বাগেরহাটে উচ্চশিক্ষার স্বপ্নের শুরু একটি সভা থেকে। সরকারি প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজের ওয়েবসাইট জানায়, শিক্ষানুরাগী মানুষের চেষ্টায় ১৯১৫ সালে কাড়াপাড়া গ্রামে একটি শিক্ষক সম্মেলন হয়, যাতে সভাপতিত্ব করেন বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। ১৮৬১ সালে তখনকার যশোর জেলার রাড়ুলি-কাটিপাড়া গ্রামে (বর্তমান খুলনার পাইকগাছা) জন্ম নেওয়া এই রসায়নবিদ বেঙ্গল কেমিক্যালস অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যালসের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তখনই খ্যাত।
১৯১৭ সালের শুরুর দিকে কাড়াপাড়া শরৎচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের এক অনুষ্ঠানে কলেজের দাবি প্রথম সরাসরি ওঠে; প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জে ভাস (J. Vass, ICS), আর জনগণের পক্ষে দাবি তোলেন সৈয়দ সুলতান আলী। একই বছরের ২৮ অক্টোবর দশানীর জমিদার গোপালচন্দ্র বিশ্বাসের বাড়িতে হাবেলী খলিফাতাবাদের এক সভায় নেওয়া হয় বাস্তব পদক্ষেপ। কাড়াপাড়ার জমিদার বংশের অশ্বিনী কুমার রায়চৌধুরী, হেমচন্দ্র রায়চৌধুরীসহ অনেকে এতে যুক্ত হন। কলেজের জায়গা ঠিক হয় হরিণখানা গ্রামে; কলেজের তথ্যমতে জমি দেন শেখ মো. কাসেম আলী ও তাঁর ভাই শেখ মো. সাবেদ আলী। প্রথম আলোর ২০১৭ সালের প্রতিবেদনে আছে, হরিণখানার শ্রমজীবী বাসিন্দারা ১২ বিঘা জমি বিনা মূল্যে প্রফুল্লচন্দ্রকে দিয়েছিলেন।
প্রফুল্লচন্দ্র কলেজ গড়ার আশ্বাস দেন। ১৯১৮ সালের ৮ আগস্ট শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগ হয়, পরদিন ৯ আগস্ট কলা বিভাগের পাঠদানের মধ্য দিয়ে ‘বাগেরহাট কলেজ’-এর যাত্রা শুরু। প্রথম আলোর ভাষ্যে ওই দিনই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজটিকে স্বীকৃতি দেয়, যদিও কলেজের ওয়েবসাইটে অনুমোদনের সাল ১৯২১ লেখা। প্রথম অধ্যক্ষ হন বিএল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ কামাখ্যাচরণ নাগ। প্রথম আলো জানায়, প্রফুল্লচন্দ্রের অনুরোধেই ‘ঋষি’ কামাখ্যাচরণ এই দায়িত্ব নেন এবং প্রায় ২২ বছর অধ্যক্ষ ছিলেন; বাংলা, ইংরেজি, সংস্কৃত থেকে গণিত, অর্থনীতি, দর্শন পর্যন্ত বহু বিষয় পড়াতে পারতেন তিনি।
কলেজের বিজ্ঞানাগার গড়ে ওঠে প্রফুল্লচন্দ্রের বেঙ্গল কেমিক্যাল থেকে বিনা মূল্যে আনা যন্ত্রপাতিতে। শহরে তখনো বিদ্যুৎ আসেনি, তাই ডায়নামো দিয়ে কলেজে আলো জ্বালানো হতো। ১৯২২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ট্রাস্টি বোর্ড পুকুর খননের সিদ্ধান্ত নেয়, আর ১৯৩৫ সালে মঘিয়ার জমিদার রামনারায়ণ রায়চৌধুরীর দেওয়া অর্থে তৈরি হয় ‘রামনারায়ণ পার্ক’। কলেজের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠা থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত নাম ছিল বাগেরহাট কলেজ; এরপর পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তে নাম বদলে রাখা হয় প্রফুল্লচন্দ্র কলেজ বা পি.সি. কলেজ। প্রতিষ্ঠার নেতৃত্ব, অধ্যক্ষ জোগাড় থেকে বিজ্ঞানাগারের যন্ত্রপাতি পর্যন্ত তাঁর অবদানের স্বীকৃতিই এই নাম।
১৯২৪ সালের মধ্যেই ইংরেজি, গণিত, ইতিহাস ও সংস্কৃতে অনার্স পড়ানো শুরু হয়। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে কলেজটি সরকারি হয় ১৯৭৯ সালের ৭ মে। এ কলেজে শিক্ষকতা করেছেন একাত্তরের শহীদ অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন, কথাসাহিত্যিক আবুবকর সিদ্দিক এবং অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের বাবা আজিমউদ্দিন আহমদ। প্রায় ২০ একরের ক্যাম্পাসে আজ হাজারো শিক্ষার্থী পড়ে; ২০১৭ সালে শতবর্ষের দিনটিও পালনের কথা ছিল শোভাযাত্রা আর আচার্যের ভাস্কর্যে ফুল দিয়ে।