দিঘি খননে মন্দির ও সাধু পাওয়া, ব্রাহ্মণ বালকের মূর্তি বয়ে নেওয়া—এগুলো জনশ্রুতি। শিববাড়ীতে একটি পাথরের মূর্তি পূজিত হওয়া এবং তা দিঘি থেকে পাওয়া বলে বিশ্বাস ১৯০৮ ও ১৯১৪ সালের সূত্রে নথিভুক্ত; মূর্তিটি বৌদ্ধ, এটি মিত্রের শনাক্তকরণ। মূর্তির বর্তমান অবস্থা যাচাই করা যায়নি।
খানজাহানের সমাধির দক্ষিণে বিশাল দিঘি—সরকারি নথিতে খাঞ্জেলী দিঘি, লোকমুখে ঠাকুর দিঘি। একজন মুসলিম সাধকের দিঘির নাম ‘ঠাকুর’ হলো কীভাবে? এর পেছনে আছে খোঁড়ার সময়ের এক রহস্যময় কাহিনি, যা দেড়শ বছর আগেই লিখে রাখা হয়েছিল। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে দিঘিটি আনুমানিক ১৪৫০ সালের। ১৮৬০-এর দশকে বাগেরহাটের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট গৌরদাস বসাক শুকনো মৌসুমে এর পানির অংশ মেপেছিলেন প্রায় ১,৫৬০ ফুট বর্গ, যা জেমস ওয়েস্টল্যান্ডের ১৮৭১ সালের প্রতিবেদনে উদ্ধৃত।
জনশ্রুতি আছে, জীবনের শেষ দিকে খানজাহান আল্লাহর কাছে জানতে চেয়েছিলেন কোথায় তাঁর মৃত্যু ও কবর হবে। নির্দেশিত জায়গায় তিনি মসজিদ ও সমাধি বানিয়ে দিঘি কাটা শুরু করেন। ওয়েস্টল্যান্ড যে গল্প শুনেছিলেন তা এমন: অনেক গভীর করে খুঁড়েও পানি উঠছিল না। শেষে মাটির নিচে একটি হিন্দু মন্দির বেরোয়, ভেতরে ধ্যানমগ্ন এক সাধু। খানজাহান তাঁর কাছে পানি চাইলে মাটির গভীর থেকে এমন বেগে পানি উঠল যে খানজাহান ও মাটিকাটা লোকেরা কোনোমতে পাড়ে উঠে প্রাণ বাঁচান। লোকের বিশ্বাস, মন্দিরটি এখনো দিঘির তলায় আছে। ওয়েস্টল্যান্ডের মন্তব্য ছিল, গল্পটি মুসলমানদের মুখে প্রচলিত, অথচ এর বিষয় হিন্দু দেবতা।
দ্বিতীয় রূপটি গৌরদাস বসাক সংগ্রহ করেছিলেন—মন্দিরের ভেতরে হিন্দু যোগী নয়, ছিলেন এক মুসলিম ফকির। তৃতীয় রূপটি সাধারণ মানুষের: খোঁড়ার সময় বিশাল এক কালো পাথরের মূর্তি পাওয়া যায়, এত ভারী যে কেউ তুলতে পারছিল না। তখন স্বপ্নাদেশ পেয়ে এক ব্রাহ্মণ বালক এসে অনায়াসে সেটি মাথায় তুলে নিয়ে যায়; বাগেরহাট থেকে প্রায় চার মাইল দূরে বিশ্রামের জন্য নামিয়ে আর তুলতে পারেনি। সেখানেই মূর্তির প্রতিষ্ঠা, জায়গার নাম হয় শিবপুর, বাড়িটির নাম শিববাড়ী। তিনটি কাহিনিই সতীশচন্দ্র মিত্র ১৯১৪ সালে লিপিবদ্ধ করেছেন।
মিত্র নিজে শিববাড়ী গিয়ে মূর্তিটির ছবি তোলেন। তাঁর বর্ণনায় এটি আসলে বুদ্ধের জীবনের নানা দৃশ্য খোদাই করা কালো পাথরের এক দুর্লভ ফলক, যা সেখানে শিব হিসেবে পূজিত হচ্ছিল এবং যার একটি হাত ভাঙা। ১৯০৮ সালের খুলনা গেজেটিয়ারও লিখেছে, দিঘিতে শিবের মূর্তি পাওয়া গিয়েছিল বলে এর নাম ঠাকুর দিঘি, আর মূর্তির এক হাতে কোদালের কোপের দাগ আছে। মিত্রের ব্যাখ্যা: এখানে আগে কোনো বৌদ্ধ মন্দির বা পুকুর ছিল, যা কোনো দুর্যোগে মাটিচাপা পড়ে; দিঘি খোঁড়ার সময় মূর্তিটি বেরিয়ে আসে। ‘ঠাকুর’ উঠেছিল বলেই দিঘির নাম ঠাকুর দিঘি।
মূর্তিটি এখন কোথায় বা কী অবস্থায় আছে, সাম্প্রতিক কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রে আমরা তা নিশ্চিত হতে পারিনি। তবে গল্পটি দেখায়, খানজাহানের শহর কোনো শূন্য জমিতে গড়ে ওঠেনি; এর মাটির নিচে আগের যুগের মানুষের চিহ্নও ছিল। আর এক মুসলিম শাসকের দিঘির নামের সঙ্গে হিন্দু ও বৌদ্ধ স্মৃতির মিশে থাকা এ অঞ্চলের মিলেমিশে থাকার ইতিহাসেরই অংশ।