খানজাহান আসলে কে ছিলেন?

ইতিহাস ও জনশ্রুতিসুলতানি আমল ও খান জাহানপনের শতক (মৃত্যু ১৪৫৯)খলিফাতাবাদ (বর্তমান বাগেরহাট সদর)

যাঁকে আমরা ‘খানজাহান আলী’ নামে চিনি, তাঁর সমাধিলিপিতে ‘আলী’ শব্দটিই নেই। ইতিহাস তাঁর সম্পর্কে কতটুকু জানে, আর কতটুকু গড়ে উঠেছে মানুষের মুখে মুখে?

নথিভুক্ত: সমাধিলিপির উপাধি (উলুঘ খানজাহান, খান-ই-আযম) ও ৮৬৩ হিজরি/১৪৫৯ সালে মৃত্যু। জৌনপুরের খাজা জাহানের সঙ্গে অভিন্নতা সতীশচন্দ্র মিত্রের অনুমান। বারোজন থেকে ৩৬০ সঙ্গী, ৬০ হাজার মাটিকাটা লোক এবং আকবরের সভাসদ হওয়ার গল্প জনশ্রুতি।

বাগেরহাটের মানুষের কাছে তিনি হযরত খানজাহান আলী (র.)—সাধক, শাসক, মসজিদ আর দিঘির নির্মাতা। কিন্তু তাঁর সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্যের প্রধান উৎস একটিই: বাগেরহাটে তাঁর সমাধির পাথরে খোদাই করা লিপি। জেলা তথ্য বাতায়ন ও বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী সেখানে তাঁকে ‘উলুঘ খানজাহান’ ও ‘খান-ই-আযম’ উপাধিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯০৮ সালের খুলনা জেলা গেজেটিয়ারে এল. এস. এস. ও’ম্যালি লক্ষ করেছিলেন, লোকমুখের ‘খানজাহান আলী’ বা ‘খাঞ্জালি’ নামটি লিপিতে নেই; সেখানে তিনি কেবল ‘খানজাহান’ উপাধিতেই পরিচিত। অর্থাৎ তাঁর আসল নাম আজও অজানা।

উপাধি থেকে কিছুটা আন্দাজ করা যায়। ‘উলুঘ’ তুর্কি শব্দ; জেলা তথ্য বাতায়নের মতে এটি পারিবারিক উপাধি, যা তুর্কি বংশের ইঙ্গিত দেয়। ইউনেস্কোও তাঁকে ‘তুর্কি সেনাপতি’ বলেছে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী তিনি দিল্লির তুঘলক সুলতানদের একজন আমির ছিলেন এবং সম্ভবত ১৩৯৮ সালে তৈমুরের দিল্লি আক্রমণের পর বাংলায় আসেন। প্রথমে দিল্লির, পরে বাংলার সুলতানের কাছ থেকে তিনি সুন্দরবনের জঙ্গল জায়গির হিসেবে পান এবং গৌড়ের সুলতান নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহের আমলে খলিফাতাবাদ শাসন করেন। ‘খান-ই-আযম’ উপাধি দেখে বাংলাপিডিয়ার মত, তিনি স্বাধীন শাসক ছিলেন না, গৌড়ের সুলতানের অনুগত ছিলেন। তাঁর নিজের নামে কোনো মুদ্রাও পাওয়া যায়নি—সতীশচন্দ্র মিত্র ১৯১৪ সালেই এ কথা লিখেছিলেন।

পরিচয় নিয়ে আরও অনুমান আছে। ঢাকার একটি মসজিদের ১৪৫৯ সালের শিলালিপিতে ‘খাজা জাহান’ উপাধিধারী এক খানের নাম দেখে পণ্ডিত ব্লকম্যান তাঁকে বাগেরহাটের খানজাহানের সঙ্গে অভিন্ন হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন বলে গেজেটিয়ারে উল্লেখ আছে। ‘যশোহর-খুলনার ইতিহাস’-এ সতীশচন্দ্র মিত্র আরও এগিয়ে অনুমান করেন, তিনি জৌনপুর রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা খাজা জাহানই। মিত্র নিজেই এটিকে অনুমান বলেছেন; বাংলাপিডিয়ায় এ মতের উল্লেখ নেই। ডেইলি স্টারের এক গবেষণাধর্মী লেখায় ‘উলুঘ’ শব্দ থেকে উজবেক বংশের সম্ভাবনার কথাও এসেছে, তবে সেখানেও স্বীকার করা হয়েছে, তাঁর প্রথম জীবনের প্রায় কিছুই লিখিত নেই।

লিখিত তথ্যের এই ফাঁকা জায়গা ভরিয়েছে লোককথা। জনশ্রুতি আছে, তিনি বারোজন সঙ্গী নিয়ে যশোরের বারোবাজারে এসেছিলেন, আর বাগেরহাটে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সঙ্গী হয় ৩৬০ জন আউলিয়া। ১৮৭১ সালে যশোরের কালেক্টর জেমস ওয়েস্টল্যান্ডকে সেনহাটির লোকেরা বলেছিলেন, তিনি ৬০ হাজার মাটিকাটা লোক সঙ্গে এনেছিলেন। গেজেটিয়ারে আরেকটি গল্প আছে—তিনি নাকি সম্রাট আকবরের সভাসদ ছিলেন, ঘুমন্ত সম্রাটকে বাতাস করার সময় এক সন্ন্যাসীর আশীর্বাদ পান। ১৪৫৯ সালে মারা যাওয়া মানুষের পক্ষে ষোল শতকের আকবরের দরবারে থাকা অসম্ভব; গেজেটিয়ার নিজেই একে কালবিভ্রাট বলেছে।

তাহলে নিশ্চিতভাবে কী জানা যায়? ওয়েস্টল্যান্ড ও মিত্র দুজনেই লিখেছেন, সমাধিলিপিতে তাঁকে এ দেশে এক ‘প্রবাসী’ বলা হয়েছে; তিনি বৃদ্ধ বয়সে ৮৬৩ হিজরিতে, অর্থাৎ ১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দে মারা যান; আর তাঁর আমলের মসজিদ, দিঘি ও রাস্তা আজও টিকে আছে। বাকিটা—অলৌকিক ক্ষমতা, ৩৬০ সঙ্গী, কুমির পোষা—শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের ভক্তি আর কল্পনায় গড়া গল্প, যা একজন সেনানায়ক ও প্রশাসককে লোকের মনে ‘পীর’-এ পরিণত করেছে।

গল্পের জায়গাগুলো

তথ্যসূত্র

  1. Khan Jahan · বাংলাপিডিয়া (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ), ২০২১
  2. খান জাহান · বাংলাপিডিয়া (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ), ২০১৫
  3. হযরত খানজাহান আলী (রঃ) ও তাঁর মাজার · বাগেরহাট জেলা তথ্য বাতায়ন, ২০১৯
  4. Historic Mosque City of Bagerhat (Outstanding Universal Value) · UNESCO World Heritage Centre, ১৯৮৫
  5. যশোহর-খুলনার ইতিহাস, প্রথম খণ্ড — সতীশচন্দ্র মিত্র · চক্রবর্তী চ্যাটার্জি অ্যান্ড কোং, কলকাতা (ইন্টারনেট আর্কাইভে সংরক্ষিত), ১৯১৪
  6. A Report on the District of Jessore: Its Antiquities, Its History, and Its Commerce — J. Westland · ইন্টারনেট আর্কাইভ (মূল প্রতিবেদন, কলকাতা), ১৮৭১
  7. Bengal District Gazetteers: Khulna — L. S. S. O'Malley · ইন্টারনেট আর্কাইভ (মূল প্রকাশ, কলকাতা), ১৯০৮
  8. Trails of Khan Jahan Ali · দ্য ডেইলি স্টার, ২০১৯

কোনো তথ্য ভুল মনে হলে বা আরও ভালো সূত্র জানা থাকলে নিচে জানান; যাচাই করে ঠিক করা হবে।

বাগেরহাট সদর-এর আরও গল্প

সব দেখুন
সমাধির পাথরে লেখা শেষ কথাখানজাহানের সমাধিবেদির পাথরই তাঁর সম্পর্কে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য দলিল। সেখানে তিনি নিজেকে বলেছেন বৃদ্ধ, দুর্বল এক প্রবাসী—আর লিখে রেখেছেন মৃত্যুর তারিখ।প্রমাণিত ইতিহাসখলিফাতাবাদ: খানজাহানের পরের টাকশাল-শহর আর মোগল ‘সরকার’খানজাহানের মৃত্যুর পরও খলিফাতাবাদ হারিয়ে যায়নি। সুলতানদের মুদ্রায় এর নাম উঠেছে, মোগল রাজস্বের খাতায় এটি ছিল আস্ত এক ‘সরকার’—আর বাগেরহাটের ‘দশানী’ নামেও হয়তো লুকিয়ে আছে সেই হিসাবের ছাপ।প্রমাণিত ইতিহাসপ্রতাপাদিত্য, ফিরিঙ্গি আর মগ: বারো ভূঁইয়ার যুগে বাগেরহাটষোড়শ-সপ্তদশ শতকে যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজ্য ছুঁয়ে ছিল আজকের বাগেরহাট; একই সময়ে পর্তুগিজ ‘ফিরিঙ্গি’ আর আরাকানি মগ জলদস্যুর হানায় উজাড় হয়েছিল দক্ষিণের বহু জনপদ। কোনটা প্রমাণিত, কোনটা জনশ্রুতি?ইতিহাস ও জনশ্রুতিভৈরবের বাঁকে বাঁকে: নদী, হাট আর নৌপথের বাগেরহাটএকসময় বাগেরহাটে চলাফেরা মানেই ছিল নৌকা। কলকাতাগামী ধানের জাহাজ, মোড়েলগঞ্জের বন্দর, স্টিমারের হুইসেল—মরে আসা ভৈরব আর বদলে যাওয়া নদীপথের গল্প।প্রমাণিত ইতিহাস