাঘের ভয়ও ফুরায়নি। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ধানসাগর ইউনিয়নের পশ্চিম রাজাপুরের ২২ বছরের এক জেলে একা মাছ ধরতে বনে ঢুকে আর ফেরেননি; পাঁচ দিন পর গ্রামবাসী তুলাতলা এলাকায় তাঁর দেহাবশেষ খুঁজে পান, আশপাশে ছিল বাঘের পায়ের ছাপ। বন বিভাগ জানিয়েছিল, তিনি অনুমতি ছাড়া বনে ঢুকেছিলেন। সুন্দরবনের অন্য এলাকায় বাঘের আক্রমণে স্বামী হারানো নারীদের ‘বাঘবিধবা’ বলা হয়; শরণখোলায় এমন পরিবারগুলো নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো গবেষণা বা হিসাব আমরা খুঁজে পাইনি—এই অধ্যায়টি এখনো লেখার অপেক্ষায়।

তথ্যসূত্র

  1. ভাষা ও সংস্কৃতি · শরণখোলা উপজেলা তথ্য বাতায়ন, ২০১৪
  2. Bengal District Gazetteers: Khulna · L. S. S. O'Malley, Bengal Secretariat Book Depot, Calcutta, ১৯০৮
  3. বাওয়ালি · বাংলাপিডিয়া, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি
  4. বনবিবি · প্রথম আলো (আহাদ হায়দার, বাগেরহাট), ২০১৫
  5. বনদস্যু আতঙ্কে সুন্দরবনে কমছে মৌয়াল, হুমকিতে মধু আহরণ · দৈনিক ইত্তেফাক, ২০২৬
  6. বাঘে খেয়েছে জেলের পুরো দেহ, পাওয়া গেল শুধু মাথা ও রক্তাক্ত প্যান্ট · দেশ টিভি, ২০২৩

কোনো তথ্য ভুল মনে হলে বা আরও ভালো সূত্র জানা থাকলে নিচে জানান; যাচাই করে ঠিক করা হবে।

শরণখোলা-এর আরও গল্প

সব দেখুন
খানজাহানের আগের বাগেরহাট: লবণের চুল্লি, ইটের ঘাট আর হারানো বসতিখানজাহান আলী আসার বহু আগেও সুন্দরবনের কোলে মানুষ লবণ জ্বাল দিত, ইটের ঘাট বাঁধত। কটকার ডুবে যাওয়া চুল্লি আর পুরোনো নথি সেই হারানো বসতির কথা বলে।ইতিহাস ও জনশ্রুতিবলেশ্বরের পাড়ে রায়েন্দা: বন কেটে গড়া জনপদ, বাঁধ কাটার বিদ্রোহ‘শক্তির অধিপতি’ বলেশ্বরের তীরে বরিশাল থেকে আসা মানুষেরা বন কেটে গড়েছিলেন শরণখোলা। তার প্রাণকেন্দ্র রায়েন্দা বাজার দেখেছে ১৯৬৯ সালের বাঁধ কাটার কৃষক-বিদ্রোহ, ভাসানীর জনসভা আর নদীভাঙনে বগী বন্দরের হারিয়ে যাওয়া।প্রমাণিত ইতিহাসদুবলার চরের রাস: হরিভজনের পূজা থেকে সাগরতীরের উৎসবকার্তিকের রাস পূর্ণিমায় সুন্দরবনের শেষ প্রান্তে সাগরের প্রথম জোয়ারে পুণ্যস্নান। কে শুরু করেছিলেন এই উৎসব, কেন মন্দিরে রাধাকৃষ্ণের পাশে বনবিবি আর গাজী-কালু, আর কেন এখন আর মেলা বসে না।ইতিহাস ও জনশ্রুতিএকাত্তরের শরণখোলা: কাঠের রাইফেল, রায়েন্দা ক্যাম্প আর বগীর লড়াইবাঁশের লাঠি আর কাঠমিস্ত্রির বানানো কাঠের রাইফেলে শুরু হয়েছিল শরণখোলার প্রস্তুতি। রায়েন্দা ক্যাম্পে হামলা, বগী-গাবতলার রক্তাক্ত দিন, আর বিজয় দিবসের দুই দিন পর—১৮ ডিসেম্বর—শরণখোলার পূর্ণ মুক্তি।প্রমাণিত ইতিহাস