বৈটপুরের দুই কবি: মোহাম্মদ রফিক ও আবুবকর সিদ্দিক

প্রমাণিত ইতিহাসস্বাধীন বাংলাদেশ১৯৩৪–২০২৩বৈটপুর (বেমরতা ইউনিয়ন) ও গোটাপাড়া, বাগেরহাট সদর

বাগেরহাট সদরের বৈটপুর গ্রামের শিকড় থেকে উঠে এসেছেন বাংলা কবিতার দুই উল্লেখযোগ্য নাম। একজন স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে লিখেছিলেন ‘খোলা কবিতা’, অন্যজন চার দশকে লিখেছেন আঠারোটি কাব্যগ্রন্থ।

তথ্য সংবাদপত্রের মৃত্যুসংবাদ, স্মৃতিলেখা ও উইকিপিডিয়া থেকে। জন্মসাল, শিক্ষাজীবন ও পুরস্কারের সাল নিয়ে কিছু সূত্রভেদ আছে, গল্পে উল্লেখ করা হয়েছে।

মোহাম্মদ রফিকের জন্ম ১৯৪৩ সালে বাগেরহাটের বৈটপুর গ্রামে (দ্য ডেইলি স্টার ও উইকিপিডিয়ায় তারিখ ২৩ অক্টোবর)। বিডিনিউজ২৪ জানায়, তিনি শামসুদ্দিন আহমেদ ও রেশাতুন নাহারের আট সন্তানের মধ্যে বড়। ছাত্রজীবনে পাকিস্তানি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে যুক্ত হয়ে সামরিক আদালতে দণ্ডিত হন; একাত্তরে যুদ্ধে অংশ নেন এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে কাজ করেন। পরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে শিক্ষকতা করে ২০০৯ সালে অবসর নেন।

তাঁকে সবচেয়ে বেশি মনে রাখা হয় ‘খোলা কবিতা’র জন্য। আশির দশকে সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সমালোচনা করে লেখা কবিতাটি প্রথমে কেউ ছাপতে সাহস করেনি; নিউজপ্রিন্টে গোপনে ছেপে তাঁর ছাত্রছাত্রীরা তা ছড়িয়ে দেন, আর দেশজুড়ে তা হাতে হাতে ঘোরে। এর জেরে তাঁকে সেনানিবাসে তলব করা হয়, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়, কিছুদিন তাঁকে আত্মগোপনে থাকতে হয়। ‘খোলা কবিতা ও কপিলা’ বই আকারে বের হয় ১৯৮৩ সালে। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘বৈশাখী পূর্ণিমা’ (১৯৭০); পরে ‘কীর্তিনাশা’, ‘কপিলা’, ‘মৎস্যগন্ধা’, ‘কালাপানি’সহ বহু বই। বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান (বিডিনিউজ২৪-এ ১৯৮৬, ডেইলি স্টারে ১৯৮৭), একুশে পদক ২০১০ সালে। ২০২৩ সালের ৬ আগস্ট বাগেরহাটের বাড়িতে অসুস্থ হয়ে ঢাকায় নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়; পরদিন বেমরতা ইউনিয়নের চিতলী-বৈটপুরে তাঁর প্রতিষ্ঠিত একটি বিদ্যালয়ের মাঠে, মা-বাবার পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

একই বৈটপুরের সন্তান আবুবকর সিদ্দিক। বিডিনিউজ২৪ অনুযায়ী তাঁর জন্ম ১৯৩৪ সালের ১৯ আগস্ট বাগেরহাট সদরের গোটাপাড়ায়, নানাবাড়িতে; পৈতৃক বাড়ি বৈটপুর (প্রথম আলো জন্মসাল লিখেছে ১৯৩৬)। বাবার সরকারি চাকরির সূত্রে শৈশব কেটেছে হুগলি আর বর্ধমানে, পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় প্রথম কবিতা ছাপা হয়। পরে বাগেরহাট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও পিসি কলেজে পড়ে ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এমএ করেন। পিসি কলেজ, ফকিরহাট কলেজ, বিএল কলেজসহ নানা কলেজ ঘুরে দীর্ঘদিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে পড়ান।

দ্য ডেইলি স্টার বাংলার এক স্মৃতিলেখা জানায়, ১৯৬৯ সালে প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ধবল দুধের স্বরগ্রাম’ থেকে ২০১০ সালের ‘হাওরের হাহাকার’ পর্যন্ত চার দশকে তাঁর আঠারোটি কাব্যগ্রন্থ বেরিয়েছে; উপন্যাস ‘জলরাক্ষস’, ‘খরাদাহ’, ‘একাত্তরের হৃদয়ভস্ম’ আর গল্পগ্রন্থ ‘চরবিনাশকাল’ও তাঁর লেখা। সেই লেখায় বৈটপুরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া দড়াটানা নদীর কথাও আছে। ১৯৮৮ সালে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান। জীবনের শেষ দশকটা কাটান খুলনায়; ২০২৩ সালের ২৮ ডিসেম্বর সেখানেই মৃত্যু, দাফন টুটপাড়া কবরস্থানে।

একই গ্রামের দুই কবি—একজন রাজপথের প্রতিবাদের ভাষা দিয়েছেন, অন্যজন ভাটি বাংলার মাটি-মানুষের জীবন তুলে এনেছেন গদ্যে-পদ্যে। বাগেরহাটের সাহিত্যিক মানচিত্রে বৈটপুর তাই আলাদা করে চিহ্নিত হওয়ার দাবি রাখে।

তথ্যসূত্র

  1. কবি মোহাম্মদ রফিকের চিরবিদায় · বিডিনিউজ২৪, ২০২৩
  2. বাবা-মায়ের পাশে চিরনিদ্রায় কবি মোহাম্মদ রফিক · বিডিনিউজ২৪, ২০২৩
  3. কবি মোহাম্মদ রফিক মারা গেছেন · দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, ২০২৩
  4. Mohammad Rafiq (poet) · উইকিপিডিয়া (ইংরেজি), ২০২৬
  5. কবি আবুবকর সিদ্দিক আর নেই · প্রথম আলো, ২০২৩
  6. কবি আবুবকর সিদ্দিকের মৃত্যু · বিডিনিউজ২৪, ২০২৩
  7. দুঃখী মানুষের ভাষ্যকার (সৈকত আরেফিন) · দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, ২০২৪

কোনো তথ্য ভুল মনে হলে বা আরও ভালো সূত্র জানা থাকলে নিচে জানান; যাচাই করে ঠিক করা হবে।

বাগেরহাট সদর-এর আরও গল্প

সব দেখুন
সমাধির পাথরে লেখা শেষ কথাখানজাহানের সমাধিবেদির পাথরই তাঁর সম্পর্কে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য দলিল। সেখানে তিনি নিজেকে বলেছেন বৃদ্ধ, দুর্বল এক প্রবাসী—আর লিখে রেখেছেন মৃত্যুর তারিখ।প্রমাণিত ইতিহাসখলিফাতাবাদ: খানজাহানের পরের টাকশাল-শহর আর মোগল ‘সরকার’খানজাহানের মৃত্যুর পরও খলিফাতাবাদ হারিয়ে যায়নি। সুলতানদের মুদ্রায় এর নাম উঠেছে, মোগল রাজস্বের খাতায় এটি ছিল আস্ত এক ‘সরকার’—আর বাগেরহাটের ‘দশানী’ নামেও হয়তো লুকিয়ে আছে সেই হিসাবের ছাপ।প্রমাণিত ইতিহাসপ্রতাপাদিত্য, ফিরিঙ্গি আর মগ: বারো ভূঁইয়ার যুগে বাগেরহাটষোড়শ-সপ্তদশ শতকে যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজ্য ছুঁয়ে ছিল আজকের বাগেরহাট; একই সময়ে পর্তুগিজ ‘ফিরিঙ্গি’ আর আরাকানি মগ জলদস্যুর হানায় উজাড় হয়েছিল দক্ষিণের বহু জনপদ। কোনটা প্রমাণিত, কোনটা জনশ্রুতি?ইতিহাস ও জনশ্রুতিভৈরবের বাঁকে বাঁকে: নদী, হাট আর নৌপথের বাগেরহাটএকসময় বাগেরহাটে চলাফেরা মানেই ছিল নৌকা। কলকাতাগামী ধানের জাহাজ, মোড়েলগঞ্জের বন্দর, স্টিমারের হুইসেল—মরে আসা ভৈরব আর বদলে যাওয়া নদীপথের গল্প।প্রমাণিত ইতিহাস